আয়েশা সিদ্দীকা
শিক্ষার্থী, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি | প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬, ০৭:০২ | প্রথম আলো
আমার জন্মের সময় বাবা দেশেই ছিলেন না, ছিলেন এক দূর প্রবাসে—জাতিসংঘের মিশনে। স্বাভাবিকভাবেই আমার শৈশবের পুরোটা জুড়ে ছিলেন ছোট কাকু। তাঁর কোল আর সীমাহীন আদরে বড় হতে হতে মনের ভেতরে বাবার একটা কাল্পনিক অবয়ব তৈরি হয়েছিল। কিন্তু যখন বাস্তবের বাবার মুখোমুখি হলাম, সেই কল্পনার সঙ্গে তাঁর বিন্দুমাত্র মিল খুঁজে পেলাম না।
মিশন শেষ করে বাবা যখন বাড়ি ফিরলেন, তখন তিনি পবিত্র উমরাহ শেষ করে এসেছেন। গায়ে জড়ানো ছিল মস্ত বড় এক সাদা আলখাল্লা আর জোব্বা। অতটুকু আমি হুট করে এই মানুষটাকে দেখে এতটাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম যে চিৎকার করে কেঁদে উঠেছিলাম। সেই ভয়ের চোটে সেদিন রাতে আমার গায়ে ধুম জ্বর চলে আসে। এরপর থেকে বাবা যখনই ছুটি নিয়ে বাড়ি আসতেন, আমি দূর দূর দিয়ে চলতাম। কাছে যাওয়ার সাহস পেতাম না, শুধু আড়াল থেকে দেখতাম। ঘরের এক কোণায় বাবা বসলে আমি অন্য কোণায় গিয়ে লুকিয়ে থাকতাম। সবাই ভাবত আমি বুঝি বাবাকে খুব ভয় পাই; কিন্তু আজ বড় হয়ে বুঝি—ওটা আসলে ভয় ছিল না। ওটা ছিল এক অদ্ভুত দ্বিধা আর মনের ভেতরে থাকা তীব্র সংকোচ, যার কারণে একজন চেনা মানুষকেও আপন করে নিতে পারছিলাম না।
‘জুজু’ লোকটা কোথায়?
তখন আমার বয়স বড়জোর চার কি পাঁচ বছর। বাবা আবারও একদিন ছুটি কাটাতে বাড়ি এলেন। আমার সারাদিনের কাজ ছিল তাঁর আশেপাশে ঘুরঘুর করা, কিন্তু একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে। কোনো এক অজানা টানে কাছে যেতাম না। তবে প্রতিদিন বিকেলের পর থেকে একটা মধুর অপেক্ষা শুরু হতো। সন্ধ্যা নামার ঠিক আগে অধীর আগ্রহে পথ চেয়ে বসে থাকতাম—কখন সেই ‘জুজু’ (বাবা) বাইরে থেকে ঘরে ফিরবেন আর পকেট হাতড়ে বের করবেন আমার প্রিয় মিল্ক ক্যান্ডি। মিষ্টির প্রতি সেই লোভ আর বাবার প্রতি এক অদ্ভুত কৌতূহল—দুটোই তখন মনের ভেতর ডালপালা মেলছিল।
একদিন বাবার ছুটি ফুরিয়ে এলো, তাঁর চলে যাওয়ার দিন হাজির হলো। দুপুর গড়িয়ে গেলেও বাবাকে কোথাও দেখতে না পেয়ে আমি সোজা দাদির কাছে চলে গেলাম। খুব গম্ভীর মুখে জিজ্ঞেস করলাম, ‘জুজু লোকটা কোথায়?’ আমার মুখে এমন কথা শুনে বাড়ির সবার হাসির রোল পড়ে গেল। দাদি তো হাসতে হাসতে বলেই ফেললেন, ‘বাবার কোলে তো কোনোদিন যাস না, তাহলে এখন এত খোঁজ কেন করছিস?’ সেদিন নাকি আমি খুব সাবলীলভাবে উত্তর দিয়েছিলাম, ‘আমি কোলে যাব না ঠিক আছে। কিন্তু সে তো আমার সামনে থাকবে, আমি চোখ ভরে দেখব।’
আজ এত বছর পেরিয়ে এসে যখন পেছনের দিনগুলোর দিকে তাকাই, মনে হয় বাবার প্রতি আমার প্রথম অনুভূতিটা কোনো ভয় বা ভালোবাসা ছিল না; ওটা ছিল এক অবাধ্য ‘অভ্যাস’। যে মানুষটাকে ছেলেবেলায় জুজু ভেবে এড়িয়ে চলতাম, কীভাবে যেন তাঁর উপস্থিতিটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় নিরাপদ আশ্রয় হয়ে উঠেছিল। ছোটবেলার সেই স্বভাবটা বোধহয় এখনো বদলায়নি; বাবার প্রতি ভালোবাসাটা আজও মনের এক কোণায় লুকিয়ে আছে, কখনো মুখ ফুটে ‘ভালোবাসি’ বলা হয়ে ওঠেনি।
ছোট কাকু: স্মৃতির পাতায় হারিয়ে যাওয়া আরেকজন ‘বাবা’
যার আঙুল ধরে আমি ‘বাবা’ শব্দটার গভীরতা প্রথম অনুভব করেছিলাম, আমার সেই পরম শ্রদ্ধেয় ছোট কাকু আজ আর আমাদের মাঝে নেই। তিনি চলে যাওয়ার পর থেকে পরম আদরের সেই ‘আম্মাজি’ ডাকটা আর কেউ আমাকে ডাকে না। ঈদের আগে নতুন নতুন চকচকে নোট জমিয়ে রেখে আমাকে সারপ্রাইজ দেওয়ার মতো মানুষটাও চিরতরে হারিয়ে গেছে।
কাকু যখন জীবনের শেষ দিনগুলোয় হাসপাতালের বিছানায় ছটফট করছিলেন, তখন আমি মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার জন্য দিনরাত এক করে প্রস্তুতি নিচ্ছি। একদিন মলিন মুখে তিনি আমায় বলেছিলেন, ‘আমাদের মিম একদিন অনেক বড় ডাক্তার হবে, তখন এসে আমার চিকিৎসা করবে।’ শেষ পর্যন্ত আমার আর ডাক্তার হওয়া হয়ে ওঠেনি, নাকি সেই সুযোগ আসার আগেই কাকু আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন—এই দুটির মধ্যে কোনটা বেশি কষ্টের আর বেদনার, আজ অবধি আমি সেই হিসাব মেলাতে পারিনি।
জীবনের সবচেয়ে গভীর এবং পবিত্রতম ভালোবাসাগুলো বোধহয় আমরা কখনো মুখে উচ্চারণ করে বোঝাতে পারি না। তবু প্রতিদিন যখন মোনাজাতে হাত তুলে বলি—‘রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বায়ানি সাগিরা’, তখন অবচেতন মনেই আমার দুজন বাবার মুখ চোখের সামনে ভেসে ওঠে। একজন আজ ওপারে চলে গেছেন, আর অন্যজন এখনো এই পৃথিবীতে আমার বটবৃক্ষ হয়ে বেঁচে আছেন। মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা—তিনি যেন আমার দুই বাবাকেই তাঁর অসীম রহমত, ক্ষমা আর মাগফিরাতের ছায়াতলে নিরাপদে রাখেন।
তথ্যসূত্র: স্বপ্ন নিয়ে, প্রথম আলো অনলাইন সংস্করণ








