ভারতের কলকাতার একটি আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত সাত বাংলাদেশির মধ্যে ছয়জনের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। শনিবার (২২ আগস্ট) পৃথক দুটি স্থলবন্দর দিয়ে মরদেহগুলো বাংলাদেশে প্রবেশ করে। পরে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
নিহতদের মধ্যে সাতক্ষীরার এস এম আলিমুজ্জামানের মরদেহ সকালে ঘোজাডাঙ্গা-ভোমরা সীমান্ত দিয়ে দেশে আনা হয়। অন্যদিকে বিকেলের দিকে কুষ্টিয়ার সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত ও তার পরিবারের তিন সদস্য এবং ঢাকার সাভারের বাসিন্দা আহমেদ বাবুর মরদেহ পেট্রাপোল-বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পৌঁছায়।
কলকাতায় বাংলাদেশ উপহাইকমিশনের তত্ত্বাবধানে মরদেহ সংরক্ষণ, প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন এবং বাংলাদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়।
সকালে দেশে আসে আলিমুজ্জামানের মরদেহ
সাতক্ষীরার এস এম আলিমুজ্জামানের মরদেহ শনিবার সকালে ভারতের ঘোজাডাঙ্গা সীমান্ত হয়ে বাংলাদেশের ভোমরা স্থলবন্দরে পৌঁছায়।
সীমান্তের দুই পাশে প্রয়োজনীয় ইমিগ্রেশন ও প্রশাসনিক কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর মরদেহ তার পরিবারের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়।
পরে অ্যাম্বুলেন্সযোগে মরদেহ সাতক্ষীরায় নিজ এলাকায় নেওয়া হয়। দীর্ঘ অপেক্ষার পর স্বজনরা মরদেহ গ্রহণ করেন।
কলকাতায় অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়ার পর থেকেই আলিমুজ্জামানের পরিবার উদ্বেগের মধ্যে ছিল। পরিচয় নিশ্চিত হওয়া এবং ময়নাতদন্তসহ প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর তার মরদেহ দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা করা হয়।
বেনাপোল দিয়ে আরও পাঁচ মরদেহ
এদিকে অগ্নিকাণ্ডে নিহত আরও পাঁচ বাংলাদেশির মরদেহ বিকেলের দিকে পেট্রাপোল-বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে দেশে আনা হয়।
তাদের মধ্যে রয়েছেন কুষ্টিয়ার সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত, তার স্ত্রী আফসানা শারমিন, সন্তান শর্ণশীষ দত্ত ও শ্বশুর আকরাম আলী।
একই সঙ্গে ঢাকার সাভার এলাকার বাসিন্দা আহমেদ বাবুর মরদেহও বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে আনা হয়।
সীমান্তে মরদেহগুলো পৌঁছানোর আগে থেকেই নিহতদের স্বজনরা প্রয়োজনীয় গাড়ি ও অন্যান্য ব্যবস্থা নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন।
ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে মরদেহ গ্রহণের পর বাংলাদেশ অংশে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই ও আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়। এরপর স্বজনদের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়।
পরিবারগুলো নিজ নিজ এলাকায় মরদেহ নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেছে। সেখানে ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী তাদের শেষকৃত্য সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।
একই পরিবারের চারজনের মৃত্যু
কলকাতার অগ্নিকাণ্ডে কুষ্টিয়ার সাংবাদিক দেবাশীষ দত্তের পরিবারের চার সদস্যের মৃত্যু ঘটনাটিকে আরও মর্মান্তিক করে তুলেছে।
দেবাশীষের পাশাপাশি তার স্ত্রী, শিশু সন্তান ও শ্বশুরও ওই অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারান।
একই পরিবারের একসঙ্গে চার সদস্যের মৃত্যুতে কুষ্টিয়ায় তাদের পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতদের মধ্যে গভীর শোক নেমে এসেছে।
অন্যদিকে সাভারের আহমেদ বাবুর মৃত্যুতেও তার পরিবার ও স্থানীয়দের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
রেবতী সরকারের শেষকৃত্য কলকাতায়
অগ্নিকাণ্ডে নিহত সাত বাংলাদেশির মধ্যে ছয়জনের মরদেহ দেশে আনা হলেও সাতক্ষীরার রেবতী সরকারের মরদেহ বাংলাদেশে আনা হয়নি।
পরিবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কলকাতাতেই তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়েছে।
প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক অনুমতি পাওয়ার পর শুক্রবার রাতে কলকাতার শ্মশানে তার সৎকার করা হয়।
এ ক্ষেত্রেও কলকাতায় বাংলাদেশ উপহাইকমিশনের কর্মকর্তারা নিহতের পরিবারের পাশে ছিলেন এবং প্রয়োজনীয় আর্থিক ও প্রশাসনিক সহযোগিতা দিয়েছেন।
পুরো প্রক্রিয়ায় উপহাইকমিশনের সহযোগিতা
দুর্ঘটনার পর থেকেই কলকাতায় বাংলাদেশ উপহাইকমিশন নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত করা, স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ, ময়নাতদন্ত, মরদেহ সংরক্ষণ এবং বাংলাদেশে পাঠানোর জন্য ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে।
বিদেশে কোনো নাগরিকের অস্বাভাবিক মৃত্যু হলে তার মরদেহ দেশে পাঠানোর আগে বেশ কয়েকটি আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়।
এ ক্ষেত্রে স্থানীয় পুলিশ ও হাসপাতালের কার্যক্রম, ময়নাতদন্ত, মৃত্যু সনদ, সীমান্তে প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র এবং সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক মিশনের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়।
এসব প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে উপহাইকমিশনের কর্মকর্তারা নিহতদের স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিয়েছেন।
মরদেহ সংরক্ষণ ও পরিবহনের ব্যবস্থাতেও বাংলাদেশ মিশন সহযোগিতা করেছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শোক
কলকাতার মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডে বাংলাদেশিদের প্রাণহানিতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
নিহতদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা এবং পরিবারের প্রয়োজনীয় সহযোগিতায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কাজ করেছে।
দুর্ঘটনায় প্রিয়জন হারানো পরিবারগুলোর পাশে থাকার কথাও জানিয়েছে সরকার।
১৯ আগস্টের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড
গত ১৯ আগস্ট কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটে অবস্থিত একটি আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ আগুন লাগে।
অগ্নিকাণ্ডে মোট নয়জনের মৃত্যু হয়। তাদের মধ্যে সাতজন ছিলেন বাংলাদেশের নাগরিক এবং দুজন ভারতীয়।
ঘটনার পর কলকাতার ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ এবং অন্যান্য জরুরি বিভাগের সদস্যরা উদ্ধার তৎপরতা চালান।
পরে নিহতদের মরদেহ কলকাতার হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং ময়নাতদন্তের মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
নিহত সাত বাংলাদেশির পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে কলকাতায় বাংলাদেশ উপহাইকমিশন।
পরিবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ছয়জনের মরদেহ বাংলাদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। অন্যদিকে রেবতী সরকারের শেষকৃত্য কলকাতাতেই সম্পন্ন করা হয়।
শনিবার ছয় বাংলাদেশির মরদেহ দেশে পৌঁছানোর মধ্য দিয়ে দীর্ঘ আইনি ও প্রশাসনিক অপেক্ষার অবসান হলো। এখন নিজ নিজ এলাকায় স্বজনদের উপস্থিতিতে তাদের শেষ বিদায়ের প্রস্তুতি চলছে।








