হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো এলাকায় আগুনের ঘটনা ‘সন্দেহজনক’ বলে মনে করছেন তদন্তকারী কর্মকর্তারা। এ ঘটনায় তদন্তকারীরা এরইমধ্যে নানা ধরনের ‘অসঙ্গতি’ পেয়েছেন। এই অসঙ্গতির বিষয়ে শনিবার (৬ জুন) সকাল থেকেই কুরিয়ার সার্ভিস প্রতিষ্ঠান ডিএইচএলের পাঁচ কর্মীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। বিমানবন্দর-কেন্দ্রিক বিভিন্ন সংস্থা থেকে এমন তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।
এর আগে ২০২৫ সালের ১৮ অক্টোবর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো এলাকায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। সেদিন আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ১৩টি স্টেশনের ৩৭টি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। পাশাপাশি যোগ দেয় সেনাবাহিনী ও বিজিবি সদস্যরাও। পরে এ ঘটনা কয়েকশ কোটি টাকার মালামাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার দাবি তুলেছিলেন ব্যবসায়ীরা।
শুক্রবার (৫ জুন) বিমানবন্দরের স্পর্শকাতর এই জায়গায় আবার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এ বিষয়ে কথা হয় তদন্তের সঙ্গে জড়িত একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে। তারা কেউই পরিচয় প্রকাশ করে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গত বছরের ১৮ অক্টোবর ডিএইচএল কুরিয়ারের শেড থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়। শুক্রবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে একই শেড থেকে আবার আগুনের ঘটনা ঘটেছে।
তারা আরও বলছেন, হ্যাঙ্গার সংশ্লিষ্ট ডিএইচএলের শেডের যে স্থানে আগুনটি লাগে, সেটি ছিল সিসিটিভি ক্যামেরার আওতার বাইরে। আগুন লাগার সামনের অংশে ছিল একটি বৈদ্যুতিক পিলার। তার নিচে কিছু তারও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে ছিল। তদন্তকারীদের প্রশ্ন, সেই তার থেকে শর্ট সার্কিট হলে অবশ্যই স্পার্ক হওয়ার কথা। কিন্তু ঘটনার সময় তা হয়নি। এমনকি শর্ট সার্কিট হলে বিদ্যুতের লাইটও বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু এগুলো কিছুই হয়নি।
তদন্তকারী কর্মকর্তারা বলছেন, যে স্থানটিতে আগুন লেগেছে তার কিছু দূরে সিগারেটের শেষের কয়েকটি অংশ পড়েছিল। তদন্তকারীদের প্রশ্ন ওই এলাকায় সিগারেট খাওয়াই নিষিদ্ধ। কিন্তু সিগারেট থেকে আগুন লাগলে তা থেকে ধোঁয়া বের হবে। পরে ধীরে ধীরে আগুন জ্বলবে। কিন্তু এক্ষেত্রে সেরকম কোনো ঘটনা ঘটেনি। হটাৎ করেই দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে ওঠে।
সিটিটিভির ফুটেজ বিশ্লেষণ করে তদন্তকারীরা বলছেন, রাত তখন সাড়ে ১১টার কাছাকাছি। ঘটনাস্থলের কাছাকাছি স্থানে ডিএইচএলের একজন কর্মী উপস্থিত ছিলেন। যাকে সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে। ফুটেজ বিশ্লেষণ করে তারা দেখতে পেয়েছেন, তিনি মশারি টাঙিয়ে সেখানে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। একপর্যায়ে আগুন লাগার দেড় থেকে দুই মিনিট তিনি খুবই শান্তভাবে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিষয়টি দেখছিলেন। পরে আগুন ছড়িয়ে পড়লে তিনি বিষয়টি সবাইকে জানানো জন্য ফোন করেন।
তদন্তকারীদের দাবি রাতে ধূমপানের জন্য ওইদিকে কারও যাওয়ার কথা নয়। তাহলে আগুন কীভাবে লাগলো এবং তা ছড়ালো। তাদের দাবি, বিষয়টি খুবই রহস্যের। আপাত দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে কারও দারাই এটি সংঘঠিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। আর এ কারণে কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
খোঁজ জানা যায়, ডিএইচএলের ওই কন্টেইনারে বিভিন্ন মালামাল ছিল। এর মধ্যে কাপড়ের রোল, পেপার আইটেম, রাবার আইটেম, প্লাস্টিক আইটেমসহ নানারকম পণ্য ছিল। এই পণ্যগুলো রবিবার নিলাম হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই এমন ঘটনা নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
জানা যায়, পরপর দুটি আগুনই ডিএইচএল-এর শেড থেকে হওয়ায় এই প্রশ্ন আরও জোরালে হচ্ছে যে, কেন সেখান থেকেই বার বার আগুনের উৎপত্তি হচ্ছে। তার মানে অগ্নিনিরাপত্তায় তাদের চরম অবহেলা রয়েছে। নয়তো তারা ইচ্ছে করেই এ ধরনের ঘটনা ঘটাচ্ছেন। বিমানবন্দরের ভাবমূর্তি বর্হিবিশ্বে ক্ষুন্ন করতে সুক্ষ্ণভাবে এই কাজগুলো করা হচ্ছে। শুক্রবারের আগুনটি বেবিচকের নিজস্ব ফায়ার কর্মী ও ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের দ্রুত প্রচেষ্টায় নিয়ন্ত্রনে আনা সম্ভব হয়েছে। বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো গেছে।
তদন্তকারীরা বলছেন, যেহেতু বিষয়টি রহস্যজনক মনে হচ্ছে সে কারণে আমরা কয়েকজন ডিএইচএলের কর্মীকে জিজ্ঞাসাবাদ করছি। তাদের দেওয়া তথ্য ঘটনাস্থলে গিয়ে মিলিয়ে দেখাও হচ্ছে। তবে দুএকদিনের মধ্যেই এ বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।
এ বিষয়ে ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া সেল কর্মকর্তা তালহা বিন জসিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ঘটনাটি ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকেও তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তের পরেই অগ্নিকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে বলা যাবে।’
এদিকে এ বিষয়ে বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগিব সামাদ বলেন, তদন্ত হচ্ছে। কোথা থেকে আগুনের সূত্রপাত, তা আমরা দেখছি। পাশাপাশি কেউ ইচ্ছা করে আগুন লাগিয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের মধ্যে রয়েছে।
তদন্তকারী কর্মকর্তাদের এই তথ্যের বিষয়ে জানতে ডিএইচএলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মোসাদ্দেক হোসেনকে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। এমনকি তার ফোনে মেসেজ পাঠালেও তার কোনো উত্তর দেননি।








