আল–জাজিরা
প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬, ০১:০০ | প্রথম আলো
একটা সময় ছিল যখন কারও প্রতি ঘৃণা বা বিদ্বেষ ছড়ানোর বিষয়টি কেবল সামনা-সামনি বা ঘরোয়া আড্ডার আলাপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু প্রযুক্তির কল্যাণে এখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি বেনামী বা ফেক অ্যাকাউন্ট খুলে যেকোনো আপত্তিকর বা ঘৃণামূলক বক্তব্য (Hate Speech) মুহূর্তের মধ্যে লাখো মানুষের কাছে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
গত ১৮ জুন বিশ্বজুড়ে পালিত হয়েছে ‘ঘৃণামূলক বক্তব্য প্রতিরোধ দিবস’। এই উপলক্ষে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর কারণে এই সামাজিক ঝুঁকি আরও বহুগুণ বেড়ে গেছে। বর্তমানে ইন্টারনেট দুনিয়ায় এই বিষাক্ত কনটেন্ট ছড়ানো রুখতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়া হচ্ছে। তবে মানুষের সাধারণ বিচারবুদ্ধি বা চতুরতার কাছে এআই ঠিক কোন কোন জায়গায় মার খেয়ে যাচ্ছে, তা নিয়ে একটি বিশেষ বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল-জাজিরা।
অনলাইনে কারা সবচেয়ে বেশি ঘৃণামূলক বক্তব্যের শিকার?
২০২৩ সালে আন্তর্জাতিক জরিপ সংস্থা ‘ইপসস’ এবং জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা ‘ইউনেস্কো’ যৌথভাবে বিশ্বের ১৬টি দেশের ৮ হাজার মানুষের ওপর একটি বড় সমীক্ষা চালায়। সেই জরিপ থেকে উঠে এসেছে অত্যন্ত উদ্বেগজনক কিছু বাস্তব চিত্র:
- ইন্টারনেট ব্যবহার করেন এমন মানুষের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি ব্যবহারকারী অনলাইনে কোনো না কোনোভাবে ঘৃণামূলক বক্তব্যের মুখোমুখি হয়েছেন।
- জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৩৩ শতাংশের মতে, এলজিবিটিকিউআই (LGBTQI) গোষ্ঠীর মানুষ সবচেয়ে বেশি এই বিদ্বেষের শিকার হন।
- ২৮ শতাংশ মানুষের মতে, জাতিগত ও বর্ণগত সংখ্যালঘুরা রয়েছেন এই তালিকার দ্বিতীয় স্থানে।
- নারী ও কন্যারা ১৮ শতাংশ ভোট নিয়ে রয়েছেন তৃতীয় অবস্থানে।
ফেসবুক ও টিকটকের দুই বিপরীত পথ
সোশ্যাল মিডিয়া জায়ান্ট ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটা ২০২৩ সালের পর থেকে তাদের প্ল্যাটফর্মে ঘৃণামূলক পোস্ট বা কমেন্ট মুছে ফেলার হার অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে (অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর) তারা ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুক থেকে মাত্র ১৩ লাখ করে পোস্ট সরিয়েছে; যেখানে ২০২৪ সালের ঠিক একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৭৪ লাখ ও ৫৮ লাখ! মেটা এখন নিজে থেকে এআই দিয়ে পোস্ট খোঁজার চেয়ে ব্যবহারকারীদের দেওয়া রিপোর্টের ওপর বেশি ভরসা করছে।
তবে ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম টিকটক হাঁটছে সম্পূর্ণ উল্টো পথে। তারা দাবি করেছে, ২০২৫ সালের শেষ তিন মাসে তাদের প্ল্যাটফর্ম থেকে যত ঘৃণামূলক কনটেন্ট মোছা হয়েছে, তার ৯৬.৩ শতাংশই সাধারণ ব্যবহারকারীদের রিপোর্টের আগেই তাদের শক্তিশালী এআই স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত ও ডিলিট করে দিয়েছে।
যেভাবে কাজ করে এআই মডারেশন সিস্টেম
সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো সাধারণত বড় বড় ভাষা মডেল বা এলএলএম (LLM)-ভিত্তিক কনটেন্ট মডারেশন সিস্টেম ব্যবহার করে। এই সিস্টেমগুলোকে আগে থেকেই কোটি কোটি ভালো-মন্দ শব্দ ও বার্তার ডেটা দিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। কোনো পোস্টে আপত্তিকর কিছু পেলে এআই সেটিকে একটি নির্দিষ্ট স্কোর বা রেটিং দেয়। সেই স্কোরের ওপর ভিত্তি করেই পোস্টটি থাকবে নাকি ডিলিট হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের ২০২৫ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ওপেনএআই, অ্যানথ্রপিক, ডিপসিক, মিস্ট্রাল ও গুগলের মতো নামী প্রতিষ্ঠানের তৈরি মডারেশন সিস্টেমগুলো একই পোস্টের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন স্কোর দেয়! যেমন— ‘মিস্ট্রাল’ কোনো একটি মন্তব্যকে অত্যন্ত মারাত্মক বা ঘৃণামূলক (স্কোর ১-এর কাছাকাছি) মনে করলেও, ‘ওপেনএআই’ সেটিকে সাধারণ বা তুলনামূলক কম ক্ষতিকর বলে পার করে দেয়। এই বিভ্রান্তি মডারেশন ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
মানুষের চতুরতার কাছে যেখানে হেরে যাচ্ছে এআই
লন্ডনের কুইন মেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক এবং সোশ্যাল ডেটা সায়েন্স ল্যাবের সহপ্রধান আর্কাইত্জ জুবিয়াগা আল–জাজিরাকে জানান, সরাসরি গালিগালাজ বা চেনা কোনো খারাপ শব্দ থাকলে এআই খুব সহজেই তা ধরে ফেলে। কিন্তু মানুষ যখন চতুরতার আশ্রয় নেয়, তখন এআই বোকা বনে যায়। এর প্রধান দুটি কারণ হলো:
১. পরোক্ষ বা ইঙ্গিতপূর্ণ বিদ্বেষ
মানুষ যখন সরাসরি কোনো খারাপ শব্দ ব্যবহার না করে ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে কাউকে হেয় করে কথা বলে, তখন এআই-এর পক্ষে সেই চতুরতা ধরা কঠিন হয়ে পড়ে। অধ্যাপক জুবিয়াগা একটি সহজ উদাহরণ দিয়ে বলেন:
“ধরুন, একজন ব্যবহারকারী ফেসবুকে লিখলেন— ‘পৃথিবীটা কত সুন্দর হতো যদি…’। আপাতদৃষ্টিতে এই বাক্যটি খুবই ইতিবাচক শোনায়। কিন্তু এর পরের অংশে হয়তো তিনি কোনো বিশেষ গোষ্ঠীকে চরম অবমাননা করলেন। এআই সিস্টেম অনেক সময় বাক্যের প্রথম অংশের ইতিবাচক দিক দেখেই বিভ্রান্ত হয়ে যায় এবং ভেতরের আসল ঘৃণাটি ধরতে পারে না।”
২. ‘রিক্লেইমড ল্যাঙ্গুয়েজ’ বা ভাষার বিবর্তন
অতীতের কোনো এক সময়ে যে শব্দগুলো কোনো অবহেলিত বা প্রান্তিক গোষ্ঠীকে গালি দেওয়ার জন্য ব্যবহার করা হতো, পরবর্তী সময়ে সেই গোষ্ঠীর মানুষেরাই শব্দগুলোকে নিজেদের আপন করে নেয় এবং নিজেদের মধ্যে সাধারণ কথাবার্তায় ব্যবহার করতে শুরু করে। ভাষার এই ধরনের ব্যবহারকে কোনোভাবেই ‘হেট স্পিচ’ বা ঘৃণামূলক বক্তব্য বলা চলে না। কিন্তু এআই সিস্টেম ভাষার এই মানবিক ও সামাজিক পরিবর্তন বুঝতে না পেরে সেই সাধারণ পোস্টগুলোকেও ভুলভাবে ব্লক করে দেয়।
উৎস: আল-জাজিরা ও প্রথম আলো অনলাইন সংস্করণ








