দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের নানা অধ্যায় পেরিয়ে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তবে রাজনীতির পরিচিত মুখ হয়ে ওঠার অনেক আগে তার জীবনে ছিল আরেকটি ভিন্ন জগৎ—নাটক, আবৃত্তি ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড। রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেওয়ার পর সেই প্রায় পাঁচ দশক আগের অজানা গল্প সামনে এনেছেন জনপ্রিয় নির্মাতা, প্রযোজক, কাহিনিকার ও চিত্রনাট্যকার ছটকু আহমেদ।
ছটকু আহমেদের স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, তরুণ বয়সে মির্জা ফখরুল নিয়মিত সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। নাটকের মঞ্চে তিনি নায়কের চরিত্রে অভিনয় করতেন। পাশাপাশি আবৃত্তিতেও তার বিশেষ দক্ষতা ছিল।
শুক্রবার (২১ আগস্ট) মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে অভিনন্দন জানান ছটকু আহমেদ। একই সঙ্গে পুরোনো দিনের একাধিক ছবি প্রকাশ করে দীর্ঘ স্মৃতিচারণে তুলে ধরেন বর্তমান রাষ্ট্রপতির সাংস্কৃতিক জীবনের নানা ঘটনা।
স্মৃতির পাতা উল্টে ছটকু আহমেদ ফিরে যান ১৯৭২ ও ১৯৭৩ সালের ঠাকুরগাঁওয়ে। সে সময় তিনি ঠাকুরগাঁওয়ের ইরিগেশন বিভাগে সেকশন অফিসার হিসেবে সরকারি চাকরি করতেন এবং ওয়াপদার সরকারি কলোনিতে থাকতেন।
চাকরির পাশাপাশি বিকেলের অবসর সময় তিনি স্থানীয় পাবলিক লাইব্রেরিতে কাটাতেন। সেখানেই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে তার পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়।
ছটকু আহমেদের স্মৃতিতে সেই সময়ের ঠাকুরগাঁওয়ের সাংস্কৃতিক পরিবেশ ছিল প্রাণবন্ত। পাবলিক লাইব্রেরিতে মির্জা ফখরুল ছাড়াও স্থানীয় শিক্ষক, সাংস্কৃতিক কর্মী ও পরিচিতজনেরা নিয়মিত আড্ডায় মিলিত হতেন। সাহিত্য, সংস্কৃতি ও নানা সামাজিক বিষয় নিয়ে চলত আলোচনা।
শুধু আড্ডাই নয়, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন ও নাটক মঞ্চায়নের সঙ্গেও তারা যুক্ত ছিলেন।
সেই সময় মির্জা ফখরুলের অভিনয় প্রতিভা বিশেষভাবে নজর কেড়েছিল বলে জানিয়েছেন ছটকু আহমেদ। তার স্মৃতিতে তরুণ মির্জা ফখরুল ছিলেন সুদর্শন, সুঠাম গড়নের এবং ভরাট কণ্ঠের অধিকারী।
নাটকে প্রধান বা নায়কের চরিত্রে অভিনয় করতেন তিনি। মঞ্চে তার উপস্থিতি এবং অভিনয় দর্শকদের মুগ্ধ করত। আবৃত্তিতেও তিনি ছিলেন সাবলীল।
ছটকু আহমেদের ভাষ্য অনুযায়ী, মির্জা ফখরুল মঞ্চে অভিনয় বা আবৃত্তি করলে দর্শকদের প্রবল হাততালি পাওয়া যেত। বর্তমানের গুরুগম্ভীর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে তরুণ বয়সের সেই মঞ্চ অভিনেতার পরিচয় অনেকের কাছেই অজানা।
স্মৃতিচারণে আরেকটি নাট্য আয়োজনের কথাও উল্লেখ করেন ছটকু আহমেদ। তিনি জানান, ঢাকার অভিনেত্রী আনোয়ারার ছোট বোন নার্গিসকে নিয়ে ঠাকুরগাঁওয়ের বলাকা সিনেমা হলে নাটক মঞ্চস্থ করা হয়েছিল। নার্গিস তখন নাটকে অভিনয় করতেন এবং পরে চলচ্চিত্রেও নায়িকা হিসেবে কাজ করেন।
নাটক ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের পাশাপাশি স্থানীয় চায়ের দোকানেও তাদের নিয়মিত আড্ডা হতো। সব মিলিয়ে ওই সময়ের ঠাকুরগাঁওয়ে একদল সংস্কৃতিমনা মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সময় কাটিয়েছেন মির্জা ফখরুল।
পরবর্তী সময়ে চাকরির কারণে ছটকু আহমেদ ঠাকুরগাঁও ছেড়ে ঢাকায় চলে আসেন। ফলে দুজনের নিয়মিত যোগাযোগেও ছেদ পড়ে।
দীর্ঘ সময় পর রাজধানীর গুলশানে একটি রেস্তোরাঁয় আবার দেখা হয় তাদের। সেই সাক্ষাতে ছটকু আহমেদ জানতে পারেন, ঠাকুরগাঁওয়ের পুরোনো পরিচিত সেই ‘আলমগীর সাহেব’ ততদিনে দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে পৌঁছেছেন এবং মন্ত্রী হয়েছেন।
সময়ের সঙ্গে মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক পরিচয় আরও বিস্তৃত হয়। তিনি বিএনপির অন্যতম শীর্ষ নেতা এবং পরবর্তী সময়ে দীর্ঘদিন দলের মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
রাজনৈতিক ব্যস্ততার মধ্যেও পুরোনো পরিচিতদের ভুলে যাননি বলে স্মৃতিচারণে উল্লেখ করেছেন ছটকু আহমেদ।
জিয়া শিশু একাডেমির একটি অনুষ্ঠানে দুজনের আরও একবার দেখা হয়। ততদিনে মির্জা ফখরুল বিএনপির মহাসচিব। অনুষ্ঠানে দর্শকসারিতে ছটকু আহমেদকে দেখতে পেয়ে তাকে মঞ্চে ডেকে নেন মির্জা ফখরুল।
সেখানে ছটকু আহমেদের হাতে একটি বিশেষ সম্মাননাও তুলে দিয়েছিলেন তিনি। পুরোনো বন্ধুত্ব ও পরিচয়ের সেই মুহূর্ত ছটকু আহমেদের স্মৃতিতে বিশেষ স্থান করে আছে।
সম্প্রতি ঠাকুরগাঁও নাট্যসমিতির একটি অনুষ্ঠানেও নিজের পুরোনো নাট্যজীবনের স্মৃতিচারণ করেছেন মির্জা ফখরুল। ওই আলোচনায় তিনি ছটকু আহমেদের কথাও স্মরণ করেন বলে পরে অনুষ্ঠানে উপস্থিত একজনের কাছ থেকে জানতে পারেন নির্মাতা।
প্রায় পাঁচ দশক আগে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে গড়ে ওঠা পরিচয় থেকে শুরু করে রাষ্ট্রপতি হওয়া পর্যন্ত মির্জা ফখরুলের দীর্ঘ যাত্রাকে আবেগের সঙ্গে স্মরণ করেছেন ছটকু আহমেদ।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর পুরোনো পরিচিত এই মানুষটিকে অভিনন্দন জানিয়ে তিনি তার মানবিক ও সংস্কৃতিমনা ব্যক্তিত্বের প্রশংসাও করেন।
ছটকু আহমেদের আশা, রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের মানুষের কল্যাণ, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও জাতীয় ঐক্যের জন্য কাজ করবেন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের কারণে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে দেশের মানুষ মূলত রাজনীতিবিদ হিসেবেই চেনে। কিন্তু তারুণ্যে নাটকের মঞ্চে অভিনয়, আবৃত্তি এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকার এই গল্প তুলে ধরেছে তার জীবনের এক ভিন্ন অধ্যায়।
একসময়ের মঞ্চের নায়ক ও আবৃত্তিকার থেকে দীর্ঘ পথ পেরিয়ে দেশের রাষ্ট্রপ্রধান—মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জীবনের এই অজানা সাংস্কৃতিক অধ্যায় এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে।









