GULF BANGLA বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন +880 1755727432
Home / আন্তর্জাতিক / যুদ্ধের ছয় মাসে ইরানে বদলে গেছে মানুষের জীবন

যুদ্ধের ছয় মাসে ইরানে বদলে গেছে মানুষের জীবন

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর ছয় মাসের বেশি সময় পর ইরানের মানুষের জীবন কঠিন হয়ে উঠেছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। কমেছে মানুষের আয়। রেকর্ড দরপতন হয়েছে দেশটির মুদ্রার।

কাতারভিত্তিক আল জাজিরার প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে।

তবে প্রায় ৯ কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন এখন অনেক কঠিন।

তেহরানের তরুণী মারজান বলেন, তিনি এমন জীবন চান যেখানে প্রতিদিন সংঘাত নিয়ে ভাবতে হবে না।

তিনি আরও চান, বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে।

কিন্তু সেই সুযোগ এখন নেই বলে হতাশা প্রকাশ করেন তিনি।

ইরানের রাজনীতিতে কী বদলেছে?

২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শুরু হয়।

হামলায় ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন।

ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারাও নিহত হন।

এরপরও ইরানের সরকার টিকে থাকে।

পরে মোজতাবা খামেনি নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হন।

তবে তিনি এখনো খুব বেশি জনসম্মুখে আসছেন না।

এ সময় ইরানের সামরিক বাহিনীতেও বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে।

সরকারের ভেতরে যুদ্ধ নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে।

এক পক্ষ কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে।

অন্য পক্ষ যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চায়।

তবে দুই পক্ষই একটি বিষয়ে একমত।

তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের কাছে আত্মসমর্পণ করতে চায় না।

হরমুজ নিয়েও উত্তেজনা

হরমুজ প্রণালি নিয়েও ইরানের সঙ্গে ওমানের একটি সমঝোতা হয়েছে বলে দাবি করেছে তেহরান।

যুদ্ধের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে জাহাজ চলাচল কমেছে।

তবে মার্কিন প্রশাসন এই সমঝোতার বিরোধিতা করছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

ওয়াশিংটন চায়, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি উন্মুক্ত থাকুক

পারমাণবিক কর্মসূচিসহ বিভিন্ন বিষয়েও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে।

আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীরা দুই দেশের মধ্যে আলোচনা শুরুর চেষ্টা করছেন।

তবে এখনো বড় কোনো অগ্রগতি হয়নি।

মূল্যস্ফীতিতে বিপর্যস্ত মানুষ

যুদ্ধের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনাও ইরানের অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করেছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা।

ইরানের মর্দাদ মাস ২২ আগস্ট শেষ হয়েছে।

সেই মাসে দেশটির পরিসংখ্যান কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮৯ শতাংশ

খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি ছিল ১২৭ শতাংশের বেশি

তেহরানের একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন বিজান।

তিনি জানান, প্রায় তিন বছর আগে চাকরিতে যোগ দেওয়ার সময় তার মাসিক বেতন ছিল ১ হাজার ডলারের বেশি মূল্যের সমান।

এখন তিনবার বেতন বাড়লেও এর প্রকৃত মূল্য ৫০০ ডলারের নিচে নেমে গেছে।

৩৩ বছর বয়সী বিজান বলেন, পরিস্থিতি প্রতিদিন খারাপ হচ্ছে।

এ কারণে তিনি মাঝে মাঝে ভাবেন, এক দশকের বেশি সময় আগে ইরান ছেড়ে গেলে জীবন অন্যরকম হতে পারত।

রিয়ালের রেকর্ড দরপতন

ইরানের মুদ্রা রিয়ালও বড় ধরনের দরপতনের মুখে পড়েছে

শনিবার তেহরানের খোলা বাজারে এক মার্কিন ডলারের দাম উঠেছে ২০ লাখ ৬০ হাজার রিয়ালে।

এটি রিয়ালের ইতিহাসে সর্বনিম্ন মূল্য।

মুদ্রার দরপতনের কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়েছে।

তেল ও বিদ্যুৎ সংকট

যুদ্ধের সময় ইরানের তেল ও গ্যাস স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পেট্রোকেমিক্যাল ও ইস্পাত কারখানাও।

বিদ্যুৎ অবকাঠামোও হামলার বাইরে থাকেনি।

বাড়িঘর, বন্দর, বিমানবন্দর ও সেতুতেও ক্ষতি হয়েছে।

বিশাল জ্বালানি সম্পদ থাকা সত্ত্বেও ইরানে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট বাড়ছে

শীত মৌসুম সামনে রেখে গ্যাসের ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য জ্বালানি বরাদ্দও কমানো হয়েছে।

আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পেট্রলের দাম বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে সরকার।

সমাজে বাড়ছে সরকারি নিয়ন্ত্রণ

যুদ্ধের মধ্যে ইরান সরকার সামাজিক ঐক্যের ওপর জোর দিচ্ছে।

সাধারণ মানুষ প্রকাশ্যে মতামত দিতে সতর্ক থাকছেন।

তবে সরকারের ভেতরের মতপার্থক্য বিভিন্ন বক্তব্যে প্রকাশ পাচ্ছে।

মোজতাবা খামেনির নামে প্রকাশিত এক লিখিত বার্তায় বলা হয়েছে, সামাজিক সংহতি ক্ষতিগ্রস্ত করে এমন কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ।

অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, সরকার বড় ধরনের আর্থিক সমস্যার মধ্যে রয়েছে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতি করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

এমনকি সরকার তেল বিক্রি করতেও সমস্যায় পড়ছে বলে জানান তিনি।

এদিকে বিচার ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়িয়েছে।

সরকারি অবস্থানের সঙ্গে না মেলা বক্তব্য বা কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধেও অভিযান চলছে।

প্রতি সপ্তাহে নতুন করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর আসছে।

এর মধ্যে আগের যুদ্ধ ও সরকারবিরোধী বিক্ষোভে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরাও রয়েছেন।

জাতিসংঘ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন এসব মৃত্যুদণ্ডের নিন্দা জানিয়েছে।

আবারও কঠোর হচ্ছে হিজাব আইন

ইরানে বাধ্যতামূলক হিজাব আইন আরও কঠোরভাবে প্রয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

২০২২ ও ২০২৩ সালের বড় বিক্ষোভের কয়েক বছর পর আবারও এ বিষয়ে কড়াকড়ি বাড়ানো হচ্ছে।

এ সপ্তাহেই কয়েকটি ক্যাফে ও আইসক্রিমের দোকান বন্ধ করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

কিছু অনলাইন বিক্রেতার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা

তেহরানের আরেক বাসিন্দা সাসান বলেন, দেশের ওপর বাইরের চাপ বাড়লে ভেতরের নিয়ন্ত্রণও বাড়ে।

তিনি নিজের ভবিষ্যৎ নিয়েও হতাশা প্রকাশ করেন।

তার মতে, অনেক চেষ্টা করেও মনে হয় সবকিছু মানুষের বিরুদ্ধে যাচ্ছে।

যুদ্ধ, মূল্যস্ফীতি, মুদ্রার দরপতন ও জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি সামাজিক নিয়ন্ত্রণও বাড়ছে। ফলে ছয় মাসের যুদ্ধে ইরানের সাধারণ মানুষের জীবন অনেকটাই বদলে গেছে।

তবে এই পরিস্থিতিকে সরাসরি জলবায়ু বা অন্য কোনো একক কারণে ব্যাখ্যা করার মতো নয়। ইরানের বর্তমান সংকটে যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক দুর্বলতা এবং অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলো একসঙ্গে কাজ করছে।

Social Icons