আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। বেশি দামে জ্বালানি তেল আমদানি করে দেশে তুলনামূলক কম দামে বিক্রি করায় মাত্র পাঁচ মাসেই সংস্থাটির লোকসান হয়েছে ২০ হাজার ৫৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকা।
সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বছরের শেষ নাগাদ বিপিসির লোকসান আরও বাড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেল আমদানি স্বাভাবিক রাখতে সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দেওয়ার দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি।
পাঁচ মাসে লোকসান ২০ হাজার কোটি টাকা
বিপিসির হিসাব অনুযায়ী, মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত টানা পাঁচ মাসে সংস্থাটির লোকসান হয়েছে ২০ হাজার ৫৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকা।
এর মধ্যে মার্চে লোকসান হয়েছে ২ হাজার ২৪৮ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। এপ্রিলে লোকসানের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৭ হাজার ৮৬৬ কোটি ৩ লাখ টাকা।
মে মাসে লোকসান হয়েছে ২ হাজার ৬২১ কোটি ২৮ লাখ টাকা, জুনে ৬ হাজার ১৯৮ কোটি ৫৮ লাখ টাকা এবং জুলাইয়ে ১ হাজার ১২৫ কোটি ৪৭ লাখ টাকা।
সংশ্লিষ্টদের ধারণা, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত কমে না এলে আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত আরও ১১ থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা লোকসান হতে পারে।
জরুরি ২০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকির দাবি
বিপুল লোকসানের কারণে জ্বালানি তেল আমদানির অর্থ জোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছে বিপিসি। সংস্থাটি সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে ২০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়ার দাবি জানিয়েছে।
বিপিসির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মার্চের পর থেকে সরকার কোনো ভর্তুকি দেয়নি। ফলে প্রয়োজনীয় অর্থের ব্যবস্থা না হলে ভবিষ্যতে জ্বালানি তেল আমদানি কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান থেকে নেওয়া ঋণের কিস্তি পরিশোধ নিয়েও ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
যুদ্ধের প্রভাবে বাড়ছে তেলের দাম
সংশ্লিষ্টদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতির প্রভাবও তেলের বাজারে পড়েছে।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রতি ব্যারেল ৯১ ডলারের বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
যুদ্ধ পরিস্থিতির দ্রুত অবসান না হলে বাংলাদেশের মতো তেল আমদানিনির্ভর দেশগুলোকে আরও বেশি দামে জ্বালানি কিনতে হতে পারে।
এক জাহাজের ডিজেলেই লোকসান ৬৭২ কোটি টাকা
বিপিসির লোকসানের একটি বড় উদাহরণ পাওয়া যায় এমভি ক্যাপ বনি নামের একটি জাহাজে আমদানি করা ডিজেলে।
গত ১৮ এপ্রিল ওই জাহাজে ৩৩ হাজার ৩৭৯ টন ডিজেল আমদানি করা হয়। ডিজেলের বিল পরিশোধ করতে হয়েছে প্রতি লিটার ২৭০ টাকা ৩২ পয়সা দরে।
অন্যদিকে তখন দেশে ডিজেল বিক্রি হচ্ছিল প্রতি লিটার ১০০ টাকা দরে।
অর্থাৎ প্রতি লিটারে ১৭০ টাকার বেশি লোকসান হয়েছে। শুধু ওই জাহাজের ডিজেল আমদানিতেই বিপিসির লোকসান হয়েছে প্রায় ৬৭২ কোটি ৬৫ লাখ টাকা।
সামনে আরও বাড়তে পারে ভর্তুকির চাপ
জ্বালানি বিভাগ ও বিপিসির প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম না কমলে ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারকে গড়ে প্রতি লিটার ডিজেল ১৭২ টাকা ৫৪ পয়সা, অকটেন ১৪৬ টাকা এবং পেট্রোল ১৪২ টাকা দরে কিনতে হতে পারে।
এই হিসাবে শুধু ডিজেলের ক্ষেত্রেই প্রতি লিটারে ৫৭ টাকার বেশি ভর্তুকি প্রয়োজন হতে পারে।
আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এই খাতে ভর্তুকির পরিমাণ ১১ হাজার কোটি টাকার বেশি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের হিসাব।
তিন মাসে জ্বালানি কিনতেই লাগবে প্রায় ২৯ হাজার কোটি টাকা
বিপিসির হিসাব অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে ডিজেল, জেট ফুয়েল, অকটেন, ফার্নেস অয়েল, মেরিন ফুয়েল, এএলসি, মারবান ও এলপিজি মিলিয়ে প্রায় ৬ লাখ ৬৫ হাজার টন জ্বালানি কিনতে হবে।
এতে ব্যয় হতে পারে ৮ হাজার ৬৬১ কোটি টাকা।
অক্টোবরে ৫ লাখ ৬৫ হাজার টন জ্বালানি কিনতে প্রয়োজন হতে পারে ৮ হাজার ৭৭৯ কোটি ৩২ লাখ টাকা।
নভেম্বরে ৭ লাখ ৮০ হাজার টন জ্বালানি কিনতে ব্যয় হতে পারে ১১ হাজার ৪৩২ কোটি টাকার বেশি।
অর্থাৎ সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত মাত্র তিন মাসে জ্বালানি পণ্যের বিল পরিশোধে প্রায় ২৮ হাজার ৮৭৩ কোটি ৪৩ লাখ টাকা প্রয়োজন হবে।
মুনাফার অর্থও প্রায় শেষ
বিপিসি জানিয়েছে, গত কয়েক বছরের মুনাফার অর্থ ব্যবহার করে এতদিন জ্বালানি আমদানি কার্যক্রম চালানো সম্ভব হয়েছে। বিভিন্ন ব্যাংকে সংস্থাটির ৩৫ থেকে ৪০ হাজার কোটি টাকা জমা ছিল।
এর মধ্যে সরকার ১১ হাজার কোটি টাকা নিয়েছে। বাকি অর্থ বিভিন্ন প্রকল্পে রাখা হয়েছিল। কিন্তু চলতি বছর যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সেই অর্থও প্রায় শেষের পথে।
বর্তমানে জ্বালানি তেল আমদানির জন্য ঋণপত্র বা এলসি খুলতেও বিপিসিকে আর্থিক চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে।
সরকারের কাছে বিকল্প প্রস্তাব
বিপুল লোকসানের পরিপ্রেক্ষিতে বিপিসির চেয়ারম্যান স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে জ্বালানি বিভাগকে ২০ হাজার ৫৯ কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে।
এর বিকল্প হিসেবে মার্চ থেকে যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত আগের হারে শুল্ক-কর নির্ধারণ অথবা আন্তর্জাতিক বাজারদরের সঙ্গে সমন্বয় করে দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
বিপিসির চেয়ারম্যান একই সঙ্গে সংস্থাটির আর্থিক পরিস্থিতি ও জ্বালানি তেল আমদানির সংকটের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অবহিত করার জন্য জ্বালানি বিভাগকে অনুরোধ করেছেন।









