সুখী হতে চাইলে বদলাতে হবে জীবনধারা, বলছে অ্যাডলারের মনোবিজ্ঞান
নিজেকে নিয়ে সন্তুষ্ট নন অনেক মানুষ। কেউ অন্য কারও মতো হতে চান। কেউ নিজের ব্যক্তিত্বকে অপছন্দ করেন। আবার কেউ মনে করেন, তার জীবনের দুঃখের কারণ জন্ম, পরিবার কিংবা পারিপার্শ্বিকতা। তবে অ্যাডলারের মনোবিজ্ঞান বিষয়টিকে অন্যভাবে ব্যাখ্যা করে।
ইচিরো কিশিমি ও ফুমিটাকি কোগার আলোচনায় উঠে এসেছে, একজন মানুষ কখনো অন্য কারও মতো হতে পারেন না। প্রত্যেকের আলাদা ব্যক্তিত্ব রয়েছে। রয়েছে আলাদা সহজাত বৈশিষ্ট্য।
তাই অন্য কারও জীবন বা ব্যক্তিত্বকে অনুসরণ করার চেয়ে নিজের বৈশিষ্ট্যগুলো কীভাবে কাজে লাগানো যায়, সেটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অ্যাডলারের মতে, মানুষ কী নিয়ে জন্মেছে সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নয়। বরং সে নিজের গুণগুলো কীভাবে ব্যবহার করছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
নিজেকে মেনে নেওয়া মানে থেমে যাওয়া নয়
নিজেকে মেনে নেওয়ার অর্থ হলো নিজের বর্তমান অবস্থাকে বুঝতে শেখা। এর অর্থ এই নয় যে, মানুষ কোনো পরিবর্তন করতে পারবে না।
কেউ যদি নিজের জীবন নিয়ে সুখী না হন, তাহলে তাকে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। বর্তমান অবস্থার পরিবর্তন করার চেষ্টা করতে হবে।
আলোচনায় বলা হয়েছে, একজন মানুষ নিজেকে ভালোবাসতে না পারলে অন্য কারও মতো হয়ে সুখী হওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু অন্য কারও মতো হওয়া সম্ভব নয়। কারণ প্রত্যেক মানুষের ‘আমি’ আলাদা।
তাই নিজের জীবনকে অন্যের জীবনের সঙ্গে তুলনা না করে নিজের সামর্থ্যকে কাজে লাগানোই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
অসুখী থাকা কি নিজের সিদ্ধান্ত?
আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো, মানুষ কেন অসুখী থাকে?
দার্শনিকের যুক্তি হলো, মানুষ অনেক সময় নিজের বর্তমান অবস্থাকেই নিরাপদ মনে করে। বর্তমান জীবন যতই অস্বস্তিকর হোক, সেটি পরিচিত। ফলে সেটি বদলানোর চেয়ে একই অবস্থায় থাকা সহজ মনে হয়।
নতুন জীবন শুরু করলে কী হবে, তা আগে থেকে জানা যায় না। নতুন পরিস্থিতি কীভাবে সামলাতে হবে, সেটিও নিশ্চিত নয়।
এই অনিশ্চয়তা মানুষের মধ্যে ভয় তৈরি করতে পারে। ফলে পরিবর্তন চাইবার পরও অনেকে পরিবর্তনের পথে এগোতে পারেন না।
অভিযোগ থাকে। অসন্তুষ্টি থাকে। তবু পরিচিত জীবনকেই নিরাপদ মনে হয়।
এই কারণেই মানুষ অনেক সময় নিজের বর্তমান জীবনধারা ধরে রাখে। যদিও সে জানে, এই জীবন তাকে পুরোপুরি সুখী করছে না।
জীবনধারা বলতে কী বোঝায়?
অ্যাডলারের মনোবিজ্ঞানে ‘জীবনধারা’ একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। একজন মানুষ কীভাবে চিন্তা করেন এবং কীভাবে কাজ করেন, তার ধরনকে জীবনধারা বলা হয়।
একজন মানুষ পৃথিবীকে কীভাবে দেখেন, সেটিও এর অংশ। তিনি নিজেকে কীভাবে দেখেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ জীবনধারা শুধু আচরণের বিষয় নয়। এটি একজন মানুষের সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গেও যুক্ত।
আলোচনায় বলা হয়েছে, জীবনধারা জন্মগত কোনো স্থির বিষয় নয়। মানুষ এটি নিজের জন্য বেছে নেয়।
তবে এই পছন্দ সবসময় সচেতনভাবে হয় না। পরিবার, সংস্কৃতি, জাতীয়তা, বর্ণ, গোত্র এবং পারিপার্শ্বিক পরিবেশ এর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
তবু শেষ পর্যন্ত নিজের জীবনধারা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব মানুষের নিজের। আর এখানেই পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়।
অতীত বদলানো সম্ভব নয়, কিন্তু বর্তমান বদলানো যায়
কেউ নিজের জন্ম বেছে নিতে পারেন না। কোন দেশে জন্মাবেন, কোন পরিবারে জন্মাবেন, সেটিও নিজের হাতে থাকে না।
জন্মের সময়কার পরিবেশ জীবনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। অনেকেই তাই নিজের পরিস্থিতির সঙ্গে অন্যদের তুলনা করেন। তারা ভাবেন, অন্য পরিবেশে জন্মালে হয়তো জীবন আরও ভালো হতো।
কিন্তু এখানেই সবকিছু শেষ নয়। আলোচনায় জোর দেওয়া হয়েছে বর্তমানের ওপর। একজন মানুষ এখন নিজের জীবনধারা সম্পর্কে জানতে পারছেন। এরপর কী করবেন, সেটি তার দায়িত্ব।
অর্থাৎ অতীত পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। কিন্তু বর্তমান থেকে নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব।
জীবনধারা পরিবর্তন করা কি সত্যিই সম্ভব?
যুবকের প্রশ্ন ছিল, জীবনধারা যদি একবার তৈরি হয়ে যায়, তাহলে সেটি আবার কীভাবে পরিবর্তন করা সম্ভব?
দার্শনিকের উত্তর ছিল, মানুষ যে কোনো সময় পরিবর্তিত হতে পারে। পরিবেশ ও পরিস্থিতি সবসময় অনুকূলে থাকবে এমন নয়। তবু পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব।
মানুষ প্রতিমুহূর্তে নিজের জীবনধারা নির্ধারণ করছে। তাই পরিবর্তন না করার সিদ্ধান্তও এক ধরনের সিদ্ধান্ত।
কেউ যদি বারবার বলেন, ‘আমি পরিবর্তন হতে চাই’, তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে, তিনি কেন পরিবর্তনের পথে এগোচ্ছেন না?
এর একটি কারণ হতে পারে পরিচিত জীবনের নিরাপত্তা। মানুষ জানে, বর্তমান পরিস্থিতিতে কীভাবে চলতে হয়। পুরোনো অভ্যাসও তার পরিচিত।
অন্যদিকে নতুন জীবনধারা মানে নতুন অভিজ্ঞতা। সেখানে অনিশ্চয়তা থাকবে। ভবিষ্যৎ কী হবে, তা জানা থাকবে না।
এই অনিশ্চয়তাই পরিবর্তনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন সাহস
জীবনধারা পরিবর্তন করা শুধু একটি সিদ্ধান্ত নয়। এর সঙ্গে সাহসের বিষয়টিও জড়িত।
কারণ পরিবর্তনের সঙ্গে অনিশ্চয়তা আসে। পুরোনো জীবন ছেড়ে নতুন পথে গেলে কী ঘটবে, তা আগে থেকে জানা যায় না।
অ্যাডলারের মনোবিজ্ঞানকে তাই ‘সাহসিকতার মনোবিজ্ঞান’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এখানে নিজের দুঃখের জন্য শুধু অতীত বা পরিবেশকে দায়ী করার পরিবর্তে নিজের বর্তমান অবস্থার দিকেও তাকাতে বলা হয়েছে।
দার্শনিকের মতে, মানুষের সমস্যা সবসময় যোগ্যতার অভাব নয়। অনেক সময় মানুষের মধ্যে সুখী হওয়ার সাহসের ঘাটতি থাকে।
এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখা যায়, সুখী হওয়ার জন্য শুধু পরিস্থিতি বদলানোর অপেক্ষায় থাকলে হবে না। নিজের চিন্তা ও জীবনযাপনের ধরন নিয়েও ভাবতে হবে।
অতীত জীবনে প্রভাব ফেলতে পারে। জন্ম ও পরিবেশেরও গুরুত্ব রয়েছে। তবে এগুলোকে ভবিষ্যতের একমাত্র নিয়তি হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই।
নিজের জীবনধারা নিয়ে সচেতন হওয়া এবং প্রয়োজন হলে নতুনভাবে বেছে নেওয়ার সাহস রাখাই এখানে মূল শিক্ষা।









