প্রায় ৪ হাজার বছর ধরে রান্নায় গন্ধ ও সুন্দর রঙের জন্য জাফরান ব্যবহার হয়ে আসছে। স্যাফরন ক্রোকাস ফুলের ভেতরের লাল রঙের তিনটি স্টিগমা থেকে সংগ্রহ করা এই মশলাকে বিশ্বের সবচেয়ে দামি মশলাগুলোর একটি হিসেবে ধরা হয়। রান্নার পাশাপাশি জাফরান বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত উপকারিতার জন্যও ব্যবহৃত হয়।
জাফরানের স্বাস্থ্যগত উপকারিতা সম্পর্কে জানিয়েছেন এমএইচ শমরিতা হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজের পুষ্টিবিদ আঞ্জুমান আরা শিমুল।
জাফরানের পুষ্টিগুণ
জাফরান সাধারণত খুব অল্প পরিমাণে ব্যবহার করা হয়। তাই এটি ক্যালোরির উল্লেখযোগ্য উৎস নয়। তবে এতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বায়োঅ্যাকটিভ যৌগ রয়েছে।
প্রতি ১ গ্রাম জাফরানে সাধারণত থাকে:
- ক্যালোরি: ৩.১ কিলোক্যালোরি
- কার্বোহাইড্রেট: ০.৬৫ গ্রাম
- প্রোটিন: ০.১১ গ্রাম
- ফ্যাট: ০.০৬ গ্রাম
- চিনি: প্রায় শূন্য
জাফরানের স্বাস্থ্য উপকারিতা
মন ভালো রাখতে সহায়তা করে
জাফরান মন ভালো রাখতে, বিষণ্ণতার অনুভূতি কমাতে এবং সুখানুভূতি বাড়াতে সহায়তা করতে পারে। বিভিন্ন গবেষণায় জাফরানের অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট ওষুধের মতো কিছু প্রভাবের কথাও উঠে এসেছে।
শরীরের স্বাভাবিক ডিটক্স প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে
জাফরানে গ্লুটাথিয়োনসহ বিভিন্ন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে। এগুলো লিভারের কাজে সহায়তা করে। লিভার ডিটক্সিফিকেশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শরীর থেকে ক্ষতিকর পদার্থ দূর করতে এবং কোষ সুস্থ রাখতে ভূমিকা রাখে।
প্রদাহ কমাতে সহায়তা করে
জাফরানে থাকা ক্রোসিন ও ক্রোসেটিনের মতো অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের প্রদাহ কমাতে সহায়তা করতে পারে।
মস্তিষ্কের কাজে সহায়তা করে
জাফরান স্মৃতিশক্তি ধরে রাখতে এবং চিন্তাশক্তির প্রখরতা বাড়াতে সহায়তা করতে পারে। বিভিন্ন গবেষণায় অ্যালঝেইমার রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু লক্ষণ কমাতেও এর সম্ভাব্য ভূমিকার কথা বলা হয়েছে।
ত্বকের সুস্থতায় সহায়তা করে
জাফরানে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও পুষ্টি উপাদান ত্বকের কোষকে সুরক্ষিত রাখতে সহায়তা করে। এতে ত্বক স্বাস্থ্যোজ্জ্বল দেখাতে পারে এবং জ্বালাপোড়া বা লালচে ভাব কমাতেও সহায়তা করতে পারে।
হৃদযন্ত্রের সুস্থতায় সহায়তা করে
জাফরান শরীরে কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইডের ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করতে পারে, যা হৃদযন্ত্রের সুস্থতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
তবে হৃদযন্ত্রের সুস্থতা শুধু কোলেস্টেরলের ওপর নির্ভর করে না। হৃদরোগের পেছনে আরও বিভিন্ন কারণ ভূমিকা রাখে।
হজমে সহায়তা করে
জাফরান পরিপাকতন্ত্রে রক্ত প্রবাহ বাড়াতে সহায়তা করতে পারে। ফলে পেটের অস্বস্তি বা জ্বালাপোড়ার মতো কিছু হজমজনিত সমস্যা কমাতে সহায়তা করতে পারে।
এ ছাড়া এটি অন্ত্রের অভ্যন্তরীণ কোষপ্রাচীর সুরক্ষিত রাখতে, প্রদাহ কমাতে এবং ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে সহায়তা করে। বিশেষ করে লিকি গাট সিনড্রোমে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে এটি উপশমে সহায়ক হতে পারে।
ক্ষুধা কমাতে সহায়তা করে
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, জাফরান গ্রহণ করলে দীর্ঘ সময় পেট ভরা অনুভূতি থাকতে পারে। ফলে অতিরিক্ত ক্ষুধা বা ঘন ঘন খাবার খাওয়ার প্রবণতা কমতে পারে।
হরমোনগত ভারসাম্য রক্ষায় সহায়তা করে
নিয়মিত জাফরান গ্রহণ করলে মাসিক শুরু হওয়ার আগে দেখা দেওয়া বিভিন্ন অস্বস্তিকর উপসর্গ কমাতে সহায়তা করতে পারে।
কীভাবে জাফরান খাবেন?
জাফরান সাধারণত অল্প পরিমাণে ব্যবহার করা হয়। হালকা গরম দুধ বা পানিতে ১০–১৫ মিনিট ভিজিয়ে নিলে এর রং ও সুগন্ধ ভালোভাবে বের হয়। এরপর তা খাবার বা পানীয়তে ব্যবহার করা যায়।
কতটুকু জাফরান খাওয়া নিরাপদ?
সাধারণত রান্নায় যে পরিমাণ জাফরান ব্যবহার করা হয়, তা নিরাপদ। তবে উচ্চমাত্রায় জাফরান গ্রহণ নিরাপদ নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, কয়েক গ্রাম পরিমাণে জাফরান গ্রহণ করলে বিষক্রিয়া হতে পারে, যদিও এমন ঘটনা বিরল।
কারা জাফরান গ্রহণে সতর্ক থাকবেন?
- অন্তঃসত্ত্বা নারী: রান্নায় ব্যবহৃত সাধারণ পরিমাণ সাধারণত নিরাপদ। তবে এর চেয়ে বেশি মাত্রায় গ্রহণের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
- জাফরানে অ্যালার্জি রয়েছে এমন ব্যক্তি: জাফরান এড়িয়ে চলা উচিত।
- রক্ত পাতলা করার ওষুধ বা কিছু মানসিক রোগের ওষুধ সেবনকারী: জাফরান গ্রহণের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

