পাঁচ বছর হয়ে গেল—আল্লামা হাফেজ জুনাইদ বাবুনগরী রহ. আমাদের মাঝে নেই। সময় এগিয়েছে, দেশের রাজনীতি ও পরিস্থিতি বদলেছে, অনেক হিসাব-নিকাশও পাল্টে গেছে। কিন্তু পাঁচ বছর পরও তাঁর রেখে যাওয়া শূন্যতা পূরণ হয়নি। বাংলাদেশের ইসলামপন্থী আন্দোলনের ইতিহাসে তাঁর সংগ্রামী জীবন আজও অমলিন হয়ে আছে।
তাঁকে স্মরণ করলে পাশাপাশি দুটি ছবি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। একদিকে হাদিসের মসনদে বসা একজন প্রখ্যাত মুহাদ্দিস, অন্যদিকে ইসলাম ও মুসলমানদের অধিকার আদায়ের প্রশ্নে রাজপথে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকা একজন আপসহীন নেতা।
শাপলা চত্বর, গ্রেপ্তার, রিমান্ড, নির্যাতন, কারাবরণ ও দীর্ঘ অসুস্থতা—জীবনের বিভিন্ন সময়ে একের পর এক কঠিন অধ্যায়ের মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁকে। এসব ঘটনা তাঁর শরীরে গভীর ক্ষত রেখে গেলেও নিজের বিশ্বাস, আদর্শ ও অবস্থান থেকে তাঁকে সরাতে পারেনি।
কারাগার থেকে ফিরে তিনি আবার হাদিসের দরস দিয়েছেন। অসুস্থ শরীর নিয়েও মানুষের সামনে কথা বলেছেন, আন্দোলনের ময়দানে নেতৃত্ব দিয়েছেন। জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত ঈমান, আদর্শ ও নিজের অবস্থানের প্রশ্নে ছিলেন অবিচল।
এই আপসহীন ও সংগ্রামী জীবনই তাঁকে লাখো মানুষের হৃদয়ে আলাদা জায়গা করে দিয়েছে।
তাই ইন্তেকালের পাঁচ বছর পর আল্লামা বাবুনগরীকে ফিরে দেখা কেবল একজন প্রয়াত আলেমকে স্মরণ করা নয়; এর সঙ্গে ফিরে আসে বাংলাদেশের ইসলামপন্থী আন্দোলনের একটি দীর্ঘ ও সংগ্রামী অধ্যায়। যেখানে ইলম, ত্যাগ, আন্দোলন, জুলুম-নির্যাতন সহ্য করা এবং নিজের অবস্থানে অটল থাকার ইতিহাস এক মানুষের জীবনে এসে মিলেছিল।
হাদিসের মসনদ থেকে আন্দোলনের ময়দানে
আল্লামা বাবুনগরীর প্রধান পরিচয় ছিল একজন প্রখ্যাত আলেম ও মুহাদ্দিস হিসেবে। দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে হাজার হাজার শিক্ষার্থী তাঁর কাছে হাদিস অধ্যয়ন করেছেন। বাবুনগর মাদরাসা থেকে হাটহাজারী মাদরাসা—জীবনের বড় একটি সময় তিনি ইলম, দরস, গবেষণা ও দ্বীনি শিক্ষার খেদমতে কাটিয়েছেন।
হাটহাজারী মাদরাসায় মুহাদ্দিস ও শায়খুল হাদিস হিসেবে দীর্ঘদিন হাদিসের দরস দিয়েছেন। দেশজুড়ে ছড়িয়ে আছেন তাঁর অসংখ্য ছাত্র ও শাগরেদ।
কিন্তু তাঁর জীবন কেবল কিতাব, দরস ও মাদরাসার চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ থাকেনি।
ইসলাম, আলেমসমাজ ও মুসলমানদের ধর্মীয় অধিকারের প্রশ্ন যখনই সামনে এসেছে, তখনই তাঁকে দেখা গেছে আন্দোলনের ময়দানে। কখনো সমাবেশের মঞ্চে, কখনো রাজপথে, কখনোবা আন্দোলনের সামনের সারিতে নেতৃত্ব দিতে।
রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম রক্ষার আন্দোলন, শিক্ষানীতিবিরোধী আন্দোলন, সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে থেমিসের মূর্তি অপসারণের আন্দোলন, ভাস্কর্যবিরোধী আন্দোলনসহ বিভিন্ন ইসলামি ইস্যুতে তিনি ছিলেন অন্যতম প্রধান নেতা।
হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সংগঠনটির শীর্ষ নেতৃত্বে উঠে আসেন তিনি। পরবর্তী এক দশকে হেফাজতের প্রায় প্রতিটি বড় আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে যায় তাঁর নাম।
শাইখুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ.-এর ইন্তেকালের পর ২০২০ সালে আল্লামা বাবুনগরী হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমীর নির্বাচিত হন। ইন্তেকালের আগ পর্যন্ত তিনি সেই দায়িত্ব পালন করেন।
তবে তাঁর সংগ্রামী জীবনের সবচেয়ে কঠিন ও আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি হয়ে আছে ২০১৩ সালের শাপলা চত্বর।
শাপলার সেই রাত
২০১৩ সালে ইসলামবিদ্বেষী অপতৎপরতার প্রতিবাদ এবং ১৩ দফা দাবি সামনে রেখে দেশজুড়ে হেফাজতে ইসলামের আন্দোলন গড়ে ওঠে। সেই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা ছিলেন আল্লামা বাবুনগরী।
৫ মে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিপুলসংখ্যক আলেম, মাদরাসার ছাত্র ও সাধারণ মানুষ রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সমবেত হন। গভীর রাতে সেখানে অভিযান চালায় তৎকালীন সরকার।
শাপলার সেই রাত আল্লামা বাবুনগরীর জীবনেও গভীর ক্ষত রেখে যায়।
পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠলেও তিনি ময়দান ছেড়ে চলে যাননি। শেষ পর্যন্ত নেতাকর্মীদের সঙ্গে ছিলেন। সেই রাতের পরই শুরু হয় তাঁর জীবনের আরেক কঠিন অধ্যায়।
পরদিন, ৬ মে রাজধানীর লালবাগ এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। ৭ মে আদালত তাঁকে ৯ দিনের রিমান্ডে পাঠান। এরপর আরও কয়েকটি মামলায় নতুন করে রিমান্ডে নেওয়া হয়।
হাদিসের মসনদে বসা একজন প্রবীণ মুহাদ্দিসের দিন কাটতে থাকে আদালত, রিমান্ড ও কারাগারে।
রিমান্ডে তাঁর ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানোর অভিযোগ ওঠে। বন্দিত্ব ও নির্যাতনের প্রভাবে তাঁর শারীরিক অবস্থা মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়ে। পরিস্থিতি একপর্যায়ে এতটাই গুরুতর হয়ে ওঠে যে, তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে তাঁর অবস্থার অবনতি এবং পরিস্থিতি নিয়ে চাপ বাড়তে থাকলে জামিনে মুক্তি পান তিনি।
কারাগার থেকে মুক্তি পেলেও শাপলার সেই অধ্যায়ের ক্ষত তাঁর জীবন থেকে আর মুছে যায়নি। রিমান্ড, বন্দিত্ব ও অসুস্থতার প্রভাব দীর্ঘদিন তাঁর শরীরে ছিল। চলাফেরাতেও সেই দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।
কিন্তু শরীর দুর্বল হলেও তাঁর অবস্থান দুর্বল হয়নি।
কারাগার ও রিমান্ড থেকে ফিরে আবার হাদিসের মসনদে বসেছেন তিনি। আবার দরস দিয়েছেন, মানুষের সামনে কথা বলেছেন এবং আন্দোলনের ময়দানে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
শাপলা তাঁর কাছে কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনা ছিল না; এর মূল্য তাঁকে নিজের শরীর দিয়েও দিতে হয়েছিল।
শাপলার পর হেফাজতের ভেতরে সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক ও আন্দোলনের কৌশল নিয়ে নানা হিসাব-নিকাশ শুরু হয়। একদল নেতা সরকারের সঙ্গে সমঝোতার পথে এগোলেও আল্লামা বাবুনগরী সেই পথে হাঁটেননি। আওয়ামী লীগ সরকারের ভূমিকা নিয়ে তিনি প্রকাশ্যে কথা বলেছেন এবং শাপলার স্মৃতি ভুলে যেতে দেননি।
জেল তাঁকে থামাতে পারেনি। রিমান্ড তাঁর কণ্ঠ স্তব্ধ করতে পারেনি। অসুস্থতাও তাঁকে দীর্ঘদিন আন্দোলনের ময়দান থেকে সরিয়ে রাখতে পারেনি।
কোনো শক্তি, ভয় কিংবা প্রলোভনের কাছে মাথা নত না করাই ছিল তাঁর রাজনৈতিক ও আন্দোলনী জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, শিক্ষানীতি, মূর্তি ও ভাস্কর্য, ইসলাম ও মুসলমানদের অধিকার এবং আলেমদের ওপর দমন-পীড়নের প্রশ্নে তাঁর কণ্ঠ বারবার উচ্চারিত হয়েছে।
এই আপসহীনতাই তাঁর সংগ্রামী জীবনের অন্যতম প্রধান পরিচয় হয়ে আছে।
ইনসাফের সঙ্গে আল্লামা বাবুনগরী
আল্লামা বাবুনগরীর চিন্তা কেবল রাজপথের আন্দোলনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ইসলাম, মুসলমান এবং মুসলিম বিশ্বের কথা মানুষের সামনে শক্তভাবে তুলে ধরতে একটি কার্যকর ও শক্তিশালী সংবাদমাধ্যমের প্রয়োজনীয়তাও তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন।
২০১৪ সালে ইনসাফ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান ও দিকনির্দেশনা ছিল। প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে এগোবে, কোন আদর্শ ও লক্ষ্য সামনে রেখে কাজ করবে—শুরু থেকেই এসব বিষয়ে তিনি দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।
ইনসাফ প্রতিষ্ঠার পর তিনি প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ইন্তেকাল পর্যন্ত সেই দায়িত্বে ছিলেন।
তবে তাঁর ভূমিকা শুধু চেয়ারম্যানের পদে সীমাবদ্ধ ছিল না। ইনসাফের প্রতিষ্ঠা, গড়ে ওঠা ও পরবর্তী পথচলায় তিনি ছিলেন একজন অভিভাবক ও দিকনির্দেশক।
ইনসাফের প্রতি তাঁর স্নেহ যেমন ছিল, তেমনি প্রত্যাশাও ছিল অনেক। ইনসাফ আরও শক্তিশালী হোক, ইসলাম ও মুসলমানদের কথা সাহসের সঙ্গে মানুষের সামনে তুলে ধরুক—এই আকাঙ্ক্ষা তিনি বিভিন্ন সময়ে প্রকাশ করেছেন।
২০১৮ সালে ইনসাফের চতুর্থ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে দেওয়া বক্তব্যে তিনি ইনসাফকে ইসলামী মিডিয়া জগতে একটি বিপ্লব ও ইনকিলাব হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
একই বক্তব্যে মুসলিম উম্মাহর জন্য বাস্তবমুখী, তথ্যনির্ভর ও শক্তিশালী মিডিয়া গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি। উলামায়ে কেরামকে শ্রম, মেধা, পরামর্শ ও অর্থ দিয়ে এই ময়দানে ভূমিকা রাখার আহ্বানও জানিয়েছিলেন।
মিডিয়ার শক্তি সম্পর্কে তাঁর উপলব্ধি ছিল স্পষ্ট। তিনি বিশ্বাস করতেন, মুসলমানদের অধিকার, সংকট ও বক্তব্য মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে নিজেদের শক্তিশালী সংবাদমাধ্যম প্রয়োজন। রাজপথে যেমন নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে হয়, সংবাদ ও জনমতের ময়দানেও তেমনি নিজেদের কণ্ঠকে শক্তিশালী করতে হয়।
ইনসাফের ইতিহাসে তাই আল্লামা বাবুনগরী কেবল একজন চেয়ারম্যানের নাম নন। প্রতিষ্ঠানটির জন্ম, গড়ে ওঠা ও পথচলার সঙ্গে তাঁর অবদান জড়িয়ে আছে। ইন্তেকালের আগ পর্যন্ত তাঁর দিকনির্দেশনা, স্নেহ ও অভিভাবকত্ব ইনসাফের ইতিহাসেরই একটি অংশ।
২০২১: জীবনের শেষ কঠিন অধ্যায়
শাইখুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ.-এর ইন্তেকালের পর হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমীরের দায়িত্ব নেন আল্লামা বাবুনগরী। কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার পর স্বস্তিতে সংগঠন পরিচালনার সুযোগ তিনি খুব বেশি পাননি।
তাঁর নেতৃত্বাধীন হেফাজতের ওপর ক্রমেই বাড়তে থাকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপ।
এর সবচেয়ে কঠিন অধ্যায় আসে ২০২১ সালে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের প্রতিবাদে দেশজুড়ে আন্দোলন শুরু হয়। আলেম-উলামা, মাদরাসার ছাত্র এবং সাধারণ মানুষের একটি অংশ রাজপথে নেমে আসে।
আন্দোলনের সময় হাটহাজারী, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
এরপর হেফাজতে ইসলাম এবং সংগঠনটির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান শুরু হয়।
একটির পর একটি মামলায় শীর্ষ আলেম ও হেফাজত নেতাদের গ্রেপ্তার করা হতে থাকে। অনেককে রিমান্ড ও কারাগারে পাঠানো হয়। বয়োবৃদ্ধ ও অসুস্থ আলেমরাও এই পরিস্থিতির বাইরে ছিলেন না।
কেউ কারাগারে, কেউ রিমান্ডে; কারও বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা। কারাগারে থাকা অনেক আলেমের অসুস্থতার খবরও আসতে থাকে। তাঁদের পরিবার থেকেও শোনা যায় অসহায়ত্বের কথা।
এই পরিস্থিতির বড় চাপ এসে পড়ে আল্লামা বাবুনগরীর ওপর।
একদিকে তাঁর নেতৃত্বাধীন হেফাজতের সাংগঠনিক সংকট, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের সহযোদ্ধা ও দেশের পরিচিত আলেমদের একের পর এক কারাবরণ—চারদিকে মামলা, গ্রেপ্তার, রিমান্ড ও চাপ।
কিন্তু এমন কঠিন সময়েও তিনি নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেননি।
কারাবন্দি আলেম-উলামাদের মুক্ত করা তাঁর অন্যতম প্রধান চিন্তায় পরিণত হয়। সরকারের কাছে বারবার তাঁদের মুক্তি দাবি করেছেন। মামলা প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়েছেন। বয়োবৃদ্ধ ও অসুস্থ আলেমদের কারাগারে রাখার প্রতিবাদ করেছেন।
নিজের বয়স ও শারীরিক অসুস্থতা উপেক্ষা করেও তাঁদের মুক্তির জন্য চেষ্টা চালিয়ে গেছেন।
এই চাপ তিনি শুধু সাংগঠনিকভাবেই বহন করেননি; এর প্রভাব পড়েছিল তাঁর শরীরেও।
শাপলার সময়কার রিমান্ড ও বন্দিত্বের ক্ষত তখনও তাঁর শরীরে ছিল। বয়স বেড়েছিল। নানা রোগে আগে থেকেই দুর্বল ছিলেন। তার ওপর সহযোদ্ধাদের গণগ্রেপ্তার, কারাগারে থাকা আলেমদের কষ্ট, তাঁদের পরিবারের আর্তনাদ এবং সংগঠনের ওপর অব্যাহত চাপ তাঁকে আরও দুর্বল করে তুলেছিল।
শরীর ক্রমেই ভেঙে পড়ছিল।
তারপরও তিনি থামেননি।
ইন্তেকালের অল্প সময় আগেও তাঁর কণ্ঠে ছিল কারাবন্দি আলেমদের মুক্তির দাবি। যে মানুষটি নিজে শাপলার পর কারাগার, রিমান্ড ও নির্যাতনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গিয়েছিলেন, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাঁকেই আবার লড়তে হয়েছে কারাবন্দি সহযোদ্ধাদের মুক্তির জন্য।
নিজের অসুস্থ শরীরের চেয়েও তখন তাঁর কাছে বড় হয়ে উঠেছিল সহযোদ্ধাদের মুক্তির চিন্তা।
জীবনের শেষ সময়টি তাই আল্লামা বাবুনগরীর জন্য শুধু অসুস্থতার সময় ছিল না। এটি ছিল রাজনৈতিক চাপ, আলেমদের গ্রেপ্তার, মামলা-রিমান্ড, সহযোদ্ধাদের দুর্দশা এবং তাঁদের মুক্তির জন্য শেষ পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার এক কঠিন অধ্যায়।
বিদায়
এই প্রবল চাপ ও দুশ্চিন্তার মধ্যেই আসে ২০২১ সালের ১৯ আগস্ট।
হাটহাজারীতে অসুস্থ হয়ে পড়ার পর আল্লামা বাবুনগরীকে দ্রুত চট্টগ্রামের সিএসসিআর হাসপাতালে নেওয়া হয়। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সেখানেই তিনি ইন্তেকাল করেন।
ইন্তেকালের সংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ হাটহাজারীর দিকে ছুটতে শুরু করেন।
আলেম, ছাত্র, বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মী, ভক্ত-অনুসারী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষও তাঁকে শেষবারের মতো দেখতে সেখানে পৌঁছান।
যে হাটহাজারীতে জীবনের দীর্ঘ সময় তিনি হাদিস পড়িয়েছেন, যে হাটহাজারী থেকে তাঁর বহু আন্দোলনের ডাক ছড়িয়ে পড়েছিল সারা দেশে—শেষবারের মতো সেখানেই ফিরে আসেন তিনি।
সেদিন আর কোনো দরস ছিল না।
কোনো সমাবেশও ছিল না।
ছিল শুধু প্রিয় মানুষটিকে শেষ বিদায় জানানোর জন্য মানুষের ঢল।
মানুষের উপস্থিতিতে জানাজাস্থল জনসমুদ্রে পরিণত হয়। পরে হাটহাজারী মাদরাসার কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।
সেই জনসমুদ্র ছিল তাঁর প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও আস্থার এক গভীর প্রকাশ।
পাঁচ বছর পরও যে শূন্যতা
পাঁচ বছর পেরিয়ে গেছে।
দেশের রাজনীতি বদলেছে। ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে। অনেক হিসাব-নিকাশও পরিবর্তিত হয়েছে।
কিন্তু আল্লামা বাবুনগরীর রেখে যাওয়া শূন্যতা আজও পূরণ হয়নি।
এখনও তাঁকে স্মরণ করলে হাদিসের মসনদে বসা সেই মুহাদ্দিসের ছবি সামনে আসে। একই সঙ্গে চোখের সামনে ভেসে ওঠে আন্দোলনের ময়দানে দাঁড়িয়ে থাকা দৃঢ়চেতা মানুষটির মুখ।
শাপলা থেকে কারাগার, রিমান্ড থেকে অসুস্থতা, আবার সেখান থেকে মাদরাসা ও আন্দোলনের ময়দানে ফিরে আসা—তাঁর সংগ্রামী জীবনের এসব অধ্যায় আজও মানুষের স্মৃতিতে অমলিন।
জীবনের শেষ প্রান্তেও তাঁকে দেখতে হয়েছে সহযোদ্ধাদের গ্রেপ্তার ও কারাবরণ। নিজের অসুস্থ শরীর নিয়েও শেষ পর্যন্ত তাঁদের মুক্তির চেষ্টা চালিয়ে গেছেন।
আল্লামা বাবুনগরীর সংগ্রামের ইতিহাস বাংলাদেশের ইসলামপন্থী আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে মিশে আছে। এমন এক অধ্যায়, যেখানে হাদিসের একজন মুহাদ্দিসকে ইসলাম ও মুসলমানদের অধিকারের প্রশ্নে বারবার রাজপথে নামতে হয়েছে; কারাগারে যেতে হয়েছে; রিমান্ড ও নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে; অসুস্থ শরীর নিয়েও নিজের অবস্থানে অটল থাকতে হয়েছে।
তিনি রেখে গেছেন হাজার হাজার ছাত্র।
রেখে গেছেন ইলমি খেদমত ও গ্রন্থের উত্তরাধিকার।
রেখে গেছেন আন্দোলন ও সংগ্রামের স্মৃতি।
রেখে গেছেন শক্তিশালী সংবাদমাধ্যম গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার উপলব্ধি।
আর সবচেয়ে বড় কথা—রেখে গেছেন নিজের ঈমান, আদর্শ ও অবস্থানে অবিচল থাকার এক দীর্ঘ ইতিহাস।
পাঁচ বছর ধরে তিনি আমাদের মাঝে নেই।
তাঁর দরস নেই।
সেই দৃঢ় কণ্ঠ নেই।
আন্দোলনের ময়দানে তাঁর উপস্থিতিও নেই।
কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া শূন্যতা রয়ে গেছে।
শাপলা চত্বরের কথা উঠলে, আলেমদের ওপর জুলুম-নির্যাতনের ইতিহাস সামনে এলে কিংবা বাংলাদেশের ইসলামপন্থী আন্দোলনের আপসহীন নেতৃত্বের ইতিহাস ফিরে দেখা হলে আজও সামনে আসে একটি নাম—
আল্লামা হাফেজ জুনাইদ বাবুনগরী রহ.।
হাদিসের মসনদ থেকে রাজপথ, শাপলা থেকে কারাগার—জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত নিজের বিশ্বাস ও অবস্থানে অবিচল ছিলেন তিনি।
তাঁর সেই সংগ্রামী জীবন আজও মানুষের স্মৃতিতে অমলিন।
আল্লাহ তায়ালা তাঁকে মাগফিরাত দান করুন এবং জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা নসিব করুন। আমিন।









