কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর স্ত্রী ও দুই মেয়েসহ নিখোঁজ রয়েছেন নাহিদুর রহমান তুহিন। রিসোর্টের ২০২ নম্বর কক্ষে তাঁদের বুকিং ছিল। কিন্তু আগুনের ঘটনায় নিহত ও আহতদের প্রকাশিত তালিকায় পরিবারের সদস্যদের নাম না থাকায় উদ্বেগে রয়েছেন স্বজনেরা।
নাহিদুর রহমানের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন তাঁর স্বজনেরা। হাসপাতাল, পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেও তাঁদের বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি বলে পরিবারের দাবি।
দুই রাতের জন্য রিসোর্টে বুকিং ছিল
নাহিদুর রহমান যশোরের মণিরামপুর উপজেলার মোহনপুর গ্রামের মতিয়ার রহমানের ছেলে। তিনি ঢাকার শ্যামলীতে গ্র্যান্ড পাওয়ার লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। স্ত্রী আফসানা এবং সাত বছর বয়সী মেয়ে রোবাইনা ও তিন বছর বয়সী মেয়ে সুনাইনাকে নিয়ে ঢাকায় বসবাস করতেন।
রিসোর্টের বুকিং নথি অনুযায়ী, ১৬ থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত দুই রাতের জন্য নাহিদুর রহমানের নামে ২০২ নম্বর সুপার ডিলাক্স কক্ষটি বুক করা হয়েছিল। কক্ষটিতে দুই অতিথির বুকিং উল্লেখ ছিল। ১৮ অক্টোবর দুপুর ১টায় তাঁদের রিসোর্ট ছাড়ার কথা ছিল। বুকিংয়ের বিলের একটি অনুলিপিও সংবাদমাধ্যমের হাতে এসেছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়।
ফোনে যোগাযোগ করতে না পেরে উদ্বিগ্ন স্বজনেরা
নাহিদুরের বড় ভাই জাহিদুর রহমান প্রিন্স জানান, তাঁর ভাই শুক্রবার কক্সবাজার যাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। শনিবার সকালে রিসোর্টে আগুন লাগার খবর পাওয়ার পর তিনি নাহিদুরকে ফোন করেন। কিন্তু তাঁর ভাই বা পরিবারের অন্য কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি।
এরপর থেকে পরিবারের সদস্য ও স্বজনেরা বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করে তাঁদের খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
নাহিদুরের কর্মস্থল গ্র্যান্ড পাওয়ার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মির্জা রকিবুজ্জামান জানান, তিনি বর্তমানে চীনে রয়েছেন। অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়ার পর তিনিও নাহিদুরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছেন, কিন্তু সফল হননি। নাহিদুরকে একজন ভালো কর্মকর্তা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
নাহিদুর মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সপ্তম ব্যাচের শিক্ষার্থী তাহিরা সিদ্দিকা সূচি জানান, নাহিদুরের পরিবার উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে। তাঁর বৃদ্ধ বাবা-মাও ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না।
পরিচয় শনাক্তে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অহিদুর রহমান জানান, নাহিদ নিখোঁজ রয়েছেন বলে পুলিশ জানতে পেরেছে। তিনি আরও জানান, অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় সম্পর্কে তথ্য পাওয়া গেলেও বাকি চারজনের পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি। মরদেহ শনাক্ত করতে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের জ্যেষ্ঠ স্টেশন কর্মকর্তা দোলন আচার্য্য জানান, প্রথমে ছয়জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে শৌচাগার থেকে আরও চারজনের মরদেহ পাওয়া যায়। মরদেহগুলো মারাত্মকভাবে পুড়ে যাওয়ায় চেহারা দেখে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। সেগুলো উখিয়া থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।
অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মৃত্যু, আহত ছয়
শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকালে মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন উখিয়ার পাটুয়ারটেক এলাকার টুপটুপ রিসোর্টে আগুন লাগে। এ ঘটনায় ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয় এবং ছয়জন আহত হন।
প্রতিবেদনে পরিচয় শনাক্ত হওয়া নিহতদের মধ্যে ইসরাত জাহান মালিহা (৩০), মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩), লায়লা জাহান নাবিলা (২৭), নাফিসতা মীম (২৭), ফারিহা কবির (৩৩), পাঁচ বছর বয়সী ফায়িজান আহম্মেদ, নাসরিন আক্তার মুক্তা (২৯), জিহাদ হাওলাদার ও তারিকুল ইসলামের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
আহত ছয়জন হলেন চিকিৎসক শিহাব উদ্দীন (৩১), তাঁর স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান (২৯), মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০), মাসুদ (৩০) ও সামিদা (৩২)। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আহতদের মধ্যে পাঁচজনের শরীর প্রায় ৫ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে।
রিসোর্টের অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় রিসোর্টের রেস্টুরেন্ট ম্যানেজার মোহাম্মদ সুমনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। জেলা প্রশাসক আ. মো. মান্নান জানান, ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে।
কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন জানান, টুপটুপ রিসোর্টের কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছিল না। এ বিষয়ে নোটিশ দেওয়া হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে তিনি জানান।
তিনি আরও বলেন, মেরিন ড্রাইভ এলাকায় এক হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠান থাকায় অনুমোদন যাচাইয়ে সময় লাগছে। যাচাই করা আড়াই শতাধিক প্রতিষ্ঠানকে বৈধতা নিশ্চিত করতে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময় শেষে চূড়ান্ত নোটিশ দিয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে বলে জানান তিনি।
ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জানান, টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টের ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স ছিল না। আগে সতর্ক করা হলেও কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেয়নি। একই এলাকায় লাইসেন্স না থাকায় দুই শতাধিক প্রতিষ্ঠানকে নোটিশ দিয়ে সতর্ক করা হয়েছিল বলে ফায়ার সার্ভিসের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
নাহিদুর রহমান, তাঁর স্ত্রী ও দুই মেয়ের অবস্থান সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের সন্ধান পেতে স্বজনেরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছেন।
সূত্র: যুগান্তর প্রতিবেদন।









