পরিভাষায় নাগরিক বলতে এমন প্রত্যেক ব্যক্তিকে বোঝায়, যিনি কোনো রাষ্ট্রের সীমানার মধ্যে আইনগতভাবে বসবাস করেন এবং সেই রাষ্ট্রের আইন মেনে চলেন। তিনি শহরে থাকুন, গ্রামে থাকুন কিংবা যাযাবর জীবনযাপন করুন—রাষ্ট্রের অধীন বসবাসকারী প্রত্যেক মানুষই নাগরিক। এখানে বর্ণ, জাতি, ধর্ম বা বিশ্বাসের কোনো ভেদাভেদ নেই।
ইসলাম নাগরিকের জীবন, সম্পদ, সম্মান ও নিরাপত্তাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহতে মানুষের জীবনের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং এ অধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করা হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
“…যে ব্যক্তি কোনো প্রাণকে হত্যা করে—হত্যার বদলা বা পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টির শাস্তি ব্যতীত—সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করল। আর যে ব্যক্তি একজনের প্রাণ রক্ষা করে, সে যেন সমগ্র মানবজাতির প্রাণ রক্ষা করল।”
(সূরা আল-মায়িদা: ৩২)
যদিও এ আয়াতের সম্বোধন বনি ইসরাঈলকে করা হয়েছে, তবে এর শিক্ষা সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রযোজ্য। ইসলাম মানুষের জীবনের মর্যাদা ও নিরাপত্তাকে সর্বজনীন মূল্যবোধ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) মানুষের জীবন ও নিরাপত্তা রক্ষায় কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছেন। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
“যে ব্যক্তি আমাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র তোলে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।”
(সহিহ বুখারি)
ইসলাম নাগরিকের অধিকারকে ধর্মীয়, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক—এই চারটি ক্ষেত্রে গুরুত্ব দিয়েছে। এর মধ্যে জীবনের নিরাপত্তা সামাজিক অধিকারের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। একটি ইসলামী রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো তার অধীন প্রত্যেক নাগরিকের জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা।
তবে কেবল আইন প্রণয়ন করলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না; বরং আইন যথাযথভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমেই প্রকৃত নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হয়। একই সঙ্গে নাগরিকদেরও নিজের জীবন রক্ষা করা এবং অন্যের জীবন ও নিরাপত্তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া ইসলামের নির্দেশ।
আত্মহত্যাকে ইসলাম কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
“যে ব্যক্তি পাহাড় থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করবে, সে জাহান্নামে বারবার সেইভাবে পতিত হতে থাকবে। যে ব্যক্তি বিষপান করে আত্মহত্যা করবে, সে জাহান্নামে বিষ পান করতে থাকবে। আর যে ব্যক্তি অস্ত্র দিয়ে নিজেকে হত্যা করবে, সে জাহান্নামে সেই অস্ত্র দিয়েই নিজেকে আঘাত করতে থাকবে।”
(সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)
এ কারণে নিজের জীবন বিপন্ন করে এমন কাজ থেকেও বিরত থাকা ইসলামের শিক্ষা। উদাহরণস্বরূপ, সড়কে ট্রাফিক আইন ও সিগন্যাল মেনে চলা শুধু নাগরিক দায়িত্ব নয়; বরং নিজের জীবন রক্ষারও অংশ। জননিরাপত্তার স্বার্থে রাষ্ট্রের প্রণীত আইন মেনে চলা প্রত্যেক নাগরিকের কর্তব্য।
ইসলাম অন্যের ক্ষতি করতে পারে—এমন সামান্য কাজ থেকেও বিরত থাকতে নির্দেশ দিয়েছে। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মুগাফ্ফাল (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) কঙ্কর নিক্ষেপ করতেও নিষেধ করেছেন, কারণ এর মাধ্যমে কারও চোখ নষ্ট হতে পারে বা দাঁত ভেঙে যেতে পারে।
একইভাবে হজরত আবু মূসা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
“তোমাদের কেউ যখন মসজিদে আসে বা বাজার দিয়ে অতিক্রম করে এবং তার সঙ্গে তীর থাকে, তখন সে যেন তীরের ফলার ওপর হাত রেখে চলে, যাতে কেউ আহত না হয়।”
(সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)
এমনকি কারও দিকে অস্ত্র বা ধারালো বস্তু তাক করাকেও তিনি কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। কারণ অসাবধানতাবশতও মানুষের ক্ষতি হতে পারে, যা ইসলামে বড় অপরাধ।
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন,
“প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অন্য মুসলমানের রক্ত, সম্পদ ও সম্মান হারাম।”
(সহিহ মুসলিম)
ইচ্ছাকৃত হত্যার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা কঠোর শাস্তির ঘোষণা দিয়ে বলেন,
“আর যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মুমিনকে হত্যা করবে, তার প্রতিদান জাহান্নাম; সেখানে সে স্থায়ী হবে। আল্লাহ তার ওপর ক্রুদ্ধ হবেন, তাকে অভিশাপ দেবেন এবং তার জন্য মহাশাস্তি প্রস্তুত করে রাখবেন।”
(সূরা আন-নিসা: ৯৩)
পার্থিব জীবনে হত্যার জন্য ইসলামে কিসাস (ন্যায়সঙ্গত প্রতিশোধ) ও দিয়াত (রক্তপণ) বিধান রয়েছে। তবে এসব শাস্তি কার্যকর করার অধিকার কোনো ব্যক্তির নয়; বরং রাষ্ট্র ও বিচারব্যবস্থার। ব্যক্তি নিজ হাতে আইন তুলে নিতে পারে না।
অন্যদিকে, আত্মরক্ষার অধিকার ইসলাম স্বীকৃতি দিয়েছে। তিরমিজি ও আবু দাউদে হজরত সাঈদ ইবনে যায়েদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
“যে ব্যক্তি নিজের জীবন রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হয়, সে শহীদ। আর যে ব্যক্তি তার পরিবারকে রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হয়, সেও শহীদ।”
অতএব ইসলাম যেমন রাষ্ট্রকে নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব দিয়েছে, তেমনি নাগরিকদেরও একে অপরের জীবন, সম্পদ ও সম্মান রক্ষার দায়িত্ব অর্পণ করেছে।
সবশেষে, ইসলামে নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অন্যতম শর্ত হলো আইন ও ন্যায়বিচারের নিরপেক্ষ বাস্তবায়ন। শাস্তি প্রদানের ক্ষেত্রে পক্ষপাত, সুপারিশ বা বৈষম্যের কোনো সুযোগ নেই। কোরআনের ভাষায়,
“হে বুদ্ধিমানগণ! কিসাসের মধ্যেই তোমাদের জন্য জীবন রয়েছে, যাতে তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করতে পার।”
(সূরা আল-বাকারা: ১৭৯)
ন্যায়বিচারভিত্তিক আইন প্রয়োগ, মানুষের জীবন ও মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধা এবং পারস্পরিক দায়িত্ববোধ—এসবের সমন্বয়েই ইসলাম একটি নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও কল্যাণমুখী সমাজ প্রতিষ্ঠার নির্দেশনা দিয়েছে।







