
বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেনে মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত এক্সিম ব্যাংকের একটি প্রস্তাবের পর দেশটির ক্রস-বর্ডার ইন্টারব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেম (সিআইপিএস) এবং পান্ডা বন্ডের মাধ্যমে অর্থায়নের সুযোগ নিয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
মঙ্গলবার (৯ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংকে চীনা প্রতিনিধি দলের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এ দুটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়। বৈঠক শেষে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দেশের কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংক সিআইপিএস প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে নীতিগতভাবে কোনো বাধা থাকবে না।
এছাড়া বৈঠকে চীনের অভ্যন্তরীণ বন্ড বাজারে পান্ডা বন্ড ইস্যুর সম্ভাবনাও পর্যালোচনা করা হয়। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অর্থায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে এবং ডলারের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় পরিবর্তনের ফলে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় নতুন বিকল্পের গুরুত্ব বাড়ছে। ডলারের প্রভাব ও আধিপত্য নিয়ে চলমান বিতর্কের মধ্যেই বিভিন্ন দেশ বিকল্প লেনদেন ব্যবস্থা খুঁজছে। এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য চীনের প্রস্তাবিত উদ্যোগগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্ভাবনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এসব উদ্যোগ থেকে বাংলাদেশ কতটা বাস্তব সুবিধা পাবে, তা অনেকাংশে নির্ভর করবে চীনের সঙ্গে দেশের বাণিজ্যিক, বিনিয়োগ ও আর্থিক সহযোগিতা ভবিষ্যতে কতটা সম্প্রসারিত হয় তার ওপর। দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক যত শক্তিশালী হবে, বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থাগুলোর কার্যকারিতা ও সম্ভাব্য সুফলও তত বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
সিআইপিএস ও পান্ডা বন্ড: ডলারের বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থার পথে বাংলাদেশ?
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেনে মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত এক্সিম ব্যাংকের প্রস্তাবের পর দেশটির ক্রস-বর্ডার ইন্টারব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেম (সিআইপিএস) এবং পান্ডা বন্ডের মাধ্যমে অর্থায়নের সুযোগ নিয়ে ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে চীনা প্রতিনিধি দলের এক বৈঠকে বিষয় দুটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠক শেষে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, দেশের কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংক সিআইপিএস প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হতে চাইলে নীতিগতভাবে তাদের আপত্তি নেই। একই সঙ্গে চীনের অভ্যন্তরীণ বন্ড বাজারে পান্ডা বন্ড ইস্যুর সম্ভাবনাও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সিআইপিএস কী?
ক্রস-বর্ডার ইন্টারব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেম বা সিআইপিএস হলো চীনের কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত একটি আন্তর্জাতিক পেমেন্ট ও নিষ্পত্তি নেটওয়ার্ক, যা ২০১৫ সালে চালু হয়। এর মূল উদ্দেশ্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেনে চীনা মুদ্রা রেনমিনবি (আরএমবি) বা ইউয়ানের ব্যবহার বাড়ানো।
বর্তমানে বিশ্বব্যাপী অধিকাংশ আন্তঃদেশীয় আর্থিক লেনদেন সুইফট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থার চাহিদা বৃদ্ধির ফলে অনেক দেশ নতুন পেমেন্ট অবকাঠামোর দিকে ঝুঁকছে। এ প্রেক্ষাপটে সিআইপিএসকে আন্তর্জাতিক অর্থ লেনদেনের একটি সম্ভাবনাময় বিকল্প বা পরিপূরক ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিভিন্ন ধরনের পেমেন্ট চ্যানেল থাকা ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য ইতিবাচক। কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংক চাইলে নিজস্ব উদ্যোগে সিআইপিএসের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে এবং বর্তমানে এ বিষয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো নিয়ন্ত্রক বাধার বিষয়ও সামনে আসেনি।
কেন আলোচনায় সিআইপিএস?
বাংলাদেশের আমদানির সবচেয়ে বড় উৎস দেশ চীন। প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ পণ্য চীন থেকে আমদানি করা হলেও বাংলাদেশের রপ্তানি তুলনামূলকভাবে অনেক কম। ফলে দুই দেশের বাণিজ্যে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা রয়েছে।
বর্তমানে এ বাণিজ্যের বেশিরভাগ লেনদেনই মার্কিন ডলারে সম্পন্ন হয়। তবে ভবিষ্যতে ইউয়ানে লেনদেন বাড়ানো সম্ভব হলে ডলারের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমতে পারে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের ওপর চাপ কমানোর ক্ষেত্রেও এটি সহায়ক হতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধুমাত্র একটি নতুন পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হওয়া যথেষ্ট নয়। এর প্রকৃত কার্যকারিতা নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক বাজারে ইউয়ানের গ্রহণযোগ্যতা ও ব্যবহার কতটা বাড়ছে তার ওপর।
তাৎক্ষণিক লাভের সম্ভাবনা কতটা?
অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান বাস্তবতায় বাংলাদেশ তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের সুবিধা নাও পেতে পারে। কারণ চীনের সঙ্গে দেশের বাণিজ্য ভারসাম্যহীন হওয়ায় ইউয়ানভিত্তিক লেনদেনের জন্য পর্যাপ্ত মুদ্রা প্রবাহ এখনো গড়ে ওঠেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে চীনা বিনিয়োগ, অবকাঠামো ঋণ, শিল্পায়ন ও যৌথ অর্থনৈতিক প্রকল্প বৃদ্ধি পেলে ইউয়ানভিত্তিক আর্থিক প্রবাহও বাড়বে। তখন আন্তঃসীমান্ত লেনদেন আরও সহজ ও কার্যকর হতে পারে। অন্যথায় অধিকাংশ আন্তর্জাতিক লেনদেনের জন্য বাংলাদেশকে এখনও ডলারের ওপরই নির্ভর করতে হবে।
পান্ডা বন্ড কী?
বৈঠকে আলোচিত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল পান্ডা বন্ড। এটি চীনের অভ্যন্তরীণ বন্ড বাজারে বিদেশি সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা কিংবা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের ইস্যু করা ইউয়ানভিত্তিক ঋণপত্র।
পান্ডা বন্ডের মাধ্যমে বিদেশি প্রতিষ্ঠান বা সরকার সরাসরি চীনা বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে পারে। বাংলাদেশ ভবিষ্যতে এ ধরনের বন্ড ইস্যু করলে চীনের বৃহৎ বন্ড বাজার থেকে অর্থায়নের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
এতে বৈদেশিক অর্থায়নের উৎস আরও বৈচিত্র্যময় হবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চ সুদের ঋণের বিকল্প হিসেবে নতুন অর্থায়ন ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে। তবে এ ধরনের সিদ্ধান্ত সরকারের ঋণ ব্যবস্থাপনা ও অর্থনৈতিক কৌশলের সঙ্গে জড়িত হওয়ায় এ ক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ভূমিকাই হবে প্রধান।
পুরোনো আগ্রহে নতুন গতি
বাংলাদেশকে সিআইপিএস নেটওয়ার্কে যুক্ত করার বিষয়ে চীনের আগ্রহ নতুন নয়। এর আগে চীনের কূটনৈতিক পর্যায় থেকেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। তবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার পরিবর্তনের ফলে এখন বিষয়টি আরও বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যখন ডলারের বিকল্প লেনদেন ব্যবস্থা খুঁজছে, তখন বাংলাদেশও সম্ভাব্য সুবিধা ও ঝুঁকি বিবেচনা করে নতুন বিকল্পগুলো মূল্যায়ন করছে।
বিনিয়োগ ও অর্থায়নে নতুন সম্ভাবনা
চীনা এক্সিম ব্যাংকের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) বৈঠকেও সম্ভাব্য বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, অর্থায়ন এবং দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়গুলো আলোচনায় আসছে।
সংশ্লিষ্টদের ধারণা, ভবিষ্যতে যদি চীনা বিনিয়োগ ও প্রকল্পভিত্তিক অর্থায়ন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়, তাহলে সিআইপিএস ও পান্ডা বন্ড—উভয় ব্যবস্থাই বাংলাদেশের জন্য বাস্তব অর্থনৈতিক সুবিধা নিয়ে আসতে পারে।
সুযোগ আছে, তবে প্রস্তুতিও জরুরি
বিশেষজ্ঞদের মতে, সিআইপিএস এবং পান্ডা বন্ড বাংলাদেশের জন্য নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে। এগুলোর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক লেনদেনে বিকল্প পেমেন্ট চ্যানেল তৈরি হবে এবং বৈদেশিক অর্থায়নের উৎস আরও বহুমুখী হবে।
তবে বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেনের কেন্দ্রবিন্দু এখনও মার্কিন ডলার। ফলে ডলারের বিকল্প কোনো ব্যবস্থার কার্যকর সুবিধা পেতে হলে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, ঋণ ও আর্থিক সহযোগিতা আরও বিস্তৃত ও গভীর করতে হবে।
অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, সিআইপিএস বা পান্ডা বন্ড কোনো তাৎক্ষণিক সমাধান নয়; বরং এগুলো এমন আর্থিক অবকাঠামো, যা ভবিষ্যতে বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হলে দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে।








