GULF BANGLA বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন +880 1755727432
Home / আন্তর্জাতিক / মোদি সরকারের সমালোচক ধ্রুব রাঠি কে, কেন তাঁকে আটক করা হয়েছিল?

মোদি সরকারের সমালোচক ধ্রুব রাঠি কে, কেন তাঁকে আটক করা হয়েছিল?

ভারতের জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠি দেশটির রাজনীতি, অর্থনীতি, ইতিহাস ও সামাজিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ভিডিও তৈরি করেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও তাঁর সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে তিনি ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছেন। সম্প্রতি ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার ঘটনায় তাঁকে আটক করে পুলিশ। পরে সতর্ক করে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

জার্মানিতে বসবাসকারী এই ইউটিউবারের ভিডিও ভারতীয় রাজনীতিতে প্রায়ই আলোচনা তৈরি করে। সহজ ভাষায় জটিল বিষয় ব্যাখ্যা করা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলার কারণে তাঁর বিপুলসংখ্যক দর্শক রয়েছে।

কেন আটক করা হয়েছিল ধ্রুব রাঠিকে?

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে এবং ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় কথিত অনিয়মের প্রতিবাদে দিল্লির যন্তর মন্তরে কর্মসূচি আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) এই আন্দোলনে যোগ দিতে ধ্রুব রাঠিও দিল্লিতে এসেছিলেন।

পুলিশ গুরুগ্রামের সেক্টর ৫৬ এলাকায় তাঁর বাসা থেকে তাঁকে আটক করে। একই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আরও কয়েকজনকে আটক করা হয়েছিল। তাঁদের অধিকাংশকে শনিবার রাতে ছেড়ে দেওয়া হলেও ধ্রুবকে কিছু সময় হেফাজতে রাখা হয়।

পরে তাঁকেও মুক্তি দেওয়া হয়। তবে যন্তর মন্তরে সিজেপির বিক্ষোভে আবার অংশ নিলে তাঁর বিরুদ্ধে নতুন করে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে পুলিশ সতর্ক করেছে।

ধ্রুবকে আটকের প্রতিবাদ জানায় সিজেপি। সংগঠনটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করে, সরকারের সমালোচনা করা এবং বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন তোলার কারণে তরুণদের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার মতো বিস্তারিত তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

কে এই ধ্রুব রাঠি?

ধ্রুব রাঠি একজন ভারতীয় ইউটিউবার, ভিডিও নির্মাতা ও অনলাইন কনটেন্ট নির্মাতা। তাঁর ভিডিওর প্রধান বিষয় রাজনীতি, ইতিহাস, অর্থনীতি, পরিবেশ এবং সমসাময়িক সামাজিক ঘটনা।

বিশেষ করে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিভিন্ন নীতি নিয়ে তাঁর বিশ্লেষণ ব্যাপক দর্শক পেয়েছে। তাঁর ভিডিওতে সাধারণত কোনো একটি বিষয়ের পটভূমি, প্রাসঙ্গিক তথ্য এবং বিভিন্ন সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য প্রভাব ব্যাখ্যা করা হয়।

সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউটিউবকে রাজনৈতিক আলোচনা ও বিশ্লেষণের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা ভারতীয় নির্মাতাদের মধ্যে ধ্রুব রাঠি অন্যতম।

হরিয়ানায় জন্ম, জার্মানিতে উচ্চশিক্ষা

ধ্রুব রাঠির জন্ম ১৯৯৪ সালের ৮ অক্টোবর ভারতের হরিয়ানা রাজ্যে। সেখানে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পর তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য জার্মানিতে যান।

তিনি জার্মানির কার্লসরুহে ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে পড়াশোনা করেন। তাঁর শিক্ষার বিষয় ছিল মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি। বর্তমানে তিনি জার্মানিতে বসবাস করেন এবং ইউটিউবের পাশাপাশি বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যমে কনটেন্ট তৈরি করেন।

ভ্রমণের ভিডিও দিয়ে শুরু ইউটিউব যাত্রা

২০১৩ সালে ভ্রমণবিষয়ক ভিডিও প্রকাশের মাধ্যমে ইউটিউবে যাত্রা শুরু করেন ধ্রুব রাঠি। পরে তিনি রাজনীতি ও সামাজিক বিষয় নিয়ে ভিডিও তৈরিতে বেশি মনোযোগ দেন।

গুরুতর বিষয়ের পাশাপাশি তিনি ব্যঙ্গাত্মক কনটেন্টও তৈরি করেছেন। তাঁর ‘পি নিউজ’ বিভাগে ব্যঙ্গ ও ভুয়া সংবাদ নিয়ে উপস্থাপনা করা হয়।

২০১৭ সাল থেকে ২০২০ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত তিনি দ্য প্রিন্টের জন্য কলামও লিখেছেন। ২০২০ সালের জুলাইয়ে ‘ধ্রুব রাঠি ভ্লগস’ নামে আরেকটি ইউটিউব চ্যানেল চালু করেন। সেখানে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাভিত্তিক ভিডিও প্রকাশ করেন।

ভিডিও নির্মাণের পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন অনুষ্ঠান উপস্থাপন করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে ডয়চে ভেলের ‘ডব্লিউ ট্রাভেল’ এবং নেটফ্লিক্স ইন্ডিয়ার ‘ডিকোড উইথ ধ্রুব’। এ ছাড়া স্পটিফাইয়ে ‘মহাভারত উইথ ধ্রুব রাঠি’ নামে একটি পডকাস্টও পরিচালনা করেছেন।

আঞ্চলিক ভাষায় ভিডিও প্রকাশের উদ্যোগ

২০২৪ সালের ১৮ এপ্রিল ধ্রুব রাঠি পাঁচটি নতুন ইউটিউব চ্যানেল চালুর ঘোষণা দেন। এসব চ্যানেলে তামিল, তেলেগু, বাংলা, মারাঠি ও কন্নড় ভাষায় তাঁর ভিডিও প্রকাশের পরিকল্পনা করা হয়।

এর মাধ্যমে ভারতের বিভিন্ন ভাষাভাষী দর্শকের কাছে তাঁর কনটেন্ট পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে যে ভিডিও আলোচনায় আসে

ভারতের ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে ধ্রুব রাঠির একটি রাজনৈতিক ভিডিও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ভিডিওটির বিষয় ছিল, ‘ভারত কি একনায়কতন্ত্রে পরিণত হচ্ছে?’

প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ৩০ মিনিটের ওই ভিডিওতে চণ্ডীগড়ের মেয়র নির্বাচন, কৃষক আন্দোলন এবং ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরা হয়। নির্বাচনের সময় ভিডিওটির দর্শকসংখ্যা আড়াই কোটির বেশি হয়ে যায়।

ধ্রুবের ভিডিওর জনপ্রিয়তার একটি কারণ হিসেবে তাঁর সরাসরি উপস্থাপনা ও সহজ ভাষায় জটিল বিষয় ব্যাখ্যা করার ধরনকে উল্লেখ করা হয়।

তবে তাঁর বক্তব্য নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও রয়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের অনেকে তাঁর ভিডিওর বক্তব্য ব্যবহার করলেও ধ্রুব নিজেকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের অনুসারী বলে দাবি করেন না। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি তথ্য, যুক্তি, স্বাধীনতা ও প্রগতিশীল চিন্তাকে গুরুত্ব দেন।

সরকারের সমালোচনা নিয়ে বিতর্ক

মোদি সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনামূলক ভিডিও প্রকাশের কারণে ধ্রুব রাঠি সরকারের সমর্থকদের সমালোচনার মুখেও পড়েছেন। কেউ কেউ তাঁকে ‘দেশবিরোধী’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

২০১৮ সালে বিজেপির আইটি সেল নিয়ে তাঁর একটি ভিডিও প্রকাশের পর তাঁর বিরুদ্ধে পুলিশে অভিযোগ করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

২০২৫ সালের পহেলগাঁও হামলার পরও তাঁর কিছু ভিডিও আলোচনায় আসে। এসব ভিডিওতে ভারতের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করা হয়েছিল। পরে পাকিস্তানের কিছু সংবাদমাধ্যমেও ভিডিওগুলো প্রচারিত হয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিপুল অনুসারী

ধ্রুব রাঠির ইউটিউব ও ইনস্টাগ্রামে বিপুলসংখ্যক অনুসারী রয়েছে। যুগান্তরের প্রতিবেদনে প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, তাঁর ইউটিউব চ্যানেলে প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ এবং ইনস্টাগ্রামে প্রায় ১ কোটি ৯২ লাখ অনুসারী রয়েছে। এই সংখ্যা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে।

ব্যক্তিগত জীবনে ধ্রুব রাঠি ২০২১ সালের নভেম্বরে দীর্ঘদিনের সঙ্গী জুলি এলবিআরকে বিয়ে করেন। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তাঁদের প্রথম সন্তান জন্ম নেয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষণ, তথ্যভিত্তিক ব্যাখ্যা এবং সমসাময়িক ঘটনা নিয়ে ভিডিও তৈরির মাধ্যমে ধ্রুব রাঠি ভারতের ডিজিটাল গণমাধ্যমে পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন। তাঁর বক্তব্য যেমন বিপুলসংখ্যক দর্শকের মনোযোগ পায়, তেমনি রাজনৈতিক অবস্থান ও বিশ্লেষণ নিয়ে বিতর্কও তৈরি হয়।

সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও আনন্দবাজার পত্রিকা।

Social Icons