Home / শিক্ষা ও ক্যারিয়ার / চাকরি / সরকারি চাকরিজীবীদের পে-স্কেল ব্যবস্থা কেন অপরিহার্য?

সরকারি চাকরিজীবীদের পে-স্কেল ব্যবস্থা কেন অপরিহার্য?

আশিক মিয়া এইচএসসি পাস করার পর অষ্টম শ্রেণি পাস প্রার্থীদের জন্য প্রকাশিত একটি সরকারি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে আবেদন করেন। ২০০৩ সালে তিনি সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। সেই হিসেবে চাকরি জীবনের প্রায় ২৩ বছর পার করেছেন।

কয়েক দিন আগে মাছের বাজারে হঠাৎ তার সঙ্গে দেখা। তিনি তেলাপিয়া মাছ কিনছিলেন। আমাকে দেখেই যেন কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন। চোখে চোখ না মিলিয়েই বললেন, “বন্ধু, পরে কথা বলব। এখন একটু ব্যস্ত আছি।”

উল্লেখ্য, আমি ও সেলিম স্কুলজীবনের সহপাঠী ছিলাম। তিনি চলে যাওয়ার পর কৌতূহলবশত আমি মাছ বিক্রেতার কাছে জানতে চাইলাম, “ভাই, তেলাপিয়া মাছের কেজি কত?”

আমার প্রশ্নের জবাবে মাছ বিক্রেতা বললেন, “তেলাপিয়া মাছের দাম কেজিপ্রতি ৫০ টাকা।”

আমি অবাক হয়ে বললাম, “মাছ থেকে তো বেশ গন্ধ আসছে!”

মাছ বিক্রেতা জবাব দিলেন, “মাছটা একটু নরম হয়ে গেছে বলেই কম দামে বিক্রি করছি। না হলে এই মাছের দাম ১৫০ টাকার কম হতো না।”

তার কথা শুনে হঠাৎ সেলিমের আচরণের কারণটা পরিষ্কার হয়ে গেল। হয়তো আমাকে দেখে সে অস্বস্তিতে পড়েছিল। দীর্ঘ চাকরি জীবনের পরও তাকে সংসারের হিসাব মেলাতে এমন কমদামি ও নিম্নমানের মাছ কিনতে হচ্ছে— এ বাস্তবতা হয়তো সে প্রকাশ করতে চায়নি।

আসলে একটি রাষ্ট্রের কার্যক্রম সচল রাখার পেছনে সরকারি চাকরিজীবীদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, রাজস্ব সংগ্রহ, কৃষি উন্নয়ন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা কিংবা অবকাঠামো নির্মাণ— প্রায় সব ক্ষেত্রেই তাদের সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু যদি বছরের পর বছর তাদের বেতন কাঠামো জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তাহলে তার নেতিবাচক প্রভাব শুধু কর্মচারীদের ওপর নয়, জনসেবার মানের ওপরও পড়ে। তাই যুগোপযোগী পে-স্কেল কোনো অতিরিক্ত সুবিধা নয়, বরং সময়ের প্রয়োজন।

বাংলাদেশে সর্বশেষ জাতীয় বেতন স্কেল চালু হয় ২০১৫ সালে। এরপর দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও নতুন কোনো বেতন কাঠামো কার্যকর হয়নি। অথচ এই সময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ব্যয়, শিক্ষাখরচ এবং যাতায়াত ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে সরকারি চাকরিজীবীদের প্রকৃত আয় আগের তুলনায় অনেকটাই কমে গেছে।

একজন সরকারি কর্মচারীর বেতন শুধু তার ব্যক্তিগত খরচের জন্য নয়; এর ওপর নির্ভর করে পুরো পরিবারের জীবনযাত্রা। মাস শেষে প্রাপ্ত আয় দিয়ে তাকে খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, বিদ্যুৎ, গ্যাস, ইন্টারনেট ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয় বহন করতে হয়। কিন্তু যখন বাজারদর দ্রুত বাড়ে আর আয় একই অবস্থায় থাকে, তখন অর্থনৈতিক চাপ অনিবার্য হয়ে ওঠে।

বর্তমান বাস্তবতায় বিষয়টি আরও স্পষ্ট। কয়েক বছর আগে যে অর্থে একটি পরিবার স্বাচ্ছন্দ্যে মাসিক বাজার করতে পারত, এখন সেই একই বাজার করতে অনেক বেশি টাকা খরচ করতে হচ্ছে। চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস, দুধ, ডিম ও সবজিসহ প্রায় সব পণ্যের দাম বেড়েছে। পাশাপাশি বাসাভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা এবং চিকিৎসা ব্যয়ও অনেক পরিবারের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে একজন সরকারি চাকরিজীবী যদি পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতেই হিমশিম খান, তাহলে তার কাছ থেকে সর্বোচ্চ কর্মদক্ষতা প্রত্যাশা করা কঠিন। কারণ আর্থিক অনিশ্চয়তা মানুষের মানসিক প্রশান্তি ও কর্মস্পৃহা উভয়ের ওপরই প্রভাব ফেলে। তাই পে-স্কেলের বিষয়টিকে কেবল অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, মানবিক ও প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বিশেষ করে নিম্ন আয়ের সরকারি কর্মচারীরা মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় চাপের মুখে থাকেন। তাদের আয়ের বড় অংশ খাদ্য ও বাসস্থানের পেছনে ব্যয় হয়ে যায়। ফলে সঞ্চয় গড়ে তোলা তো দূরের কথা, মাস শেষে ন্যূনতম আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।

অনেকের ধারণা, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি মানেই রাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি করা। বাস্তবে বিষয়টি এতটা সরল নয়। একটি দক্ষ ও কার্যকর প্রশাসন গড়ে তুলতে মানবসম্পদে বিনিয়োগ অপরিহার্য। আর্থিকভাবে স্বস্তিতে থাকা একজন সরকারি কর্মচারী সাধারণত তার কাজে বেশি মনোযোগী হন, সিদ্ধান্ত গ্রহণে আত্মবিশ্বাসী থাকেন এবং দায়িত্ব পালনে আরও আন্তরিক ভূমিকা রাখতে পারেন। এর ইতিবাচক প্রভাব সরাসরি জনসেবার মানের ওপর পড়ে।

এছাড়া মূল্যস্ফীতির বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার। বেতনের পরিমাণ অপরিবর্তিত থাকলেও বাজারে পণ্য ও সেবার দাম বেড়ে গেলে সেই বেতনের প্রকৃত মূল্য কমে যায়। অর্থাৎ একই আয় দিয়ে আগের মতো জীবনযাপন করা সম্ভব হয় না। গত এক দশকে দ্রব্যমূল্যের ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতির কারণে সরকারি চাকরিজীবীদের ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। ফলে নতুন পে-স্কেল অনেকটাই এই বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য আনার একটি প্রয়োজনীয় উদ্যোগ।

তবে বেতন কাঠামো পুনর্নির্ধারণের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও বিবেচনায় রাখতে হবে। রাজস্ব আয়, উন্নয়ন ব্যয়, বাজেট সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে কর্মদক্ষতা, জবাবদিহি ও সেবার মান উন্নয়নের বিষয়গুলোও বেতন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে। এতে কর্মচারী ও রাষ্ট্র— উভয়েই উপকৃত হবে।

দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত ও দুর্গম অঞ্চলে কর্মরত অসংখ্য সরকারি চাকরিজীবী প্রতিদিন নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও দায়িত্ব পালন করছেন। চরাঞ্চল, উপকূল, পাহাড়ি এলাকা কিংবা সীমান্ত অঞ্চলে কর্মরত এসব কর্মকর্তা-কর্মচারীর অবদান সবসময় আলোচনায় আসে না। অথচ দুর্যোগ মোকাবিলা, কৃষি উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়ন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের জন্যও বাস্তবসম্মত ও ন্যায্য বেতন কাঠামো নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

বিষয়টিকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও দেখা উচিত। একজন সরকারি চাকরিজীবী শুধু একজন কর্মচারী নন; তিনি কারও সন্তান, কারও বাবা-মা, কারও পরিবারের প্রধান অবলম্বন। তারও রয়েছে স্বপ্ন, দায়িত্ব এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা পরিকল্পনা। তিনি চান পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে, সন্তানের ভালো শিক্ষা দিতে এবং বৃদ্ধ বাবা-মায়ের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে। কিন্তু যদি আয়ের অধিকাংশই নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়ে শেষ হয়ে যায়, তাহলে সেই স্বপ্নগুলো ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে থাকে।

রাষ্ট্রের অগ্রগতির মূল লক্ষ্য মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন। সরকারি চাকরিজীবীরাও সেই জনগোষ্ঠীরই অংশ। তারা রাষ্ট্রের সেবায় নিয়োজিত হলেও তারাও এই দেশের নাগরিক। তাই তাদের ন্যায্য জীবনযাত্রার সুযোগ নিশ্চিত করা একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের স্বাভাবিক দায়িত্ব।

সবকিছু বিবেচনায় বলা যায়, নতুন পে-স্কেলের দাবি শুধু বেতন বাড়ানোর দাবি নয়। এটি মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, কর্মদক্ষতা, সামাজিক মর্যাদা এবং জনসেবার মানোন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি যৌক্তিক প্রয়োজন। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সরকারি চাকরিজীবীদের আর্থিক নিরাপত্তা ও সম্মানজনক জীবন নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের সঙ্গেও জড়িত। কারণ দক্ষ, প্রেরণাদায়ী এবং সন্তুষ্ট কর্মীবাহিনীই একটি আধুনিক, কার্যকর ও জনবান্ধব রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি।

Social Icons