বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। শুক্রবার (২১ আগস্ট) সন্ধ্যায় বঙ্গভবনের দরবার হলে শপথ নেওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
নতুন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব নেওয়ার পর তার বেতন কত, রাষ্ট্রীয়ভাবে কী কী সুযোগ-সুবিধা পাবেন এবং সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাই বা কতটুকু—এসব বিষয় নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতির বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা মূলত The President’s (Remuneration and Privileges) Act, 1975 এবং পরবর্তী সংশোধনীগুলোর মাধ্যমে নির্ধারিত।
মাসিক বেতন ১ লাখ ২০ হাজার টাকা
আইন অনুযায়ী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি প্রতি মাসে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা বেতন পান। রাষ্ট্রপতির এই বেতন আয়করমুক্ত।
২০১৬ সালের সংশোধনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির মাসিক বেতন আগের ৬১ হাজার ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা করা হয়।
তবে রাষ্ট্রপতির সুযোগ-সুবিধা শুধু মাসিক বেতনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের জন্য বাসভবন, পরিবহন, চিকিৎসা, ভ্রমণ ও আপ্যায়নসহ আরও বিভিন্ন সুবিধা দেওয়ার বিধান রয়েছে।
সরকারি বাসভবন ও আনুষঙ্গিক ব্যয়
রাষ্ট্রপতির সরকারি বাসভবন বঙ্গভবন। আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির জন্য একটি সরকারি বাসভবন থাকবে এবং সেই বাসভবনের আসবাবপত্র, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় ব্যয় সরকার বহন করবে।
বাসভবনের বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, টেলিফোনসহ প্রয়োজনীয় সেবার খরচও রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বহন করা হয়।
এমনকি রাষ্ট্রপতি যদি সরকারি বাসভবনের পরিবর্তে নিজের বাড়ি বা অন্য কোনো বাসায় থাকার সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে রাষ্ট্রপতির মর্যাদার উপযোগী করে সেই বাসভবন প্রস্তুত করার ব্যয়ও সরকারের বহনের বিধান রয়েছে।
রাষ্ট্রপতির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও এক মাস পর্যন্ত নির্ধারিত বাসভবনে বিনা খরচে থাকার সুযোগ আইনে রাখা হয়েছে।
সরকারি গাড়ি ও পরিবহন সুবিধা
রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের জন্য রাষ্ট্রপতি প্রয়োজনীয় সরকারি যানবাহন ব্যবহারের সুবিধা পান।
আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নিজের এবং পরিবারের প্রয়োজনে উপযুক্ত পরিবহন ব্যবহারের সুযোগ পান এবং এ-সংক্রান্ত ব্যয় সরকার বহন করে।
রাষ্ট্রপতির সরকারি সফর ও সফরকালে অবস্থানের ব্যয়ও সরকারের পক্ষ থেকে বহন করা হয়। রাষ্ট্রীয় কাজে দেশের বাইরে গেলে সরকার নির্ধারিত হারে প্রয়োজনীয় ভাতা পাওয়ার বিধান রয়েছে।
বছরে ২ কোটি টাকার স্বেচ্ছাধীন অনুদান
রাষ্ট্রপতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সুবিধা হলো স্বেচ্ছাধীন অনুদান বা Discretionary Grant।
বর্তমান আইন অনুযায়ী এ খাতে রাষ্ট্রপতির জন্য বছরে ২ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে।
সরকার নির্ধারিত শর্ত অনুসারে এ অর্থ ব্যয় করা যায়। প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সহায়তাসহ অনুমোদিত উদ্দেশ্যে এই তহবিল ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।
আপ্যায়ন ও রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের ব্যয়
রাষ্ট্রপতির দায়িত্বের অংশ হিসেবে দেশি-বিদেশি অতিথিদের সঙ্গে বৈঠক, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান ও বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক কার্যক্রমে অংশ নিতে হয়।
এ জন্য রাষ্ট্রপতির আপ্যায়নসংক্রান্ত ব্যয়ের আলাদা ব্যবস্থা রয়েছে। আইন অনুযায়ী এক বছরে আপ্যায়নের জন্য যে অর্থ ব্যয় হয়, তা নির্ধারিত আপ্যায়ন ভাতার আওতায় বহন করা হয়।
রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব মর্যাদার সঙ্গে পালনের জন্য প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার বিধানও আইনে রয়েছে।
রাষ্ট্রপতি ও পরিবারের বিনা মূল্যে চিকিৎসা
রাষ্ট্রপতি ও তার পরিবারের সদস্যদের জন্য বিশেষ চিকিৎসাসুবিধাও রয়েছে।
আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ও উপযুক্ত চিকিৎসা পাওয়া যায়—বাংলাদেশের এমন হাসপাতালে রাষ্ট্রপতি ও তার পরিবার বিনা মূল্যে চিকিৎসা নিতে পারেন।
সাধারণভাবে রাষ্ট্রপতির বাসভবনেও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
রাষ্ট্রপতির চিকিৎসক প্রয়োজন মনে করলে বিদেশেও চিকিৎসা নেওয়া যায়। সে ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী চিকিৎসার ব্যয় সরকার বহন করতে পারে। বিদেশি চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণের সুযোগও আইনে রাখা হয়েছে।
বিমানযাত্রায় ২৭ লাখ টাকার বীমা কভার
রাষ্ট্রপতির বিমানযাত্রার ক্ষেত্রেও বিশেষ সুরক্ষার বিধান রয়েছে।
বর্তমানে বিমানযাত্রার জন্য রাষ্ট্রপতিকে সরকারিভাবে বছরে ২৭ লাখ টাকার বীমা কভার দেওয়া হয়। ২০১৬ সালের সংশোধনের আগে এ বীমা কভারের পরিমাণ ছিল ১৫ লাখ টাকা।
অর্থাৎ ২৭ লাখ টাকা সরাসরি বিমানভ্রমণের জন্য নগদ ভাতা নয়; এটি রাষ্ট্রপতির বিমানযাত্রার জন্য বার্ষিক বীমা সুরক্ষা।
রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা
বেতন ও রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধার পাশাপাশি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ।
সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান এবং রাষ্ট্রের অন্য সব ব্যক্তির ওপর মর্যাদাগতভাবে অগ্রাধিকার পান।
তবে বাংলাদেশের সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি অধিকাংশ দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী পালন করেন।
সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদে দুটি ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে—প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ এবং প্রধান বিচারপতি নিয়োগ।
প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের ক্ষেত্রেও সংবিধানের অন্যান্য বিধান প্রযোজ্য। সাধারণভাবে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন রয়েছে এমন সংসদ সদস্যকেই রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করেন।
দণ্ড মওকুফের ক্ষমতা
রাষ্ট্রপতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ক্ষমতা হলো দণ্ড মার্জনা বা কমানোর ক্ষমতা।
সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের দেওয়া সাজা রাষ্ট্রপতি মার্জনা করতে পারেন। একই সঙ্গে দণ্ড স্থগিত, হ্রাস বা পরিবর্তনের সাংবিধানিক ক্ষমতাও রাষ্ট্রপতির রয়েছে।
তবে এই ক্ষমতাও দেশের প্রচলিত সাংবিধানিক ও আইনি কাঠামোর মধ্যে প্রয়োগ করা হয়।
রাষ্ট্রপতির দায়মুক্তি
দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রপতির বিশেষ সাংবিধানিক সুরক্ষা রয়েছে।
সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি তার দায়িত্ব পালনের সময় করা বা না করা কোনো কাজের জন্য আদালতে ব্যক্তিগতভাবে জবাবদিহি করতে বাধ্য নন।
তার কার্যকাল চলাকালে রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি কার্যক্রম শুরু বা চালিয়ে নেওয়া যায় না। একই সময়ে তাকে গ্রেপ্তার বা কারাগারে পাঠানোর জন্য আদালত কোনো প্রক্রিয়াও জারি করতে পারে না।
তবে এর অর্থ এই নয় যে রাষ্ট্রপতিকে কোনো পরিস্থিতিতেই পদ থেকে সরানো যাবে না।
অভিশংসনের মাধ্যমে অপসারণ
সংবিধান লঙ্ঘন অথবা গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগে রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসনের মুখোমুখি করা যেতে পারে।
এ ধরনের প্রস্তাব আনতে সংসদের মোট সদস্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের স্বাক্ষরযুক্ত নোটিশ স্পিকারের কাছে জমা দিতে হয়।
অভিযোগের বিষয়ে রাষ্ট্রপতির আত্মপক্ষ সমর্থন ও প্রতিনিধিত্ব করার অধিকার রয়েছে।
পরবর্তী সময়ে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে উল্লেখ করে সংসদের মোট সদস্যের কমপক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে প্রস্তাব গৃহীত হলে রাষ্ট্রপতিকে পদ ছাড়তে হয়।
শারীরিক বা মানসিক অসামর্থ্যের কারণেও সংবিধানের পৃথক বিধান অনুসরণ করে রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসা বোর্ড গঠনসহ নির্ধারিত সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।
রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পাঁচ বছর
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির কার্যকালের মেয়াদ পাঁচ বছর।
তবে পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হলেও নতুন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত বিদায়ী রাষ্ট্রপতি দায়িত্বে থাকতে পারেন।
একই ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হতে পারেন। এই দুই মেয়াদ পরপর হওয়া বাধ্যতামূলক নয়।
সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বাংলাদেশের ইতিহাসে পরপর দুই মেয়াদে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।
সব মিলিয়ে মাসিক ১ লাখ ২০ হাজার টাকা বেতনের পাশাপাশি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি সরকারি বাসভবন, পরিবহন ও সফর সুবিধা, চিকিৎসা, আপ্যায়ন, বছরে ২ কোটি টাকার স্বেচ্ছাধীন অনুদান এবং বিমানযাত্রায় ২৭ লাখ টাকার বার্ষিক বীমা কভারসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকেন।
একই সঙ্গে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তার রয়েছে সংবিধান নির্ধারিত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব, ক্ষমতা ও বিশেষ সুরক্ষা।









