GULF BANGLA বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন +880 1755727432
Home / জীবনযাপন ও স্বাস্থ্য / জীবনযাপন / ভালোবাসা চান, কিন্তু সম্পর্ক কাছে এলে কেন ভয় লাগে?

ভালোবাসা চান, কিন্তু সম্পর্ক কাছে এলে কেন ভয় লাগে?

অনেক মানুষই জীবনে একজন ভালোবাসার মানুষ চান। চান এমন একজন সঙ্গী, যার সঙ্গে কথা বলা যাবে, অনুভূতি ভাগ করা যাবে এবং নিরাপদ একটি সম্পর্ক গড়ে তোলা যাবে। কিন্তু বাস্তবে যখন কেউ সত্যিই কাছে আসতে শুরু করেন, তখনই অস্বস্তি, ভয় কিংবা দূরত্ব তৈরির প্রবণতা দেখা দেয়।

সম্পর্কে এই ধরনের আচরণকে অনেক সময় ইমোশনাল আনঅ্যাভেইলেবিলিটি বা আবেগীয় অনুপস্থিতি বলা হয়।

আমরা সাধারণত সঙ্গীর মধ্যে এই সমস্যা খুঁজি—সে কেন কথা বলছে না, কেন দূরে সরে যাচ্ছে, কেন অনুভূতি প্রকাশ করছে না। কিন্তু কখনও কখনও একই প্রবণতা নিজের মধ্যেও থাকতে পারে।

ভালোবাসা চাওয়া আর একটি গভীর সম্পর্ক ধরে রাখার মানসিক প্রস্তুতি—দুটো এক বিষয় নয়।

মনস্তাত্ত্বিকদের মতে, আবেগীয়ভাবে দূরে থাকার অর্থ এই নয় যে কেউ হৃদয়হীন বা ভালোবাসতে অক্ষম। অনেক ক্ষেত্রেই অতীতের কষ্ট, প্রত্যাখ্যান, পারিবারিক অভিজ্ঞতা বা ভেঙে যাওয়া সম্পর্কের কারণে মানুষ নিজের অজান্তেই এমন একটি মানসিক প্রতিরক্ষা তৈরি করে, যাতে আবার আঘাত পাওয়ার ঝুঁকি কমে।

কেউ কাছে এলেই আকর্ষণ কমে যায়

এই প্রবণতার অন্যতম লক্ষণ হলো—যতক্ষণ সম্পর্কটি অনিশ্চিত থাকে, ততক্ষণ আগ্রহ থাকে।

সঙ্গী যখন খুব বেশি আগ্রহ দেখান না বা সম্পর্কের ভবিষ্যৎ পরিষ্কার নয়, তখন তাকে নিয়ে ভাবনা ও আকর্ষণ বেশি থাকতে পারে। কিন্তু তিনি যখন নিয়মিত যোগাযোগ শুরু করেন, যত্ন নেন কিংবা সম্পর্কে স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেন, তখন হঠাৎ করে আগ্রহ কমে যেতে পারে।

ছোটখাটো বিষয় বিরক্তিকর লাগতে শুরু করে। দূরত্ব তৈরির কারণ খোঁজা হয়।

এর পেছনে অনেক সময় কাজ করে ঘনিষ্ঠতার ভয়।

সবার মধ্যেই খুঁত চোখে পড়ে

সম্পর্ক এগোতে শুরু করলেই সঙ্গীর ছোট ছোট বিষয় অসহনীয় মনে হতে পারে।

কথা বলার ধরন, পোশাক, অভ্যাস কিংবা এমন কোনও ছোট আচরণ, যা আগে সমস্যা মনে হয়নি, সেটিকেই বড় সমস্যা হিসেবে দেখা শুরু হয়।

নিজের কাছে মনে হতে পারে, ‘আমি শুধু সঠিক মানুষ খুঁজছি।’

কিন্তু বারবার যদি একই ঘটনা ঘটে, তাহলে সেটি শুধু বাছাইপ্রবণতার বিষয় নাও হতে পারে। কখনও কখনও এটি এমন একটি মানসিক কৌশল, যার মাধ্যমে কাউকে খুব কাছে আসতে না দেওয়ার কারণ তৈরি করা হয়।

বারবার জটিল মানুষকেই পছন্দ হয়

কেউ কেউ বারবার এমন মানুষের প্রেমে পড়েন, যিনি বাস্তবে সম্পর্কের জন্য প্রস্তুত নন।

তিনি হয়তো অন্য সম্পর্কে জড়িত, দূরে থাকেন, প্রতিশ্রুতি দিতে চান না কিংবা মানসিকভাবে খুব বেশি কাছে আসতে পারেন না।

বাইরে থেকে বিষয়টি দুর্ভাগ্য বলে মনে হলেও একই ধরনের মানুষকে বারবার বেছে নেওয়ার পেছনে একটি মানসিক কারণ থাকতে পারে।

কারণ, এমন সম্পর্কে গভীর ঘনিষ্ঠতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও তুলনামূলক কম থাকে। ফলে নিজের আবেগ পুরোপুরি উন্মুক্ত করার প্রয়োজন পড়ে না।

‘আমি একাই সব পারি’ মনোভাব

স্বাবলম্বী হওয়া অবশ্যই ইতিবাচক বিষয়। কিন্তু অতিরিক্ত স্বাবলম্বিতা কখনও কখনও আবেগীয় দূরত্বের আড়াল হতে পারে।

কাউকে সাহায্য চাইতে অস্বস্তি হওয়া, নিজের দুর্বলতা প্রকাশ না করা কিংবা সব সমস্যাই একা সামলানোর চেষ্টা করা—এসব আচরণ সম্পর্ককে গভীর হতে বাধা দিতে পারে।

একইভাবে অতিরিক্ত ব্যস্ততার কথাও ব্যবহার করা হতে পারে।

কাজ, বন্ধু কিংবা অন্যান্য দায়িত্বের মধ্যে নিজেকে এমনভাবে ব্যস্ত রাখা হয়, যাতে সম্পর্কের জন্য আবেগীয় জায়গা তৈরি না হয়।

ঘটনা বলেন, অনুভূতি বলেন না

নিজের জীবনের অনেক ব্যক্তিগত তথ্য কাউকে বলা মানেই আবেগীয়ভাবে উন্মুক্ত হওয়া নয়।

কেউ হয়তো নিজের শৈশব, কাজ, পরিবার কিংবা আগের সম্পর্ক নিয়ে অনেক কথা বলেন। কিন্তু যখন প্রশ্ন আসে—

‘এতে আপনার কেমন লেগেছিল?’

তখন উত্তর দিতে অস্বস্তি হয়।

ভয়, নিরাপত্তাহীনতা, দুঃখ, প্রত্যাখ্যানের আশঙ্কা কিংবা ভালোবাসার প্রয়োজনের মতো অনুভূতি প্রকাশ করার বদলে অনেকেই দীর্ঘ যুক্তি বা ব্যাখ্যায় চলে যান।

এটি আবেগ থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখার আরেকটি উপায় হতে পারে।

সঙ্গীর কঠিন অনুভূতি সহ্য করতে সমস্যা হয়

সুস্থ সম্পর্কে শুধু আনন্দ নয়; রাগ, অভিমান, হতাশা এবং কষ্টও থাকে।

কিন্তু আবেগীয়ভাবে দূরে থাকা মানুষের জন্য সঙ্গীর এই অনুভূতিগুলোর মুখোমুখি হওয়া কঠিন হতে পারে।

সঙ্গী কষ্টের কথা বললে সেটি শুনে বোঝার পরিবর্তে কথোপকথন বন্ধ করে দেওয়া, প্রসঙ্গ বদলে ফেলা কিংবা দ্রুত নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করার চেষ্টা দেখা যেতে পারে।

ফলে সঙ্গীর মনে হতে পারে, তার অনুভূতির জন্য সম্পর্কের মধ্যে নিরাপদ জায়গা নেই।

এর মানে কি আপনি ভালোবাসতে পারেন না?

না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আচরণগুলো কোনও মানুষের স্থায়ীভাবে ভালোবাসতে না পারার প্রমাণ নয়।

বরং এগুলো অনেক সময় অতীতে নিজেকে রক্ষা করার জন্য শেখা কিছু আচরণ।

যে কৌশল একসময় মানসিকভাবে বেঁচে থাকতে সাহায্য করেছিল, সেটিই পরবর্তীতে সুস্থ সম্পর্ক তৈরির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

কীভাবে পরিবর্তন সম্ভব?

প্রথম কাজ হলো নিজের আচরণের পুনরাবৃত্তি লক্ষ্য করা।

প্রতিবার কেউ কাছে এলেই কি আপনি দূরে সরে যান?
সম্পর্ক ভালো চললেই কি হঠাৎ অনেক খুঁত চোখে পড়ে?
কঠিন কথোপকথনের সময় কি সম্পূর্ণ যোগাযোগ বন্ধ করে দেন?

এসব বিষয় বুঝতে পারলে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আনা সম্ভব।

কোনও জটিল মুহূর্তে হঠাৎ সম্পর্ক থেকে সরে না গিয়ে বলা যেতে পারে, কিছুটা সময় প্রয়োজন। এরপর শান্ত হয়ে আবার আলোচনায় ফিরে আসা যেতে পারে।

নিজের অনুভূতিকে নাম দেওয়া এবং তা প্রকাশ করার অভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ।

প্রয়োজনে একজন মনোবিজ্ঞানী বা থেরাপিস্টের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। বিশেষ করে যদি অতীতের আঘাত বা একই ধরনের সম্পর্কের সমস্যা বারবার ফিরে আসে।

ভালোবাসা শুধু সঠিক মানুষকে খুঁজে পাওয়ার বিষয় নয়। কখনও কখনও ভালোবাসা গ্রহণ করার মতো মানসিক নিরাপত্তা তৈরি করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ অনেক সময় আমরা ভালোবাসা চাই ঠিকই—কিন্তু ভালোবাসা সত্যিই কাছে চলে এলে নিজের অজান্তেই তার কাছ থেকে পালাতে শুরু করি।

Social Icons