জিপিএ-৫ পাওয়ার গল্পটা শুরু হয় একেবারে বাস্তব অভাব আর সংকট দিয়ে। দিনাজপুর সদর উপজেলার এক টিনের ঘর থেকে ঠিক রুটিন মেনে পড়াশোনা করে এসএসসিতে জিপিএ-৫ অর্জন করেছে ছাত্রী সাদিয়া আফরিন।
এ গল্পে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো— আর্থিক সহায়তার চেয়ে নিয়মিত পড়ার পরিকল্পনা অনেক সময় হয়ে ওঠে সাফল্যের মূল চাবি। বিশেষ করে প্রবাসী পরিবারগুলোর জন্য, যেখানে দূর থেকে নজরদারি কঠিন, সেখানে এই ধরনের রুটিনই পড়াশোনাকে ধরে রাখতে সাহায্য করে।
আর্থিক নয়, পড়ার নির্দেশনা

গত বছর গণশুনানির দিন সাদিয়া আফরিন তার মা আরফা বেগমকে নিয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে যান। মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে আর্থিক সহায়তা চেয়েছিলেন পরিবার। কিন্তু জেলা প্রশাসক মো. রফিকুল ইসলাম আর্থিক সহযোগিতা না দিয়ে পড়াশোনায় সহায়তার পথ দেখান।
সেদিন সাদিয়াকে তিনি সাত দিনের বাড়ির পড়া দিয়ে বোঝান— কীভাবে পড়তে হবে, কীভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে। সেই নির্দেশনা বাস্তবায়ন করাই হয়ে ওঠে সাদিয়ার শুরু।
প্রতিদিনের রুটিন, প্রতি বুধবার হাজিরা
জেলা প্রশাসকের দেওয়া নিয়মে সাদিয়া পড়া শুরু করে। রাতে দুই ঘণ্টা আর ভোরে দুই ঘণ্টা পড়ার নির্দেশনা মেনে সে চলতে থাকে। ক্লাস হোক বা না হোক প্রতিদিন বিদ্যালয়ে যাওয়ার কথাও থাকে রুটিনের মধ্যে। পাশাপাশি বিকেলে এক ঘণ্টা খেলাধুলার বিষয়টাও ছিল।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ধারাবাহিকতা। প্রতি সপ্তাহের বুধবার বাড়ির কাজ এনে জমা দিয়ে নতুন করে বাড়ির কাজ নেওয়ার নির্দেশনা মেনে সাদিয়া নিয়মিত জেলা প্রশাসকের কাছে হাজির হয়। এই রুটিনই ধীরে ধীরে পড়ার গতি ঠিক করে দেয়।
এসএসসিতে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫
জেলা প্রশাসকের দেয়া পড়া ও নিয়ম অনুসরণের এক বছর পর সাদিয়া আফরিন এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে অংশ নেয়। প্রকাশিত ফলাফলে সে জিপিএ-৫ অর্জন করে।
তার স্কুল, পুলহাট কাদের বকস মেমোরিয়াল কলেজিয়েট হাই স্কুল থেকে পরীক্ষার্থী ছিল ৪৩ জন। পাস করে ২২ জন। তাদের মধ্যে একমাত্র সাদিয়া আফরিনই জিপিএ-৫ পায়—ফলে সাফল্যটা আরও বেশি তাৎপর্য পায়।
টিনের ঘর, টেবিল-চেয়ার নেই তবু পড়া থামে না
সরেজমিনে জানা যায়, সাদিয়ার বাড়ি খুব সাধারণ—দুই শতকের ওপর একটি টিনের ঘর ও আঙিনা। ঘরটি পুরাতন কাপড় দিয়ে দুই ভাগ করা। এক পাশে সাদিয়া ও তার মেজ বোন, অন্য পাশে মা-বাবা ও ছোট বোন থাকেন।
সাদিয়ার পড়ার জন্য আলাদা টেবিল-চেয়ার নেই। বিছানা বা মেঝেতেই পড়তে হয় তাকে। তবু শিক্ষক, পাড়া প্রতিবেশী, সহপাঠী ও স্কুলের শিক্ষার্থীদের আনন্দের পাশাপাশি বাবা-মায়ের চোখে ছিল চিন্তার ভাঁজ—পরিবার কীভাবে পড়ালেখা চালিয়ে যাবে, সে প্রশ্নই ঘুরছিল মাথায়।
এখন সেই চিন্তার মাঝেই এসেছে স্বস্তির খবর। কারণ জিপিএ-৫ মানে শুধু ভালো ফল নয়, ভবিষ্যৎ ঘিরে নতুন সম্ভাবনার দরজা খোলা।
প্রবাসী অভিভাবকদের জন্য বার্তা
সাদিয়ার গল্প দেখায়— নিয়মিত সময় ধরে পড়া, বাড়ির কাজ জমা দেওয়ার মতো ছোট অভ্যাসও বড় সাফল্য এনে দিতে পারে। প্রবাসে থাকা অনেক অভিভাবক সন্তানের পড়া নিয়ে দূর থেকে টেনশনে থাকেন। সেখানে সঠিক রুটিন, সপ্তাহভিত্তিক দায়িত্ব, এবং পড়ার লক্ষ্য এক রাখাই হতে পারে সবচেয়ে বড় সহায়তা।
প্রশ্নোত্তর
সাদিয়া আফরিন আর্থিক সহায়তা পাননি—তবু কীভাবে এগোলেন?
জেলা প্রশাসক আর্থিক সহায়তার বদলে পড়ার পরিকল্পনা ও বাড়ির কাজের নিয়ম দিয়ে দেন। সেটাই তিনি নিয়মিত মেনে চলেন।
সাদিয়া আফরিনের পড়ার রুটিন কেমন ছিল?
রাতে দুই ঘণ্টা ও ভোরে দুই ঘণ্টা পড়া, বিকেলে এক ঘণ্টা খেলাধুলা, প্রতিদিন বিদ্যালয়ে যাওয়া এবং প্রতি সপ্তাহের বুধবার বাড়ির কাজ জমা দেওয়ার নিয়ম ছিল।
এসএসসিতে কোন বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছেন?
বিজ্ঞান বিভাগ থেকে তিনি জিপিএ-৫ অর্জন করেন।
আরও পড়ুন: এই বিভাগের সর্বশেষ খবর
সূত্র: jagonews24.com









