দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন আগের তুলনায় অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, বিশ্বজুড়ে চলমান যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ পরিবেশকে প্রভাবিত করছে, যার প্রভাব বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোকেও মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
শুক্রবার (১২ জুন) বিকেলে অনুষ্ঠিত বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, সচিব এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব অর্থনীতি বর্তমানে একটি অস্বাভাবিক সময় অতিক্রম করছে। অতীতে যে অর্থনৈতিক কাঠামো ও ধারা কার্যকর ছিল, বর্তমানে অনেক দেশ সেখান থেকে সরে এসেছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং বিভিন্ন অঞ্চলের রাজনৈতিক অস্থিরতা আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে ধারাবাহিক চাপ সৃষ্টি করছে।
তিনি বলেন, “বৈশ্বিক পর্যায়ে নতুন নতুন সংকট তৈরি হচ্ছে, যা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে বাধাগ্রস্ত করছে। ফলে পূর্বনির্ধারিত অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়েছে।”
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী আরও বলেন, বর্তমান বিশ্বে সংঘাত ও যুদ্ধ একটি স্থায়ী বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাব থেকে কোনো দেশই পুরোপুরি মুক্ত থাকতে পারছে না। বাংলাদেশের অর্থনীতিও এর বাইরে নয়। তিনি উল্লেখ করেন, অতীত থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া বিভিন্ন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের সঙ্গে এখন বৈশ্বিক অস্থিরতার চাপও যুক্ত হয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
প্রস্তাবিত বাজেটের দর্শন ও নীতিগত ভিত্তি তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে চায়। বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে ‘সবার জন্য বাংলাদেশ’, অর্থনৈতিক গণতন্ত্র এবং নৈতিকতার ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, অপচয়নির্ভর অর্থনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে দক্ষ ও ফলপ্রসূ ব্যয় ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাই সরকারের লক্ষ্য। এ উদ্দেশ্যে ভবিষ্যতের উন্নয়ন প্রকল্প ও সরকারি ব্যয় অনুমোদনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু মানদণ্ড অনুসরণ করা হবে।
অর্থমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিটি প্রকল্প মূল্যায়নের সময় চারটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। এগুলো হলো— ব্যয়ের যথার্থতা বা ‘ভ্যালু ফর মানি’, বিনিয়োগের বিপরীতে প্রাপ্ত ফলাফল বা ‘রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট’, কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা এবং পরিবেশগত প্রভাব। তিনি বলেন, এসব সূচকের ভিত্তিতেই আগামী দিনের উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ বক্তৃতার পরিবর্তে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়াকেই তিনি বেশি গুরুত্ব দেন। তার মতে, একটি গণতান্ত্রিক সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো জনগণের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং গণমাধ্যম সেই জবাবদিহিতার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
তিনি আরও বলেন, সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য সরকার পর্যাপ্ত সময় বরাদ্দ রেখেছে, যাতে বাজেট ও অর্থনৈতিক নীতিমালা সম্পর্কে জনমনে থাকা বিভিন্ন প্রশ্নের স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া যায়।
বাজেট অধিবেশন চলাকালে গণমাধ্যমকর্মীদের ধৈর্য ও আগ্রহের প্রশংসা করে অর্থমন্ত্রী বলেন, চার ঘণ্টারও বেশি সময়ব্যাপী বাজেট উপস্থাপনা মনোযোগসহকারে অনুসরণ করা গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে। এটি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে জনগণের অংশগ্রহণ ও আগ্রহের প্রতিফলন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।









