খেলা ডেস্ক প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬, ০৫:০৬ | প্রথম আলো
ভোর চারটায় যখন পুরো শহর ঘুমে কাদা, তখন ১৭ বছরের এক কিশোরকে বিছানা ছাড়তে হতো। ছুটতে হতো কারখানায়। সেখানে টানা আট ঘণ্টা লেজার মেশিন চালানোর পর শরীর যখন ক্লান্ত, তখন আসত ফুটবল অনুশীলনের ডাক। অনুশীলন শেষে যখন বাড়ি ফিরতেন, ঘড়িতে তখন রাত আটটা। বছরের পর বছর এভাবেই কেটেছে জার্মানির এক অভিবাসী কুর্দি পরিবারের ছেলের জীবন।
সেই ১৭ বছরের কঠোর পরিশ্রমী ছেলেটিই আজ ২৯ বছর বয়সে এসে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে জার্মানির রূপকথার নায়ক। যার দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে ভর করে দীর্ঘ ১২ বছর পর বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে পা রাখল চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন জার্মানি।
১২ বছরের খরা কাটল উনদাভের জাদুতে
২০১৪ সালে বিশ্বকাপ ট্রফি জেতার পর জার্মানির ফুটবল যেন এক গোলকধাঁধায় হারিয়ে গিয়েছিল। পরের দুটি আসরেই (২০১৮ ও ২০২২) তাদের বিদায় নিতে হয়েছিল গ্রুপ পর্ব থেকে। এবারও যখন টরন্টোর বিএমও ফিল্ডে আইভরি কোস্টের বিপক্ষে জার্মানি ১-০ গোলে পিছিয়ে থেকে হারের শঙ্কায় কাঁপছিল, ঠিক তখনই ‘সুপার সাব’ হিসেবে মাঠে নামেন ডেনিজ উনদাভ।
মাঠে নেমেই খেলার গতিপথ বদলে দেন এই ফরোয়ার্ড:
- ৬৮তম মিনিটে: নাদিম আমিরির ক্রস থেকে বাঁ পায়ের নিখুঁত ভলিতে দলকে এনে দেন ১-১ সমতা।
- ইঞ্জুরি টাইমে: বক্সের ঠিক কোনা থেকে এক বুলেট শটে বল জালে জড়িয়ে ২-১ ব্যবধানে জার্মানির মহাকাব্যিক জয় ও নকআউট নিশ্চিত করেন।
চলতি বিশ্বকাপে এটি উনদাভের প্রথম চমক নয়। এর আগে কুরাসাওয়ের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচেও বদলি নেমে গোল করেছিলেন তিনি। দুই ম্যাচে বেঞ্চ থেকে এসে ৩ গোল ও ২ অ্যাসিস্ট করে তিনি ছুঁয়ে ফেলেছেন ১৯৯০ বিশ্বকাপে রজার মিলার গড়া এক আসরে বদলি খেলোয়াড়ের সর্বোচ্চ কীর্তির রেকর্ড। অথচ একসময় সপ্তাহে মাত্র ১২০ পাউন্ড মজুরিতে কারখানায় কাজ করতেন তিনি।
“উচ্চতা কম” বলে ব্রেমেন থেকে বাদ, অতপর কঠোর সংগ্রাম
জার্মানির ছোট শহর আখিমে জন্ম নেওয়া উনদাভের মা-বাবা মূলত তুরস্ক-সিরিয়া সীমান্ত অঞ্চল থেকে জার্মানিতে এসেছিলেন। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট উনদাভের ফুটবলের প্রতি টান ছিল শৈশব থেকেই। ২০০৭ সালে ভেরডার ব্রেমেনের একাডেমিতে সুযোগ পেলেও ২০১২ সালে তাঁকে বাদ দেওয়া হয় কেবল তাঁর ‘উচ্চতা কম’ হওয়ার দোহাই দিয়ে।
সেই কষ্টের দিনগুলোর কথা স্মরণ করে উনদাভ পরবর্তী সময়ে বলেছিলেন:
“ভেরডার ব্রেমেন যখন বলল আমার কোনো ভবিষ্যৎ নেই, খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। কিন্তু আমি আশা ছাড়িনি।”
আশা না ছাড়লেও পথটা সহজ ছিল না। জার্মানির চতুর্থ বিভাগের ক্লাব টিএসভি হাভেলসায় যোগ দিয়ে যখন ফুটবলের টাকায় সংসার চলছিল না, তখনই শুরু হয় সেই ভোর ৪টার কারখানার জীবন। এরপর একে একে জার্মানির নিচের স্তরের ফুটবল লিগ পার করে ২০২০ সালে বেলজিয়ামের দ্বিতীয় বিভাগের ক্লাব ইউনিয়ন সেন্ট-জিলোঁয়ায় যোগ দেন উনদাভ। সেখানে প্রথম মৌসুমেই ২৯ ম্যাচে ১৮ গোল করে দলকে শীর্ষ লিগে তোলেন এবং পরের বছর ৩৯ ম্যাচে ২৬ গোল করে লিগের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন।
বুন্দেসলিগা থেকে বিশ্বকাপের মূল মঞ্চ
বেলজিয়ামে রাজত্ব করার পর ব্রাইটন হয়ে উনদাভ যোগ দেন স্টুটগার্টে। ২০২৫-২৬ মৌসুমে বুন্দেসলিগায় ১৯টি গোল করে তিনি হ্যারি কেইনের পর দ্বিতীয় এবং জার্মান ফুটবলারদের মধ্যে সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনটি দখল করেন।
যদিও বিশ্বকাপের আগে প্রধান কোচ ইউলিয়ান নাগেলসমানের সঙ্গে কিছুটা ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়েছিল তাঁর প্রথম একাদশে খেলার দাবি নিয়ে, তবে মাঠের পারফরম্যান্স দিয়ে উনদাভ প্রমাণ করেছেন কেন তিনি অনন্য। আইভরি কোস্টের ম্যাচ শেষে কোচ নাগেলসমান নিজেই স্বীকার করেছেন, আগামী ম্যাচে ইকুয়েডরের বিপক্ষে উনদাভ শুরু থেকেই মাঠে থাকতে পারেন।
আগামী ১৯ জুলাই উনদাভের ২৯তম জন্মদিন। কাকতালীয়ভাবে, ২০২৬ বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল ম্যাচটিও অনুষ্ঠিত হবে সেই একই দিনে। ১৪ বছর বয়সে যাকে রিজেক্ট করা হয়েছিল, সেই ছেলেই কি এবার নিজের জন্মদিনে জার্মানির হয়ে বিশ্বজয়ের কেক কাটবেন? উনদাভের জীবন সংগ্রাম বলছে— স্বপ্ন সত্যি হওয়া অসম্ভব কিছু নয়!
উৎস: প্রথম আলো অনলাইন সংস্করণ









