রিজিকের প্রশস্ততা, হালাল উপার্জন ও জীবনে বরকত—প্রতিটি মানুষেরই কাম্য। কেউ চাকরিতে স্বচ্ছলতা চান, কেউ ব্যবসায় বরকত চান, কেউ আবার অভাব-অনটন থেকে মুক্তি পেতে আল্লাহর সাহায্য কামনা করেন। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে রিজিক কেবল অর্থ-সম্পদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের প্রয়োজন পূরণে আল্লাহর পক্ষ থেকে পাওয়া নিয়ামত ও সুযোগও রিজিকের অন্তর্ভুক্ত।
রিজিকের মালিক একমাত্র মহান আল্লাহ। তাই একজন মুমিন হালাল পথে চেষ্টা করার পাশাপাশি রিজিক ও বরকতের জন্য আল্লাহর কাছেই প্রার্থনা করে। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে এমন কয়েকটি আমলের কথা এসেছে, যেগুলোর সঙ্গে রিজিক, বরকত ও জীবনের প্রশস্ততার সম্পর্ক রয়েছে।
তাকওয়া অবলম্বন করলে অপ্রত্যাশিত জায়গা থেকে রিজিক
রিজিকের ক্ষেত্রে কোরআনের অন্যতম আশাব্যঞ্জক ঘোষণা এসেছে সুরা তালাকে।
মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না। আর যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।’ (সুরা তালাক, আয়াত: ২-৩)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, রিজিকের জন্য শুধু বাহ্যিক উপায়-উপকরণের ওপর নির্ভর করাই একজন মুমিনের কাজ নয়। তার জীবনে তাকওয়া থাকতে হবে।
তাকওয়া অর্থ আল্লাহকে ভয় করে তাঁর নির্দেশ মেনে চলা এবং নিষিদ্ধ বিষয় থেকে নিজেকে বিরত রাখা। উপার্জনের ক্ষেত্রে তাই প্রতারণা, ঘুষ, সুদ, অন্যের হক নষ্ট করা কিংবা হারাম পন্থা অবলম্বন করে পরে শুধু রিজিকের দোয়া করাকে ইসলামের পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা বলা যায় না।
বরং একজন মুমিন হালাল পন্থায় নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে এবং ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর ভরসা করবে।
বেশি বেশি ইস্তিগফার করা
গুনাহের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া বা ইস্তিগফারের সঙ্গে দুনিয়ার নিয়ামত বৃদ্ধির সম্পর্কও কোরআনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হজরত নুহ (আ.) তাঁর জাতিকে বলেছিলেন, ‘তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল।’ এরপর তিনি জানান, আল্লাহ তাদের ওপর প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, সম্পদ ও সন্তান দ্বারা সাহায্য করবেন এবং বাগান ও নদী দান করবেন। (সুরা নুহ, আয়াত: ১০-১২)
অতএব, জীবনে অভাব বা সংকট দেখা দিলে আল্লাহর কাছে নিজের ভুল-ত্রুটির জন্য ক্ষমা চাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল।
সহজভাবে নিয়মিত বলা যেতে পারে—
أَسْتَغْفِرُ اللّٰهَ
অর্থ: আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।
তবে ইস্তিগফার শুধু মুখের উচ্চারণে সীমাবদ্ধ না রেখে নিজের ভুল বুঝে অনুতপ্ত হওয়া, গুনাহ থেকে ফিরে আসা এবং পুনরায় সেই অন্যায় না করার দৃঢ় সংকল্প করাই তওবার প্রকৃত শিক্ষা।
আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা
আমরা অনেক সময় রিজিকের জন্য বিভিন্ন আমল খুঁজি, অথচ আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করার ব্যাপারে উদাসীন থাকি। অথচ সহিহ হাদিসে এর সঙ্গে রিজিকের প্রশস্ততার সরাসরি সম্পর্কের কথা এসেছে।
হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি চায় তার রিজিক প্রশস্ত করা হোক এবং তার আয়ু দীর্ঘ করা হোক, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৮৬; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৫৭)
সুতরাং বাবা-মা, ভাই-বোন ও নিকটাত্মীয়দের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা, তাদের খোঁজখবর নেওয়া এবং সাধ্য অনুযায়ী বিপদে সহযোগিতা করা শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয়; এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি দ্বীনি আমলও।
বর্তমান সময়ে সামান্য ভুল বোঝাবুঝি, অর্থসম্পদ বা পারিবারিক বিরোধের কারণে বছরের পর বছর আত্মীয়দের সঙ্গে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন রাখার ঘটনা দেখা যায়। একজন মুমিনের উচিত নিজের দিক থেকে সম্পর্ক ঠিক করার চেষ্টা করা।
সদকা করলে সম্পদ কমে না
মানুষের সাধারণ ধারণা হলো, কাউকে কিছু দিলে নিজের সম্পদ কমে যায়। কিন্তু ইসলামের শিক্ষা দানের ব্যাপারে একজন মুমিনকে ভিন্ন মানসিকতা তৈরি করতে বলে।
হজরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সদকা সম্পদ কমায় না।’ একই হাদিসে ক্ষমাশীলতা ও বিনয়ের প্রতিদানের কথাও এসেছে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৮৮)
তাই সামর্থ্য অনুযায়ী দরিদ্র-অসহায় মানুষকে সাহায্য করা, ক্ষুধার্তকে খাবার দেওয়া কিংবা প্রয়োজনগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো একজন মুমিনের জীবনের নিয়মিত আমল হওয়া উচিত।
তবে সদকার উদ্দেশ্য হতে হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি। লোক দেখানো, প্রশংসা পাওয়া কিংবা নিজের দানশীলতা প্রচার করার জন্য সদকা করলে আমলের মূল উদ্দেশ্যই নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
রিজিকের জন্য রাসুল (সা.)-এর শেখানো দোয়া
হালাল ও উত্তম রিজিকের জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি সুন্দর দোয়া পড়তেন।
হজরত উম্মে সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) ফজরের সালাম ফেরানোর পর বলতেন—
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ عِلْمًا نَافِعًا، وَرِزْقًا طَيِّبًا، وَعَمَلًا مُتَقَبَّلًا
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা ইলমান নাফিআ, ওয়া রিজকান ত্বইয়্যিবা, ওয়া আমালান মুতাকাব্বালা।
অর্থ: হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে উপকারী জ্ঞান, উত্তম ও পবিত্র রিজিক এবং কবুলযোগ্য আমল প্রার্থনা করছি।
(সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৯২৫)
এই দোয়াটির বিশেষত্ব হলো, এখানে শুধু সম্পদ চাওয়া হয়নি। একই সঙ্গে উপকারী জ্ঞান, পবিত্র রিজিক ও কবুলযোগ্য আমল চাওয়া হয়েছে।
কারণ বেশি সম্পদ পেলেই যে মানুষের জীবনে প্রকৃত কল্যাণ আসবে, এমন নয়। একজন মুমিনের প্রয়োজন এমন রিজিক, যা হালাল, পবিত্র এবং তার দুনিয়া ও আখিরাতের জন্য কল্যাণকর।
শুধু দোয়া করে চেষ্টা ছেড়ে দেওয়া নয়
রিজিক বৃদ্ধির দোয়া ও আমল করার অর্থ এই নয় যে মানুষ কাজকর্ম ছেড়ে শুধু অপেক্ষা করবে।
কোরআনে তাকওয়ার সঙ্গে আল্লাহর ওপর ভরসার কথা এসেছে। তাই হালাল চাকরি খোঁজা, ব্যবসায় দক্ষতা বাড়ানো, পরিশ্রম করা, নতুন কিছু শেখা, খরচে শৃঙ্খলা আনা এবং প্রয়োজনীয় বাস্তব উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি আল্লাহর কাছে দোয়া করতে হবে।
রিজিকের জন্য হারাম শর্টকাট বেছে নেওয়া কোনও সমাধান নয়। সাময়িকভাবে সম্পদ বাড়লেও হারাম উপার্জন একজন মুমিনের কাম্য হতে পারে না।
দুনিয়াকে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য বানানো ঠিক নয়
রিজিকের চিন্তা করতে গিয়ে কখনও কখনও মানুষের পুরো জীবন অর্থ উপার্জনের পেছনে চলে যায়। অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পদ মানুষের প্রয়োজন পূরণের মাধ্যম; জীবনের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য নয়।
জামে তিরমিজির একটি হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি আখিরাতকে নিজের প্রধান লক্ষ্য বানায়, আল্লাহ তার অন্তরে প্রাচুর্য দেন এবং তার বিষয়গুলো গুছিয়ে দেন। বিপরীতে যে ব্যক্তি দুনিয়াকেই প্রধান লক্ষ্য বানায়, তার সামনে অভাবের অনুভূতি রাখা হয় এবং তার বিষয়গুলো ছড়িয়ে পড়ে; আর দুনিয়া থেকে সে কেবল তার জন্য নির্ধারিত অংশই পায়। (জামে তিরমিজি, হাদিস: ২৪৬৫)
তাই রিজিকের জন্য চেষ্টা থাকবে, কিন্তু সেই রিজিক যেন মানুষকে নামাজ, পরিবার, মানুষের হক এবং আখিরাতের প্রস্তুতি থেকে দূরে সরিয়ে না দেয়।
রিজিকে বরকতের জন্য যেসব অভ্যাস গড়ে তুলবেন
রিজিক ও জীবনে বরকতের আশায় একজন মুমিন নিয়মিত ইস্তিগফার করতে পারেন, তাকওয়া অবলম্বন করতে পারেন, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখতে পারেন, সামর্থ্য অনুযায়ী সদকা করতে পারেন এবং হালাল ও পবিত্র রিজিকের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করতে পারেন। এসবের পাশাপাশি নিজের কাজ ও পেশায় সততা বজায় রাখা এবং যথাসাধ্য পরিশ্রম করাও জরুরি।
মনে রাখতে হবে, এসব আমলকে এমন কোনও ‘ফর্মুলা’ হিসেবে দেখা ঠিক নয় যে নির্দিষ্টসংখ্যকবার করলেই নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ পাওয়া নিশ্চিত। রিজিকের চূড়ান্ত ফয়সালা আল্লাহর হাতে। কোরআন যে শিক্ষা দেয় তা হলো—তাকওয়া, তাওয়াক্কুল ও আল্লাহর আনুগত্যের পথে থাকা এবং তাঁর কাছেই সাহায্য চাওয়া।
মোটকথা, রিজিক বৃদ্ধির জন্য একজন মুমিনের পথ হলো হালাল চেষ্টা, তাকওয়া, ইস্তিগফার, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা, সদকা এবং আল্লাহর কাছে আন্তরিক দোয়া।
সম্পদের পরিমাণ যতই হোক, সবচেয়ে বড় নিয়ামত হলো তাতে আল্লাহর দেওয়া বরকত থাকা। তাই শুধু ‘বেশি রিজিক’ নয়, আমাদের প্রার্থনা হওয়া উচিত—আল্লাহ যেন আমাদের হালাল, পবিত্র ও বরকতময় রিজিক দান করেন।









