GULF BANGLA বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন +880 1755727432
Home / আন্তর্জাতিক / ইসরাইলের নির্বাচনের ফল কি ইরানে নতুন হামলার পথ খুলবে?

ইসরাইলের নির্বাচনের ফল কি ইরানে নতুন হামলার পথ খুলবে?

ইসরাইলের নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট প্রত্যাশিত ফল করলেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকোটের সঙ্গে সমঝোতা না হলে নতুন নির্বাচন এড়ানো কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এমন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযান চালানোর সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।

*জেরুজালেম পোস্টের* বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইসরাইলের নির্বাচনের ফল, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং ইরানের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর মূল্যায়ন—সবকিছুই নতুন হামলার সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে নির্বাচন শেষ হলেই যে ইরানে হামলা হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

## নির্বাচনের ফল নেতানিয়াহুর জন্য কী সুযোগ তৈরি করেছে?

নির্বাচনের আগে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক অভিযান চালানোর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছিলেন নেতানিয়াহু বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আইয়াল জামিরের আপত্তিতে সেই পরিকল্পনা এগোয়নি বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জামিরের আপত্তির একটি কারণ ছিল ইসরাইলের নির্বাচন শেষ হওয়ার আগে হামলা চালানোর ঝুঁকি। ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ভোটগ্রহণ ব্যাহত হতে পারত। একই সঙ্গে নির্বাচনের ঠিক আগে সামরিক অভিযান চালিয়ে নেতানিয়াহু রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছেন—এমন অভিযোগ ওঠার আশঙ্কাও ছিল।

অন্যদিকে, ট্রাম্প চেয়েছিলেন ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন শেষ হওয়ার আগে ইরানে নতুন হামলা না হোক। ফলে ইসরাইলের নির্বাচনের পরও নতুন অভিযানের সময় নির্ধারণে মার্কিন অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

## নতুন সরকার গঠনে বিলম্বের সম্ভাবনা

নির্বাচনের ফলের পর ইসরাইলের সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকোট ও তাঁর মিত্রদের সরকার গঠনের জন্য জোটের অংশীদারদের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে।

বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইসরাইল বেইতেনু দলের প্রধান আভিগদর লিবারম্যান চূড়ান্ত ফল প্রকাশের আগে সরকার গঠন নিয়ে গুরুতর আলোচনা শুরু করতে চাইছিলেন না। ফল প্রকাশের পর তাঁকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে—আরব দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতা করবেন, নাকি নেতানিয়াহুর সঙ্গে সমঝোতায় যাবেন। সমঝোতা না হলে আবার নির্বাচনের পথও খোলা থাকতে পারে।

নতুন সরকার গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও জোটের অংশীদারদের মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগি ও মন্ত্রণালয় বণ্টন নিয়ে আলোচনা দীর্ঘ হতে পারে। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইসরাইলে নতুন সরকার গঠনের সম্ভাবনা কম বলে বিশ্লেষণে ধারণা দেওয়া হয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে ট্রাম্প যদি ইরানে হামলার পক্ষে অবস্থান নেন বা বাধা না দেন, তাহলে নেতানিয়াহুর সামনে সামরিক অভিযান চালানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

## ইরানে হামলা নিয়ে কী ভাবছেন ইসরাইলের সেনাপ্রধান?

ইরানের বিরুদ্ধে হামলার বিষয়ে আইয়াল জামিরের অবস্থান কয়েকটি শর্তের ওপর নির্ভরশীল বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রথমত, ইরান যদি সরাসরি ইসরাইলে হামলা চালানোর প্রস্তুতি নেয়। দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের বিরুদ্ধে আগে সামরিক অভিযান শুরু করে এবং ইসরাইলকে আক্রমণাত্মক ও প্রতিরক্ষামূলক উভয় ক্ষেত্রেই পূর্ণ সমর্থন দেয়।

এ ছাড়া ইরান যদি দ্রুত তার সামরিক হুমকি দেওয়ার সক্ষমতা পুনরুদ্ধার করতে থাকে, তাহলে হামলার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বিত কৌশলের অংশ হিসেবে ইরানকে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছাড় দিতে বাধ্য করার লক্ষ্যেও সামরিক পদক্ষেপের বিষয়টি আলোচনায় আসতে পারে।

তবে জামিরের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইরান এখনো এমন দ্রুতগতিতে সামরিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধার করেনি যে অবিলম্বে হামলা চালানো জরুরি হয়ে পড়েছে।

## নেতানিয়াহুর সামনে বড় বাধা হতে পারেন ট্রাম্প

ইসরাইলের নির্বাচন শেষ হওয়ার পরও ইরানে হামলার পথে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাধা হতে পারেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্প ইরানে নতুন হামলা চাননি। কারণ, ইরান যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে জনমত জরিপে তিনি ও তাঁর দল রিপাবলিকান পার্টি চাপে পড়ছিলেন।

তবে মধ্যবর্তী নির্বাচন শেষ হলে ট্রাম্পের রাজনৈতিক হিসাব বদলাতে পারে। তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ না থাকায় তাঁর ওপর নির্বাচনী বিবেচনার চাপ কমে যেতে পারে বলে বিশ্লেষণে ধারণা দেওয়া হয়েছে। সে ক্ষেত্রে ইরানে আবার হামলার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর স্বাধীনতা বাড়তে পারে।

তবে ট্রাম্পের অবস্থানই শেষ কথা নয়। ইরানের সামরিক সক্ষমতা, সম্ভাব্য পাল্টা হামলা এবং নতুন সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার ঝুঁকিও সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।

## কেন ইরানে নতুন হামলা নাও হতে পারে?

ইরানে নতুন করে যুদ্ধে জড়ানোর বিষয়ে ট্রাম্পের শীর্ষ উপদেষ্টাদের মধ্যে বিরোধিতা রয়েছে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের কেউ কেউ মনে করেন, কয়েক দিনের সামরিক অভিযান ইরানকে কিছুটা নমনীয় করতে পারে। অন্যদের আশঙ্কা, দীর্ঘ চাপের মধ্যেও তেহরান নিজের অবস্থানে অনড় থাকলে আরও কয়েক দিনের হামলাতেও কাঙ্ক্ষিত ফল নাও আসতে পারে।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেওয়ার পরও ইরান হামলা চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা দেখিয়েছে বলে ট্রাম্পের কিছু উপদেষ্টা সতর্ক করেছেন। ফলে কয়েক দিনের মধ্যে সংঘাত শেষ করার পরিকল্পনা থাকলেও যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে নতুন যুদ্ধের বিপুল ব্যয় বহন না করে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখার পথ বেছে নিতে পারেন ট্রাম্প। দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করে তেহরানকে চাপে রাখাও তাঁর সম্ভাব্য কৌশল হতে পারে।

বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, ট্রাম্প অতীতে কখনো সামরিক হুমকি দিয়েছেন, আবার পরে সেই অবস্থান থেকে সরে এসে অর্থনৈতিক চাপের পথে ফিরেছেন। এমন অবস্থান পরিবর্তনের কারণে ইরানের কাছে তাঁর সামরিক হুমকির বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

অন্যদিকে, ট্রাম্পের সর্বশেষ হুমকিতে ইরান উদ্বিগ্ন হয়ে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কার্যকর সমঝোতায় রাজি হলে সামরিক অভিযান আরও পিছিয়ে যেতে পারে।

## ইরানে হামলা কি নেতানিয়াহুকে রাজনৈতিক সুবিধা দিতে পারে?

ইরানে নতুন হামলা হলে ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু বদলে যেতে পারে। নির্বাচনের ফল নিয়ে আলোচনা এবং সরকার গঠনের জন্য আইজেনকোট ও তাঁর মিত্রদের জোটবদ্ধ হওয়ার প্রচেষ্টার মধ্যে জাতীয় নিরাপত্তা ও ইরানের হুমকি প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠতে পারে।

এতে নেতানিয়াহু তাঁর পছন্দের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বিষয়গুলো সামনে আনার সুযোগ পেতে পারেন বলে বিশ্লেষণে ধারণা দেওয়া হয়েছে।

ইরানের সম্ভাব্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কা তৈরি হলে আইজেনকোট ও তাঁর মিত্রদের জন্য আরব দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতা করা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। একইভাবে, জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে এলে নেতানিয়াহুর সঙ্গে সমঝোতায় যাওয়ার জন্যও রাজনৈতিক চাপ তৈরি হতে পারে।

তবে এসব সম্ভাবনা নিশ্চিত নয়। ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান রাজনৈতিকভাবে নেতানিয়াহুকে সুবিধা দেবে কি না, তা নির্ভর করবে সংঘাতের পরিস্থিতি, জনমত এবং অভিযানের ফলাফলের ওপর।

## নতুন হামলার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরতে হবে নেতানিয়াহুকে

বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইসরাইলি সেনাপ্রধান জামির যেহেতু এখনই হামলা চালানোর বিষয়ে তাড়াহুড়া করছেন না, তাই নেতানিয়াহুকে নতুন সামরিক অভিযানের পক্ষে আরও স্পষ্ট যুক্তি তুলে ধরতে হবে।

নেতানিয়াহু যদি একদিকে দাবি করেন যে ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি দূর করতে তিনি সফল হয়েছেন, অন্যদিকে আবার বলেন যে সময় ফুরিয়ে আসছে বলে অবিলম্বে হামলা চালানো প্রয়োজন, তাহলে তাঁর বক্তব্যে অসংগতি দেখা দিতে পারে।

সরকার গঠন নিয়ে আলোচনা চলার সময় ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু হলে সেই যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করা নেতানিয়াহুর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। সামরিক অভিযানের সাফল্য এবং ইসরাইলের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে এর গ্রহণযোগ্যতা অনেকাংশে সেই ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করতে পারে।

## শেষ কথা

ইসরাইলের নির্বাচনের ফল ইরানের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক অভিযান চালানোর সম্ভাবনাকে প্রভাবিত করতে পারে। নেতানিয়াহুর সামনে সরকার গঠনের অনিশ্চয়তা থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান, ইসরাইলি সেনাপ্রধানের মূল্যায়ন, ইরানের সামরিক সক্ষমতা এবং নতুন যুদ্ধের অর্থনৈতিক ব্যয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে থাকবে।

*জেরুজালেম পোস্টের* বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত নতুন হামলার সম্ভাবনা বাড়াতেও পারে, আবার অর্থনৈতিক চাপ ও কূটনৈতিক সমঝোতার পথ বেছে নিলে তা পিছিয়েও যেতে পারে। তাই ইসরাইলের নির্বাচন শেষ হওয়াকে ইরানে নতুন হামলার নিশ্চিত সংকেত হিসেবে দেখা যাচ্ছে না।

**সূত্র: যুগান্তরে প্রকাশিত জেরুজালেম পোস্টের বিশ্লেষণ অবলম্বনে।**

Social Icons