যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজ দেশে রাজনৈতিক চাপের মুখে থাকলেও তার রক্ষণশীল পপুলিস্ট ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রভাব বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। ইউরোপ থেকে লাতিন আমেরিকা পর্যন্ত ডানপন্থি ও জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক শক্তির জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির পেছনে ট্রাম্পের রাজনৈতিক সাফল্যকে গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সিএনএনের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ব্রাজিলের সাম্প্রতিক প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পঘনিষ্ঠ সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর ছেলে ফ্লাভিও বলসোনারোর ভালো ফল এই প্রবণতার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। নির্বাচনের প্রথম দফায় তার সাফল্য লাতিন আমেরিকায় ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টাকে আরও দৃশ্যমান করেছে।
ব্রাজিলে বলসোনারোর উত্থান
ফ্লাভিও বলসোনারো সাবেক ব্রাজিলীয় প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর বড় ছেলে এবং ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মিত্র হিসেবে পরিচিত। জইর বলসোনারো ২০২২ সালের নির্বাচনের পর বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভাকে ক্ষমতাচ্যুত করার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়ে কারাগারে রয়েছেন।
এখন দ্বিতীয় দফার নির্বাচনের আগে লুলা দা সিলভাকে পরিস্থিতি ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য সীমিত সময়ের মধ্যে প্রচারণা চালাতে হচ্ছে। তিনি পরাজিত হলে ব্রাজিলের রাজনীতি আরও ডানপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে।
ব্রাজিলের নির্বাচনে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রভাব নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। মার্কিন কয়েকজন সিনেটর অভিযোগ করেছেন, ট্রাম্প প্রশাসন শুল্ক ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাকে রাজনৈতিক চাপ হিসেবে ব্যবহার করে ব্রাজিলের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে।
অন্যদিকে ব্রাজিলের ভোটের ফল প্রকাশের গতি নিয়েও ট্রাম্প মন্তব্য করেছেন। তিনি ব্রাজিলে বিপুলসংখ্যক মানুষের ভোট দেওয়ার পর দ্রুত ফল প্রকাশের বিষয়টি তুলে ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী ব্যবস্থার সমালোচনা করেন।
লাতিন আমেরিকার আরও কয়েকটি দেশেও রক্ষণশীল ও ডানপন্থি শক্তির প্রভাব বেড়েছে। কলম্বিয়া, কোস্টারিকা, এল সালভাদর, চিলি ও হন্ডুরাসে বিভিন্ন মাত্রায় রক্ষণশীল রাজনৈতিক শক্তি ক্ষমতায় রয়েছে। আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইও ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মিত্র হিসেবে পরিচিত।
ট্রাম্প আর্জেন্টিনার জন্য বড় অঙ্কের মুদ্রা বিনিময় চুক্তির প্রস্তাব দিয়েছিলেন। দেশটির আইনসভা নির্বাচনে মিলেইর রাজনৈতিক দলের অবস্থানের সঙ্গেও সেই উদ্যোগের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
ইউরোপেও ডানপন্থার জনপ্রিয়তা
ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রভাব শুধু লাতিন আমেরিকায় সীমাবদ্ধ নেই। ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশেও ডানপন্থি ও পপুলিস্ট রাজনৈতিক দলগুলো শক্তিশালী হচ্ছে।
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক চাপ, অভিবাসন, কর্মসংস্থান এবং প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর মানুষের অসন্তোষ এসব দলের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।
জার্মানিতে অভিবাসনবিরোধী অলটারনেটিভ ফর জার্মানি বা এএফডি বড় রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। দলটি জার্মানির পার্লামেন্টে উল্লেখযোগ্য অবস্থান তৈরি করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নাৎসিবাদের ইতিহাসের কারণে দেশটিতে উগ্র ডানপন্থার উত্থান বিশেষভাবে স্পর্শকাতর বিষয়।
এএফডির বিরুদ্ধে ইতিহাস অস্বীকার, ইহুদিবিদ্বেষ এবং জাতিগত জাতীয়তাবাদের মতো অভিযোগও রয়েছে। তারপরও দলটির জনপ্রিয়তা বাড়ছে।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে এএফডির নেতাদের যোগাযোগ এবং পরবর্তী সময়ে ট্রাম্পের দলটির প্রতি সমর্থন ইউরোপে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করেছে।
ফ্রান্সেও ডানপন্থি নেতা মেরিন ল্য পেনের রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত হয়েছে। আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে তিনি জনমত জরিপে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। জাতীয়তাবাদ, অভিবাসনবিরোধী অবস্থান, সুরক্ষাবাদী অর্থনীতি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতি কঠোর অবস্থান তার রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আগের নির্বাচনে মধ্যপন্থি দলগুলো ল্য পেনকে ঠেকাতে একত্র হয়েছিল। কিন্তু এসব দলের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ায় আগামী নির্বাচনে পরিস্থিতি আগের তুলনায় ভিন্ন হতে পারে।
ট্রাম্পের সব মিত্র অবশ্য সফল নন
বিশ্বজুড়ে ট্রাম্পঘনিষ্ঠ রাজনীতির উত্থান দেখা গেলেও তার সমর্থন পাওয়া প্রত্যেক রাজনৈতিক নেতা সফল হননি।
হাঙ্গেরির দীর্ঘদিনের ডানপন্থি নেতা ভিক্টর অরবান ট্রাম্পের সমর্থন থাকা সত্ত্বেও ক্ষমতা হারিয়েছেন। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সঙ্গেও ট্রাম্পের সম্পর্ক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও রাজনৈতিক ইস্যুতে আগের তুলনায় কিছুটা শীতল হয়েছে।
এতে বোঝা যায়, শুধু ট্রাম্পের সমর্থন থাকলেই কোনো দেশের রাজনীতিতে ডানপন্থি শক্তির সাফল্য নিশ্চিত হয় না। স্থানীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতি, অর্থনীতি ও ভোটারদের মনোভাবও বড় ভূমিকা রাখে।
ট্রাম্পবাদের বিরুদ্ধে পাল্টা প্রতিক্রিয়াও আছে
ডানপন্থি পপুলিজমের উত্থানের পাশাপাশি এর বিরুদ্ধে পাল্টা রাজনৈতিক প্রবণতাও তৈরি হচ্ছে।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ট্রাম্পের কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্যে পরিণত করার বক্তব্যের বিরোধিতা করে পশ্চিমা গণতন্ত্রে আলাদা রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করেছেন। তিনি বৈচিত্র্য ও বহুত্ববাদকে শক্তি হিসেবে তুলে ধরেছেন।
যুক্তরাজ্যেও ডানপন্থি পপুলিজম মোকাবিলার চেষ্টা চলছে। দেশটির রাজনীতিতে রিফর্ম পার্টির নেতা নাইজেল ফারাজের জনপ্রিয়তা বাড়লে ব্রিটিশ রাজনীতিতে ডানপন্থি চাপ আরও বাড়তে পারে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও ট্রাম্পবাদের বিপরীতে বামপন্থি পপুলিস্ট রাজনীতির উত্থানের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন নির্বাচনে গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রীদের সাফল্য সেই প্রবণতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ট্রাম্প না থাকলেও কি থাকবে ‘ট্রাম্পবাদ’?
ট্রাম্প নিজেকে দীর্ঘদিন ধরে একটি বৈশ্বিক পপুলিস্ট আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তবে বর্তমানে ডানপন্থি জাতীয়তাবাদী রাজনীতি শুধু ট্রাম্পের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার ওপর নির্ভরশীল নয়।
বিভিন্ন দেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক সংকট, অভিবাসন নিয়ে উদ্বেগ, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি মানুষের অসন্তোষ ডানপন্থি রাজনীতির জন্য আলাদা ভিত্তি তৈরি করেছে।
এ কারণে ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হলেও তার রাজনৈতিক দর্শনের প্রভাব দ্রুত হারিয়ে যাবে এমন কোনো স্পষ্ট লক্ষণ নেই। বরং বিশ্বজুড়ে একই সময়ে দুটি প্রবণতা শক্তিশালী হচ্ছে। একদিকে ডানপন্থি জাতীয়তাবাদী ও পপুলিস্ট শক্তির উত্থান, অন্যদিকে এর মোকাবিলায় বাম ও মধ্যপন্থি রাজনৈতিক শক্তির নতুন জোট ও আন্দোলন।
অর্থাৎ ভবিষ্যতে বিশ্ব রাজনীতিতে ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে কতটা প্রভাবশালী থাকবেন, সেটি অনিশ্চিত হলেও ‘ট্রাম্পবাদ’ একটি দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক প্রবণতায় পরিণত হবে কি না, সেই প্রশ্ন এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়।









