ম্যাকাই টেস্টের প্রথম দিন যেন শরিফুল ইসলামের জন্য লেখা এক অবিশ্বাস্য ক্রিকেট গল্প। ব্যাট হাতে ১১ নম্বরে নেমে দলের সর্বোচ্চ রান করার পর বল হাতে অস্ট্রেলিয়ার শক্তিশালী ব্যাটিং লাইনআপে ধস নামিয়েছেন বাংলাদেশের বাঁহাতি পেসার। একদিনেই ব্যাট ও বল হাতে এমন পারফরম্যান্সে টেস্ট ক্রিকেটের রেকর্ডবইয়ে জায়গা করে নিয়েছেন তিনি।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্টে প্রথমে ব্যাট করতে নেমে ভয়াবহ ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়ে বাংলাদেশ। মিচেল স্টার্কের আগুনঝরা বোলিংয়ে একের পর এক ব্যাটার সাজঘরে ফিরতে থাকেন। একটা সময় বাংলাদেশের দলীয় সংগ্রহ নেমে আসে ৯ উইকেটে মাত্র ৩৯ রানে।
তখনই শেষ ব্যাটার হিসেবে উইকেটে আসেন শরিফুল ইসলাম।
টপ অর্ডার ও মিডল অর্ডারের স্বীকৃত ব্যাটাররা যেখানে অস্ট্রেলিয়ার পেস আক্রমণের সামনে দাঁড়াতেই পারছিলেন না, সেখানে শরিফুল খেলেন সাহসী এক ইনিংস। ১৯ বল মোকাবিলা করে তিনটি চারের সাহায্যে করেন ১৪ রান।
সংখ্যার হিসাবে ১৪ রান খুব বড় কোনো ইনিংস নয়। কিন্তু ম্যাচের পরিস্থিতি এবং ইতিহাসের বিচারে শরিফুলের এই ইনিংস হয়ে ওঠে বিশেষ।
বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসে এটিই ছিল কোনো ব্যাটারের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সংগ্রহ। অর্থাৎ ১১ নম্বরে ব্যাট করতে নেমেও দলের সর্বোচ্চ রান করেন শরিফুল।
টেস্ট ক্রিকেটের দীর্ঘ ইতিহাসে কোনো দলের ১১ নম্বর ব্যাটারের ইনিংসের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হওয়ার ঘটনা খুবই বিরল। শরিফুলের আগে মাত্র ১২ বার এমন ঘটনা দেখা গেছে। বাংলাদেশের হয়ে এর আগে একবারই এমন কীর্তি করেছিলেন পেসার তালহা জুবায়ের।
২০০৪ সালে ভারতের বিপক্ষে চট্টগ্রাম টেস্টে ১১ নম্বরে নেমে ৩১ রান করেছিলেন তালহা। সেই ইনিংসে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রানসংগ্রাহকও ছিলেন তিনি।
তবে শরিফুলের কীর্তিতে যোগ হয়েছে আরও একটি বিশেষ মাত্রা। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট ক্রিকেটে কোনো দলের ১১ নম্বর ব্যাটার হিসেবে ইনিংসে সর্বোচ্চ রান করার ঘটনা এবারই প্রথম।
শরিফুল ও তাইজুল ইসলামের শেষ উইকেট জুটিও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। দুজন মিলে যোগ করেন ২৫ রান। তাদের এই প্রতিরোধেই বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত ৬৪ রানে পৌঁছায় এবং নিজেদের টেস্ট ইতিহাসের সর্বনিম্ন ৪৩ রানের স্কোরের নিচে নেমে যাওয়ার শঙ্কা এড়ায়।
বাংলাদেশের ইনিংস শেষ হলে মনে হচ্ছিল দিনের সবচেয়ে আলোচিত পারফরম্যান্স হয়তো অস্ট্রেলিয়ার মিচেল স্টার্কেরই থাকবে। ১০ ওভারে মাত্র ১২ রান দিয়ে ৬ উইকেট নিয়ে বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপ গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ান বাঁহাতি পেসার।
কিন্তু বল হাতে নেমেই ম্যাচের গল্প বদলে দিতে শুরু করেন শরিফুল।
চোট কাটিয়ে দলে ফেরা বাঁহাতি পেসার শুরু থেকেই অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটারদের অস্বস্তিতে ফেলেন। নিজের প্রথম ওভারেই তিনি তুলে নেন দুটি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট।
প্রথমে বিপজ্জনক ট্র্যাভিস হেডকে ফিরিয়ে দেন শরিফুল। এরপর একই ওভারে তার শিকার হন মার্নাস লাবুশেন। শুরুতেই দুই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাটারকে হারিয়ে চাপে পড়ে অস্ট্রেলিয়া।
চা বিরতির পরও থামেননি শরিফুল। নতুন স্পেলে ফিরে অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞ ব্যাটার স্টিভ স্মিথকে এলবিডব্লিউ করে বাংলাদেশের জন্য বড় সাফল্য এনে দেন তিনি।
এরপর শরিফুলের বোলিং আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে।
মাত্র কয়েক বলের ব্যবধানে বিউ ওয়েবস্টার এবং অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক প্যাট কামিন্সকে ফিরিয়ে নিজের পাঁচ উইকেট পূর্ণ করেন তিনি। এটি ছিল টেস্ট ক্রিকেটে শরিফুলের প্রথম পাঁচ উইকেট শিকার।
কিন্তু পাঁচ উইকেটেই থামেননি বাংলাদেশের এই পেসার।
পরে মিচেল স্টার্ককেও সাজঘরে পাঠিয়ে নিজের ষষ্ঠ উইকেট তুলে নেন শরিফুল। দিনের খেলা শেষে তার বোলিং ফিগার দাঁড়ায় ৬ উইকেট ৩৫ রান—টেস্ট ক্যারিয়ারে তার সেরা বোলিং।
একই দিনে দুই বাঁহাতি পেসারের ছয় উইকেট নেওয়ার ঘটনাও ম্যাচটিকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে। বাংলাদেশের ইনিংসে স্টার্ক ৬ উইকেট নেওয়ার পর অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসে পাল্টা জবাব দেন শরিফুল।
বিশেষ করে ম্যাচের পরিস্থিতি বিবেচনায় শরিফুলের পারফরম্যান্স ছিল বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাত্র ৬৪ রানে অলআউট হওয়ার পর অস্ট্রেলিয়া বড় সংগ্রহ গড়লে ম্যাচ থেকে অনেকটাই ছিটকে যেতে পারত বাংলাদেশ।
কিন্তু শরিফুলের দুর্দান্ত বোলিংয়ে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপও নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারায়।
প্রথম দিনের শেষে অস্ট্রেলিয়ার সংগ্রহ দাঁড়ায় ৮ উইকেটে ১৬৫ রান। বাংলাদেশ থেকে তারা ১০১ রানে এগিয়ে থাকলেও শরিফুলের ছয় উইকেটের কারণে স্বাগতিকরা ম্যাচে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।
অস্ট্রেলিয়ার হয়ে একপ্রান্ত আগলে রাখেন ক্যামেরন গ্রিন। অন্য প্রান্তে নিয়মিত উইকেট পড়লেও তিনি ধৈর্য ধরে ব্যাটিং করে অর্ধশতক তুলে নেন।
শরিফুলের পারফরম্যান্স আরও তাৎপর্যপূর্ণ কারণ সিরিজের প্রথম টেস্টে তিনি খেলতেই পারেননি। হ্যামস্ট্রিংয়ের চোটের কারণে ডারউন টেস্টে মাঠের বাইরে ছিলেন এই বাঁহাতি পেসার।
সেই ম্যাচে হাসান মাহমুদ বল হাতে ৬ উইকেট নিয়ে বাংলাদেশকে ঐতিহাসিক জয়ের পথে এগিয়ে দিয়েছিলেন। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তার।
দ্বিতীয় টেস্টে দলে ফিরে এবার আলোটা নিজের দিকে টেনে নিলেন শরিফুল।
ব্যাট হাতে ১১ নম্বরে নেমে দলের সর্বোচ্চ ১৪ রান, এরপর বল হাতে ক্যারিয়ারসেরা ৬ উইকেট—একদিনে শরিফুলের এমন অলরাউন্ড পারফরম্যান্স টেস্ট ক্রিকেটে বিরল দৃশ্য।
বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ১১ নম্বর ব্যাটার হিসেবে দলের সর্বোচ্চ রান করার প্রথম নজির গড়ে ইতোমধ্যেই ইতিহাসে নাম লিখিয়েছেন তিনি। এর সঙ্গে ছয় উইকেটের অসাধারণ বোলিং যোগ হওয়ায় ম্যাকাই টেস্টের প্রথম দিনটি শরিফুল ইসলামের ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় দিন হয়ে থাকল।









