GULF BANGLA বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন +880 1755727432
Home / আন্তর্জাতিক / ধ্রুব রাঠী: ইউটিউব থেকে যেভাবে নেমে এলেন রাজপথে

ধ্রুব রাঠী: ইউটিউব থেকে যেভাবে নেমে এলেন রাজপথে

একসময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানে আশাবাদী ছিলেন ইউটিউবার ধ্রুব রাঠী। তবে সময়ের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানে পরিবর্তন আসে। বর্তমানে তিনি ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি ও মোদি সরকারের পরিচিত সমালোচকদের একজন। ইউটিউবে রাজনীতি, সরকারি নীতি ও সামাজিক নানা বিষয় সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করে বিপুল দর্শকের কাছে পৌঁছেছেন তিনি।

তবে ২০২৬ সালের অক্টোবরের ঘটনাপ্রবাহে আবারও আলোচনায় এসেছেন রাঠী। এবার শুধু অনলাইন ভিডিওর কারণে নয়, সরাসরি রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া এবং দিল্লির বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার আগে তাঁকে আটকের খবর ঘিরে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৮ অক্টোবর বেঙ্গালুরুর ফ্রিডম পার্কে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) আয়োজিত বিক্ষোভে অংশ নেন রাঠী। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করেন আন্দোলনকারীরা। এরপর ১০ অক্টোবর দিল্লির যন্তর মন্তরে একই সংগঠনের কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার আগে গুরুগ্রামের বাসা থেকে তাঁকে আটক করার কথা জানিয়েছে দিল্লি পুলিশ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

হরিয়ানা থেকে জার্মানি, ধ্রুব রাঠীর জীবনযাত্রা

সানডে গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধ্রুব রাঠীর জন্ম ১৯৯৪ সালের ৮ অক্টোবর ভারতের হরিয়ানায়। ২০২৬ সালের ৮ অক্টোবর তাঁর বয়স ৩২ বছর পূর্ণ হয়।

ভারতে পড়াশোনা শেষ করে উচ্চশিক্ষার জন্য জার্মানিতে যান তিনি। কার্লসরুহে ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার পর নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকৌশলে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন বলে প্রকাশিত তথ্যে উল্লেখ রয়েছে।

তবে প্রকৌশলী হিসেবে পেশাজীবন শুরু না করে ভিডিও নির্মাণের দিকেই মনোযোগ দেন রাঠী। শুরুতে তাঁর ভিডিওতে ভ্রমণ, পরিবেশ ও তথ্যভিত্তিক বিষয় গুরুত্ব পেত। পরে রাজনীতি ও সামাজিক ইস্যু তাঁর কনটেন্টের অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে ওঠে।

জার্মানিতে থাকার সময় জুলি এলবিআর রাঠীর সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। ২০২১ সালে তাঁদের বিয়ে হয় এবং ২০২৪ সালে তাঁদের একটি ছেলে সন্তান জন্ম নেয় বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ব্যক্তিগত জীবন সাধারণত আড়ালেই রাখেন রাঠী।

মোদির সমর্থক থেকে সমালোচক

২০১১ সালের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের সময় ভারতের রাজনীতি নিয়ে ধ্রুব রাঠীর আগ্রহ বাড়ে। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথে থাকাকালে দুর্নীতি ও কালো টাকার বিরুদ্ধে তাঁর বক্তব্য রাঠীকে আকৃষ্ট করেছিল। সে সময় তিনি মোদির প্রতি আশাবাদী ছিলেন।

তবে রাঠীর নিজের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে দিল্লির আম আদমি পার্টি সরকারের দুর্নীতিবিরোধী হেল্পলাইন নিয়ে কেন্দ্র ও দিল্লি সরকারের বিরোধ তাঁকে হতাশ করে। তাঁর মনে প্রশ্ন তৈরি হয়, দুর্নীতি দূর করার বিষয়ে মোদি যে আশাবাদ তৈরি করেছিলেন, বাস্তবে সেটি কতটা অগ্রাধিকার পাচ্ছে।

এরপর মূলধারার টেলিভিশন সংবাদমাধ্যমের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও তাঁর অসন্তোষ বাড়তে থাকে।

২০১৬ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ইউটিউবে প্রথম রাজনৈতিক ভাষ্য প্রকাশ করেন রাঠী। ভিডিওটিতে বিজেপির আইটি সেল কীভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি, ভিডিও, উদ্ধৃতি ও প্রচারের মাধ্যমে রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করে, তা নিয়ে আলোচনা করেন তিনি। এরপর থেকে তাঁর কনটেন্টে রাজনৈতিক বিশ্লেষণের গুরুত্ব বাড়তে থাকে।

ইউটিউবে বিপুল জনপ্রিয়তা

ধ্রুব রাঠীর জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ জটিল রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয় সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করার দক্ষতা। তিনি সাধারণ হিন্দি ভাষায় কথা বলেন এবং ভিডিওতে গ্রাফিকস, অ্যানিমেশন, তথ্য ও উদাহরণ ব্যবহার করেন।

রাজনীতি ছাড়াও ইতিহাস, পরিবেশ, আন্তর্জাতিক ঘটনা ও সামাজিক নানা বিষয় নিয়ে তাঁর ভিডিও রয়েছে। ভ্রমণভিত্তিক কনটেন্টের জন্য ‘ধ্রুব রাঠী ভ্লগস’ নামে আলাদা চ্যানেলও পরিচালনা করেন তিনি। সেখানে স্ত্রী জুলির সঙ্গে বিভিন্ন দেশে ভ্রমণের ভিডিও প্রকাশ করা হয়।

২০২৩ সালে টাইম ম্যাগাজিনের ‘নেক্সট জেনারেশন লিডার্স’ তালিকায় তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত হয়। প্রকাশিত সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ইউটিউবে তাঁর অনুসারীর সংখ্যা তিন কোটির বেশি।

সিএএ বিতর্ক থেকে মোদি সরকারের সমালোচনা

২০১৯ সালে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) ও জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) নিয়ে বিতর্কের সময় ধ্রুব রাঠী একাধিক ব্যাখ্যামূলক ভিডিও প্রকাশ করেন। এসব কনটেন্টের মাধ্যমে তিনি ভারতের রাজনৈতিক আলোচনায় আরও পরিচিত হয়ে ওঠেন।

তবে তাঁকে সিএএবিরোধী আন্দোলনের নেতা হিসেবে বর্ণনা করার চেয়ে অনলাইন রাজনৈতিক ভাষ্যকার হিসেবে পরিচয় দেওয়াই যথাযথ। তাঁর প্রধান ভূমিকা ছিল ভিডিওর মাধ্যমে বিভিন্ন নীতি ও ঘটনাকে ব্যাখ্যা করা।

মোদি সরকারের সমালোচনা করতে গিয়ে রাঠী একাধিকবার ভারতের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, সংবাদমাধ্যম ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর চাপ বাড়ার অভিযোগ তুলেছেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে তিনি প্রশ্ন তোলেন, ভারত স্বৈরতন্ত্রের দিকে এগোচ্ছে কি না।

তাঁর এসব বক্তব্য নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক হয়েছে। সমর্থকেরা তাঁকে স্বাধীন রাজনৈতিক ভাষ্যকার হিসেবে দেখেন। অন্যদিকে সমালোচকদের অভিযোগ, তিনি বাছাই করা তথ্যের মাধ্যমে মোদি সরকারের বিরুদ্ধে জনমত তৈরির চেষ্টা করেন।

রাজনৈতিক কনটেন্ট নিয়ে বিতর্ক

ধ্রুব রাঠীর কনটেন্ট নিয়ে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ উঠেছে। আম আদমি পার্টির নেত্রী স্বাতী মালিওয়াল একসময় অভিযোগ করেছিলেন, রাঠীর কনটেন্ট তাঁকে লক্ষ্য করে অনলাইন প্রচারণা বাড়িয়ে দিয়েছিল। রাঠী সেই অভিযোগ অস্বীকার করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

এ ছাড়া তাঁর কিছু ভিডিও নিয়ে কপিরাইট ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগও সামনে এসেছে। ২০২৬ সালে হিন্দু ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের নিয়ে একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। দিল্লি পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করছে বলে আদালতকে জানিয়েছিল—এমন তথ্যও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে অভিযোগ ওঠা বা তদন্ত চলা মানেই কোনো অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। এসব ঘটনায় চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্তের তথ্য থাকলে তা আলাদাভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন।

বেঙ্গালুরুর বিক্ষোভে কী বলেছিলেন রাঠী?

এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৮ অক্টোবর বেঙ্গালুরুর ফ্রিডম পার্কে ককরোচ জনতা পার্টির আয়োজিত কর্মসূচিতে অংশ নেন ধ্রুব রাঠী। তাঁর সঙ্গে অভিনেতা ও অ্যাক্টিভিস্ট প্রকাশ রাজ এবং সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকও ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে আয়োজিত ওই বিক্ষোভে আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করেন, সংশোধনের মাধ্যমে বহু ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। তাঁরা প্রক্রিয়াটি বাতিল এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করেন।

কর্মসূচিতে রাঠী নির্বাচন কমিশনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, তাঁর সেখানে যাওয়ার উদ্দেশ্য সরকার পরিবর্তন করা নয়। তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

দিল্লির কর্মসূচির আগে আটক

হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেঙ্গালুরুর কর্মসূচির পর ১০ অক্টোবর দিল্লির যন্তর মন্তরে সিজেপির বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন ধ্রুব রাঠী। ৯ অক্টোবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে তিনি কর্মসূচিতে যোগ দেওয়ার কথা জানান।

এর পরদিন সকালে গুরুগ্রামের সেক্টর ৫৬ এলাকার বাসা থেকে তাঁকে আটক করা হয় বলে দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, তাঁর বাসায় প্রায় ৫০ জন পুলিশ সদস্য গিয়েছিলেন।

তবে তাঁকে আটকের নির্দিষ্ট আইনি ভিত্তি, আনুষ্ঠানিক অভিযোগ এবং পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিত করা জরুরি। এসব তথ্য ছাড়া আটকের ঘটনাকে কোনো অপরাধের প্রমাণ হিসেবে দেখা যায় না।

ইউটিউবের প্রভাব থেকে সরাসরি রাজপথে

ধ্রুব রাঠীর যাত্রা ভারতের ডিজিটাল রাজনৈতিক আলোচনার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। প্রকৌশল বিষয়ে উচ্চশিক্ষা নেওয়ার পর ইউটিউবকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়ে তিনি বিপুল দর্শক তৈরি করেছেন। ভিডিওর মাধ্যমে সরকারি নীতি, রাজনৈতিক বিতর্ক ও সামাজিক সমস্যাকে সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরেছেন।

একই সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ও বক্তব্য নিয়ে বিতর্কও অব্যাহত রয়েছে। এবার বিক্ষোভে অংশ নেওয়া এবং আটকের খবর তাঁকে অনলাইন আলোচনার বাইরে সরাসরি রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।

তাঁর পরবর্তী পদক্ষেপ এবং আটকের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশিত হলে ঘটনাটির আইনি ও রাজনৈতিক দিক আরও স্পষ্ট হবে।

Social Icons