দেশের অর্থনীতিকে বর্তমান সংকট থেকে বের করে টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে নিতে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তার মতে, দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি না হলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করাও কঠিন হবে।
শনিবার (২২ আগস্ট) রাজধানীর মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ২০২৬ অর্থবছরের দ্বি-বার্ষিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিষয়ক এক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর বিষয়টি সরাসরি বিনিয়োগের সঙ্গে সম্পর্কিত। বিনিয়োগ না বাড়লে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি কিংবা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি বাড়ানো সম্ভব হবে না।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরেই বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভর করে এগিয়েছে। ভবিষ্যতেও প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হতে হবে বেসরকারি উদ্যোগকে।
আমির খসরুর ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারের কাজ সরাসরি ব্যবসা পরিচালনা করা নয়; বরং এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে বেসরকারি উদ্যোক্তারা সহজে বিনিয়োগ করতে পারবেন এবং ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ পাবেন।
দেশে বিনিয়োগ না হলে বিদেশিরাও আসবে না
দেশীয় বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা যদি নিজেদের দেশে বিনিয়োগ করতে আত্মবিশ্বাসী না হন, তাহলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরি করাও কঠিন হবে।
তার মতে, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের আগে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
দেশের উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ বাড়ালে এবং শিল্প খাত সম্প্রসারণ করলে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছেও বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর ইতিবাচক বার্তা যাবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশি ও বিদেশি উভয় ধরনের বিনিয়োগ বাড়াতে সরকার বিভিন্ন নীতিগত সংস্কার নিয়ে কাজ করছে।
বেসরকারি খাতই প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি
আমির খসরু বলেন, বাংলাদেশের অতীতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে বেসরকারি খাত থেকে।
তিনি বলেন, সরকারের অর্থনৈতিক দর্শন হচ্ছে বেসরকারি খাতনির্ভর প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা। ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারাই উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবেন। সরকারের দায়িত্ব হবে তাদের প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা দেওয়া এবং ব্যবসার প্রতিবন্ধকতা দূর করা।
অর্থমন্ত্রী মনে করেন, একটি কার্যকর বেসরকারি খাত তৈরি করতে হলে ব্যবসার ব্যয় কমানো এবং প্রশাসনিক জটিলতা দূর করা প্রয়োজন।
ব্যবসায় ডিরেগুলেশনের ওপর জোর
ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নে ‘ডিরেগুলেশন’ বা অপ্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ ও বিধিনিষেধ কমানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন অর্থমন্ত্রী।
তিনি বলেন, শুধু নতুন নীতিমালা বা সংস্কারের ঘোষণা দিলেই হবে না। এগুলো বাস্তবে ব্যবসায়ীরা কতটা কাজে লাগাতে পারছেন, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
ব্যবসা শুরু করা থেকে শুরু করে বিভিন্ন অনুমোদন, লাইসেন্স এবং সরকারি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে উদ্যোক্তারা কোথায় বাধার মুখে পড়ছেন, তা চিহ্নিত করার চেষ্টা করছে সরকার।
অর্থমন্ত্রী জানান, ব্যবসায়ীরা কোনো সরকারি দপ্তর বা নীতিগত সমস্যার কারণে বাধার মুখে পড়লে তা জানানোর জন্য একটি বিশেষ ওয়েবসাইট চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এর মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা সরাসরি তাদের সমস্যার তথ্য জানাতে পারবেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকেও দায়িত্ব নিতে হবে
শুধু সরকার নয়, ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকেও নিজেদের সদস্যদের সমস্যা সমাধানে সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান অর্থমন্ত্রী।
তিনি বলেন, কোনো ব্যবসায়ী বা উদ্যোক্তা প্রশাসনিক জটিলতা কিংবা অপ্রয়োজনীয় বিধিনিষেধের কারণে সমস্যায় পড়লে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী সংগঠনকে সেই বিষয়ে অবস্থান নিতে হবে।
ব্যবসায়ী সংগঠন ও সরকারের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ থাকলে ব্যবসার পরিবেশ দ্রুত উন্নত করা সম্ভব হবে বলে মনে করেন তিনি।
জ্বালানি সংকটের সমাধান দ্রুত নয়
দেশের চলমান জ্বালানি সংকট নিয়েও সেমিনারে কথা বলেন অর্থমন্ত্রী।
তিনি বলেন, জ্বালানি সমস্যার সমাধানে সরকারের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য সব উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে এ সমস্যার দ্রুত সমাধান সম্ভব নয়।
তার মতে, জ্বালানি খাতের বর্তমান পরিস্থিতি পুরোপুরি সরকারের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নেই। বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বিষয়ের সঙ্গে এটি যুক্ত।
তবে পরিস্থিতির উন্নয়নে সরকার কাজ করছে এবং ধীরে ধীরে সংকট কমে আসবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন অর্থমন্ত্রী।
জ্বালানি সংকট শিল্প উৎপাদন ও বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলেও ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করা হচ্ছে। শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা।
বিনিয়োগের সঙ্গে কর্মসংস্থানও যুক্ত
অর্থমন্ত্রী বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শুধু পরিসংখ্যানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। বিনিয়োগ বাড়ার মাধ্যমে নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
বিশেষ করে তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হলে নতুন বিনিয়োগ প্রয়োজন।
দেশের উৎপাদনশীল খাত, শিল্প, প্রযুক্তি, রপ্তানি ও সেবা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন তিনি।
সরকারের ভূমিকা হবে সহায়ক
আমির খসরু বলেন, সরকার এমন একটি অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি করতে চায়, যেখানে উদ্যোক্তারা স্বাধীনভাবে ব্যবসা ও বিনিয়োগ করতে পারবেন।
এ ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা হবে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি, নীতিগত সহায়তা প্রদান এবং ব্যবসার পথে থাকা অপ্রয়োজনীয় বাধা দূর করা।
তিনি বলেন, বেসরকারি খাতকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ও ব্যবসায়ী সংগঠনকে সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করতে হবে।
অর্থমন্ত্রী মনে করেন, বিনিয়োগ বাড়াতে ব্যবসায়ীদের আস্থা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নীতির ধারাবাহিকতা, সহজ ব্যবসায়িক প্রক্রিয়া, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমানো গেলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে।
দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার মূল পথ হিসেবে বিনিয়োগকেই সামনে রাখছেন অর্থমন্ত্রী। তার মতে, দেশে নতুন বিনিয়োগ আসলে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়বে, ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে গতি ফিরবে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিও ধীরে ধীরে ঘুরে









