GULF BANGLA বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন +880 1755727432
Home / শিক্ষা ও ক্যারিয়ার / শিক্ষা / শিক্ষকদের গ্রুপিং ও মামলায় প্রাথমিক শিক্ষায় বিশৃঙ্খলা, ৩৪০০০ প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য

শিক্ষকদের গ্রুপিং ও মামলায় প্রাথমিক শিক্ষায় বিশৃঙ্খলা, ৩৪০০০ প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য

This is a news story illustration from the Bengali daily newspaper 'Prothom Alo'. It shows a large protest of primary school teachers and staff outside a Bangladeshi school building. A large wooden banner above the crowd features the newspaper's logo and the primary headline in Bengali: "Teachers' grouping and legal cases disrupt primary education, 34,000 headmaster posts vacant." It also lists the reporter "Golam Rabbani" and date "June 20, 2026." Teachers hold banners demanding resolutions, including a central one that reads, "Solve primary education crisis, fill 34,000 headmaster positions immediately!" Smaller signs read "Stop politics" and "Justice." Students watch from school windows.

গোলাম রব্বানী, ঢাকা

প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬, ১৯:০০ | প্রথম আলো

দেশের ৬৫ হাজার ৪৫৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অর্ধেকেরও বেশি, অর্থাৎ ৩৪ হাজার ১৫৯টি বিদ্যালয়ে কোনো স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নেই। দীর্ঘ ১৩ বছরের এক জটিল মামলাজটের কারণে এই পদোন্নতির প্রক্রিয়া পুরোপুরি থমকে আছে। একদিকে আদালতপাড়ায় ঝুলে আছে অর্ধলাখ শিক্ষকের নিয়োগ ও পদোন্নতি; অন্যদিকে এক শ্রেণির শিক্ষক নেতার অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং ও ব্যক্তিগত আখের গোছানোর খেসারত দিচ্ছে দেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা।

নেপথ্যে ২৩টি শিক্ষক সংগঠন ও মামলার রাজনীতি

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এই সংকটের মূল সূত্রপাত হয়েছিল ২০১৩ সালে। ওই বছর দেশের ২২ হাজার ৯২৫টি রেজিস্টার্ড বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে সরকারি করা হয়। সে সময় নিয়োগপত্রে স্পষ্ট উল্লেখ ছিল—এই শিক্ষকেরা সরাসরি প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি পাবেন না। পরবর্তী সময় প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে ঢাল করে শিক্ষকদের একটি স্বার্থান্বেষী মহল নিজেদের স্বার্থে আদালতে মামলা ঠুকে দেয়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রাথমিক শিক্ষকদের অধিকার আদায়ের নামে দেশে বর্তমানে ছোট-বড় মিলিয়ে অন্তত ২৩টি শিক্ষক সংগঠন গড়ে উঠেছে। শিক্ষকদের এই চরম বিভক্তির নেপথ্যের কারণ ও মামলা নিয়ে বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির একটি গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক খায়রুন নাহার লিপি প্রথম আলোকে বলেন:

“শিক্ষকদের মধ্যে এই বিভক্তি ও গ্রুপিং দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। মূলত একক ব্যক্তির দীর্ঘ সময় ধরে পদ আঁকড়ে ধরার নোংরা মানসিকতার কারণেই আজ এতগুলো সমিতি বা সংগঠন তৈরি হয়েছে। আর এই চলমান মামলাটি মূলত করেছে বিলুপ্ত রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা। আমাদের মূল ধারার সমিতিগুলোর একমাত্র দাবি, সরকার ও আদালত যেন অতি দ্রুত এই আইনি সংকট দূর করে প্রাথমিক শিক্ষাকে বাঁচায়।”

শিক্ষক নেতাদের ক্লাস ফাঁকি ও তদবির–বাণিজ্য নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ শিক্ষকরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সহকারী শিক্ষক প্রথম আলোকে বলেন, নেতারা মূলত নিজেদের স্বার্থেই সাধারণ শিক্ষকদের জোর করে নানা গ্রুপে বিভক্ত করে ফেলেছেন। এই তথাকথিত বড় নেতাদের নিজ নিজ বিদ্যালয়ে কোনো দিনও খুঁজে পাওয়া যায় না। সপ্তাহের প্রায় পুরোটা সময় তাঁদের ঢাকার মিরপুরে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের (ডিপিই) বিভিন্ন দপ্তরে তদবির করতে দেখা যায়। সাধারণ শিক্ষকদের কাছ থেকে তোলা চাঁদার টাকায় ঢাকায় থাকা-খাওয়া আর এই স্বার্থের মামলার খরচ চালানোই এঁদের প্রধান কাজ।

মামলার কারণে প্রধান শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা নিতে পারছে না পিএসসি

নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, প্রধান শিক্ষক পদের ২০ শতাংশ সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে পূরণ করার বিধান রয়েছে। এই নিয়মে পিএসসির (PSC) মাধ্যমে মাত্র ১ হাজার ১২২টি পদের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছিল। চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, এসব পদের বিপরীতে আবেদন করেছেন প্রায় ৭ লাখ চাকরিপ্রার্থী। অর্থাৎ, প্রতিটি পদের জন্য লড়বেন গড়ে ৬২৪ জন।

পিএসসি সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের অক্টোবর মাসে আবেদনপ্রক্রিয়া শেষ হলেও মূলত পদোন্নতির কোটা–সংক্রান্ত চলমান মামলার আইনি জটিলতার কারণেই পরীক্ষার চূড়ান্ত তারিখ নির্ধারণ করা যাচ্ছে না। ফলে ১ হাজার পদের বিপরীতে আবেদন করা ৭ লাখ শিক্ষিত বেকার প্রার্থীর দীর্ঘশ্বাস আর হতাশা কেবলই বাড়ছে।

শিক্ষার্থী কমায় এক শ্রেণির সুবিধাবাদী শিক্ষকের ‘পোয়াবারো’

প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক না থাকায় এবং চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ায় মাঠপর্যায়ে পড়ালেখার মান মারাত্মকভাবে নিচে নেমে গেছে। ফলে সাধারণ অভিভাবকেরা বাধ্য হয়ে তাঁদের সন্তানদের বেসরকারি কিন্ডারগার্টেনে পাঠাচ্ছেন। তবে এই বেহাল অবস্থায় এক শ্রেণির সুবিধাবাদী শিক্ষক অত্যন্ত খুশি।

রংপুর বিভাগের এক সহকারী শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন:

“আমরা সততার সঙ্গে পড়িয়ে পদোন্নতির সব যোগ্যতা অর্জন করেছি। অথচ মুষ্টিমেয় কয়েকজন নেতার ব্যক্তিগত লোভ আর মামলার কারণে আমাদের পদোন্নতি হচ্ছে না। আর বিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষার্থীসংখ্যা কমে যাওয়াটা অনেক শিক্ষকের জন্য একধরনের সুবিধা। কারণ, ছাত্র কম থাকলে ক্লাসে পড়ানোর চাপ থাকে না, খাতা দেখার ঝামেলা থাকে না। স্কুল পরিদর্শনে এলেও ফাঁকি দেওয়া সহজ হয়।”

সংকট উত্তরণে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

শিক্ষা–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, ঢাকায় বসে সেমিনার-সিম্পোজিয়াম না করে এখন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী এবং ঢাকার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রতিটি উপজেলায় গিয়ে মাঠপর্যায়ের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম সচল করার দিকে নজর দেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে আদালতকেও এই জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে ও দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের ওপর আর কোনো খড়্গ নেমে না আসে।

উৎস: প্রথম আলো অনলাইন সংস্করণ

Social Icons