কিডনি শরীর থেকে বর্জ্য পদার্থ ও অতিরিক্ত পানি বের করে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পাশাপাশি শরীরের তরল ও খনিজের ভারসাম্য বজায় রাখতেও অঙ্গটি প্রয়োজনীয়। তবে কিডনির কার্যক্ষমতা কমে গেলেও প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময় স্পষ্ট কোনো উপসর্গ দেখা যায় না। ফলে শরীরের কিছু পরিবর্তনকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
প্রস্রাবের অভ্যাসে পরিবর্তন, পা ও গোড়ালি ফুলে যাওয়া, চোখের চারপাশে ফোলাভাব, অতিরিক্ত ক্লান্তি, প্রস্রাবে বারবার ফেনা দেখা দেওয়া এবং রাতে ঘন ঘন প্রস্রাবের প্রয়োজন—এসব লক্ষণ কখনো কখনো কিডনির সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে এসব উপসর্গের অন্য কারণও রয়েছে। তাই শুধু লক্ষণ দেখে কিডনি রোগ নিশ্চিত হওয়া যায় না।
কিডনি সমস্যার ৬টি সম্ভাব্য লক্ষণ
১. প্রস্রাবের অভ্যাসে পরিবর্তন
প্রস্রাবের পরিমাণ, রং বা ঘনত্বে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া কিংবা স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিবর্তন কিডনির সমস্যাসহ বিভিন্ন শারীরিক অবস্থার ইঙ্গিত হতে পারে।
তবে পানি কম পান করা, কিছু ওষুধ গ্রহণ এবং অন্যান্য কারণেও প্রস্রাবের অভ্যাস বদলে যেতে পারে। পরিবর্তনটি দীর্ঘস্থায়ী হলে বা অন্য উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
২. পা ও গোড়ালি ফুলে যাওয়া
কিডনি শরীর থেকে অতিরিক্ত তরল বের করতে না পারলে শরীরে পানি জমতে পারে। এর ফলে পা, গোড়ালি কিংবা শরীরের অন্যান্য অংশে ফোলাভাব দেখা দিতে পারে।
তবে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা, শিরার সমস্যা, হৃদ্যন্ত্রের অসুস্থতা এবং অন্যান্য কারণেও পা ফুলতে পারে। ফোলাভাব নিয়মিত হলে বা বাড়তে থাকলে এর কারণ নির্ণয় করা জরুরি।
৩. চোখের চারপাশে ফোলাভাব
বিশেষ করে সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর চোখের চারপাশে বারবার ফোলাভাব দেখা গেলে বিষয়টি খেয়াল করা প্রয়োজন। কিছু ক্ষেত্রে কিডনি থেকে প্রস্রাবের সঙ্গে অতিরিক্ত প্রোটিন বের হয়ে যাওয়ার কারণে শরীরে তরল জমতে পারে।
তবে অ্যালার্জি, ঘুমের সমস্যা ও অন্যান্য কারণেও চোখের চারপাশ ফুলতে পারে। তাই শুধু এই লক্ষণ দেখে কিডনি রোগ ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
৪. অতিরিক্ত ক্লান্তি ও দুর্বলতা
কিডনির কার্যক্ষমতা কমে গেলে শরীরে বর্জ্য পদার্থ জমতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগের ক্ষেত্রে রক্তশূন্যতাও দেখা দিতে পারে। এসব কারণে ক্লান্তি, দুর্বলতা কিংবা স্বাভাবিক কাজেও শক্তি কম অনুভূত হতে পারে।
তবে ঘুমের ঘাটতি, রক্তশূন্যতার অন্যান্য কারণ, পুষ্টির অভাব ও বিভিন্ন অসুস্থতার কারণেও এমন উপসর্গ দেখা দিতে পারে। দীর্ঘদিন ক্লান্তি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
৫. প্রস্রাবে অতিরিক্ত ফেনা হওয়া
প্রস্রাবে বারবার অতিরিক্ত ফেনা দেখা গেলে প্রস্রাবের সঙ্গে প্রোটিন বের হচ্ছে কি না, তা পরীক্ষা করে দেখা প্রয়োজন হতে পারে। কিডনির ছাঁকনিপ্রক্রিয়ায় সমস্যা হলে প্রস্রাবে অ্যালবুমিন বা অন্যান্য প্রোটিনের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে।
তবে প্রস্রাবের গতি, ঘনত্ব বা টয়লেটের পানির বৈশিষ্ট্যের কারণেও ফেনা তৈরি হতে পারে। তাই ফেনা দেখা গেলেই কিডনি রোগ হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়।
৬. রাতে বারবার প্রস্রাব হওয়া
রাতে ঘন ঘন প্রস্রাবের জন্য ঘুম ভেঙে গেলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। কিডনির কিছু সমস্যায় এমন হতে পারে। তবে ডায়াবেটিস, প্রোস্টেটের সমস্যা, রাতে বেশি তরল পান করা, কিছু ওষুধ এবং ঘুমের সমস্যার কারণেও রাতে বারবার প্রস্রাব হতে পারে।
এ সমস্যা নিয়মিত হলে বা এর সঙ্গে অতিরিক্ত তৃষ্ণা, দুর্বলতা কিংবা প্রস্রাবের অন্য পরিবর্তন দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
কিডনি পরীক্ষা কখন করাবেন?
উপরের লক্ষণগুলো নিয়মিত দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। কিডনির কার্যক্ষমতা মূল্যায়নে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী রক্তের ক্রিয়েটিনিন ও eGFR পরীক্ষা এবং প্রস্রাবে অ্যালবুমিন বা প্রোটিনের পরীক্ষা দিতে পারেন।
বিশেষ করে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্রোগ কিংবা কিডনি রোগের পারিবারিক ইতিহাস থাকলে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। এসব ঝুঁকি থাকলেও কিডনি রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো লক্ষণ নাও দেখা যেতে পারে।
প্রস্রাব একেবারে বন্ধ বা অত্যন্ত কমে যাওয়া, শ্বাসকষ্ট কিংবা দ্রুত বাড়তে থাকা ফোলাভাব দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া উচিত।
মনে রাখবেন: শরীরের এসব পরিবর্তন কিডনি সমস্যার সম্ভাব্য সংকেত হতে পারে, তবে এগুলো একা রোগ নির্ণয়ের জন্য যথেষ্ট নয়। সঠিক মূল্যায়নের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানোই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায়।
তথ্যসূত্র: প্রদত্ত সংবাদ প্রতিবেদন









