
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)-এর মহাপরিচালক পর্যায়ের ৫৭তম সীমান্ত সম্মেলন শুরু হয়েছে। গতকাল সোমবার (৮ জুন) ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে বিএসএফ সদর দপ্তরে চার দিনব্যাপী এই সম্মেলনের উদ্বোধন হয়।
দুই দেশের সীমান্তে চলমান পুশইন পরিস্থিতির মধ্যে এই বৈঠক শুরু হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে বাড়তি গুরুত্ব তৈরি হয়েছে। গত মে মাস থেকে বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে নারী-পুরুষ ও শিশুদের বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে বেশ কয়েকটি স্থানে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) প্রতিরোধের কারণে এসব মানুষ বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারেনি, ফলে কিছু মানুষ এখনো শূন্যরেখায় অবস্থান করছেন।
এসব বিষয়ই এবারের সম্মেলনে আলোচনায় আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিএসএফ জানিয়েছে, এবারের সম্মেলনের আলোচ্যসূচিতে একাধিক সীমান্ত-সংক্রান্ত বিষয় স্থান পেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিএসএফ ও ভারতীয় বেসামরিক নাগরিকদের ওপর বাংলাদেশি নাগরিকদের কথিত হামলা প্রতিরোধ, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমন, বাংলাদেশি অপরাধীদের ভারতে প্রবেশ ঠেকানো এবং সীমান্তে বেড়া ভাঙার ঘটনা।
এছাড়া বেড়া নির্মাণ কার্যক্রম, বাংলাদেশে ভারতীয় বিদ্রোহী গোষ্ঠী (আইআইজি)-এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সীমান্ত অবকাঠামো সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়েও আলোচনা হবে বলে জানানো হয়েছে।
তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এবারের বৈঠকে প্রধান আলোচ্য বিষয় হিসেবে পুশইন ইস্যুকে গুরুত্বসহকারে উপস্থাপন করা হবে। তাদের মতে, এটি একটি মানবিক ও সংবেদনশীল বিষয়, যা অবিলম্বে সমাধান প্রয়োজন। পাশাপাশি সীমান্ত-সম্পর্কিত অন্যান্য বিষয়ও আলোচনায় স্থান পাবে।
সম্মেলনে সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন, আকাশসীমা লঙ্ঘন করে অবৈধ ড্রোন বা হেলিকপ্টার উড্ডয়ন বন্ধ, এবং সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারের বিষয়গুলোও উত্থাপন করা হবে বলে জানা গেছে। এছাড়া ভারতীয় গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে বাংলাদেশ ও সীমান্তবর্তী অঞ্চল নিয়ে যেসব নেতিবাচক অপপ্রচার ছড়ানো হয়, তা বন্ধের বিষয়েও আলোচনা হতে পারে। একই সঙ্গে উভয় দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে আস্থা ও সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণের প্রস্তাব রাখা হবে।
এর আগে গত রবিবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ বলেন, “এই বৈঠকে সীমান্ত পরিস্থিতি, দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা এবং বিশেষ করে অবৈধ পুশইনের বিষয়টি গুরুত্বসহকারে তুলে ধরা হবে। বিজিবি–বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের এই বৈঠক নিয়মিতভাবে একবার বাংলাদেশে এবং পরেরবার ভারতে অনুষ্ঠিত হয়।”
তিনি আরও বলেন, “সব বিষয় নিয়েই আলোচনা হবে। আমরা কূটনৈতিক চ্যানেলে বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করছি এবং সীমান্তরক্ষী বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সরকার অবৈধ পুশইনের যেকোনো চেষ্টা প্রতিহত করতে প্রস্তুত। তবে এসব সমস্যার সমাধান মূলত কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই হওয়া উচিত।”
এদিকে সীমান্ত দিয়ে ‘পুশইন’ ইস্যুকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কের মধ্যে নতুন করে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একাধিকবার কূটনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের আহ্বান জানানো হলেও ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তা যথাযথভাবে অনুসরণ করছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। গত এক মাস ধরে সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় বাংলা ভাষাভাষী নারী, পুরুষ ও শিশুকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে বিজিবি।
মানবাধিকার কর্মীদের মতে, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী কোনো দেশের নাগরিক অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ করলে তাকে কূটনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করে ফেরত পাঠানোর বিধান রয়েছে। কিন্তু জোরপূর্বক সীমান্তে মানুষকে ঠেলে দেওয়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের পরিপন্থি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।






