কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে ছবি তৈরি এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয় ট্রেন্ড। আশির দশকের পোশাকে নিজেকে দেখা, পুরোনো দিনের আবহ তৈরি করা কিংবা জিবলি ও ত্রিমাত্রিক চরিত্রের মতো ছবি বানানোতে ব্যস্ত অনেকেই। তবে এই মজার ট্রেন্ডের আড়ালে রয়েছে প্রযুক্তির একটি অদৃশ্য পরিবেশগত প্রভাব।
প্রশ্ন উঠছে, এআই দিয়ে ছবি তৈরি করলে কি পানি ব্যবহার হয়? পরোক্ষভাবে এর উত্তর হ্যাঁ। এআই দিয়ে ছবি, ভিডিও বা লেখা তৈরি করতে দূরের ডাটা সেন্টারে থাকা শক্তিশালী কম্পিউটার কাজ করে। এসব সার্ভার পরিচালনায় বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। আবার সার্ভার গরম হয়ে গেলে তা ঠান্ডা রাখতে অনেক ডাটা সেন্টারের শীতলীকরণ ব্যবস্থায় পানি ব্যবহার করা হয়।
অর্থাৎ, মোবাইলের পর্দায় কয়েক সেকেন্ডে একটি ছবি তৈরি হলেও এর পেছনে কাজ করে বড় একটি প্রযুক্তি অবকাঠামো। সেই অবকাঠামোর পরিবেশগত প্রভাব ব্যবহারকারীর চোখে সরাসরি ধরা পড়ে না।
কীভাবে পানি ব্যবহার হয়?
এআইয়ের মাধ্যমে একটি ছবি তৈরি করতে ডাটা সেন্টারের সার্ভারকে বিপুল পরিমাণ হিসাব-নিকাশ করতে হয়। এর জন্য বিদ্যুৎ লাগে এবং সার্ভার থেকে তাপ উৎপন্ন হয়। তাপ নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত শীতলীকরণ প্রযুক্তির ধরন অনুযায়ী সরাসরি পানি ব্যবহার হতে পারে।
শুধু সার্ভার ঠান্ডা করতেই নয়, এআই চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও পরোক্ষভাবে পানি ব্যবহৃত হতে পারে। ফলে এআইয়ের পানির ব্যবহারকে শুধু ডাটা সেন্টারের কুলিং ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখলে পুরো চিত্র পাওয়া যায় না।
তবে একটি ছবি তৈরিতে নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি ব্যবহার হয়, এমন হিসাব সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। ডাটা সেন্টারের অবস্থান, শীতলীকরণ প্রযুক্তি, সার্ভারের দক্ষতা, বিদ্যুতের উৎস এবং আবহাওয়ার মতো বিভিন্ন বিষয়ের ওপর পানির ব্যবহার নির্ভর করে।
আশির দশকের ট্রেন্ড নিয়ে এত আলোচনা কেন?
এআইয়ের ছবি তৈরির প্রবণতা এখন শুধু একটি ছবি বানানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। একটি ছবি পছন্দ না হলে আবার তৈরি করা, পোশাক বদলে নতুন সংস্করণ বানানো, ভিন্ন ভঙ্গিতে ছবি তৈরি করা এবং পরে সেটিকে ভিডিওতে রূপ দেওয়ার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে।
আশির দশকের রেট্রো ট্রেন্ড এর সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো উদাহরণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বড় চুল, ডেনিম, সানগ্লাস, পুরোনো দিনের পোশাক ও দানাদার ছবির আবহে তৈরি মানুষের ছবি দেখা যাচ্ছে। কেউ আশির দশক দেখেছেন, আবার কেউ সেই সময়ে জন্মই নেননি। এআইয়ের সাহায্যে সবাই নিজের মতো করে সেই সময়কে কল্পনা করছেন।
কেন জনপ্রিয় রেট্রো ছবি?
এর পেছনে রয়েছে নস্টালজিয়া ও রেট্রো ফ্যাশনের নতুন আকর্ষণ। আশির দশকের পোশাক, চুলের ধরন, সংগীত ও সংস্কৃতির প্রতি নতুন প্রজন্মেরও আগ্রহ রয়েছে।
বর্তমানের ঝকঝকে ও নিখুঁত ডিজিটাল ছবির বিপরীতে পুরোনো ছবির দানাদার ও কিছুটা বিবর্ণ আবহ অনেকের কাছে আলাদা সৌন্দর্যের প্রতীক।
এআই সেই পুরোনো আবহ তৈরি করে দিচ্ছে কয়েক মুহূর্তেই। ফলে আশির দশকের পরিবেশ তৈরি করতে পুরোনো ক্যামেরা, পোশাক কিংবা নির্দিষ্ট জায়গা খুঁজে বের করার প্রয়োজন হচ্ছে না।
এআইয়ের বিদ্যুৎ ব্যবহারও বাড়ছে
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে ডাটা সেন্টারের বিদ্যুৎ ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। এআইয়ের বিস্তারের সঙ্গে এই চাহিদা আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশেষ করে ছবি ও ভিডিও তৈরি, জটিল বিশ্লেষণ কিংবা স্বয়ংক্রিয় এআই ব্যবস্থার মতো কাজ সাধারণ লেখাভিত্তিক প্রশ্নের তুলনায় বেশি কম্পিউটিং শক্তি চাইতে পারে।
তবে প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে প্রতি এআই কাজের শক্তি খরচও কমছে। তাই একটি সাধারণ ছবি বা প্রশ্নকে আলাদাভাবে বড় পরিবেশগত ক্ষতি হিসেবে দেখার চেয়ে কোটি কোটি মানুষের সম্মিলিত ব্যবহারের প্রভাব বিবেচনা করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এআই ব্যবহার কি বন্ধ করে দিতে হবে?
একেবারেই নয়। বরং অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার কমানোই হতে পারে সচেতনতার জায়গা।
- প্রয়োজন ছাড়া বারবার এআই দিয়ে ছবি বা ভিডিও তৈরি করা এড়িয়ে চলা।
- শুরুতেই স্পষ্ট ও নির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া।
- ছবি পছন্দ না হলে অপ্রয়োজনীয়ভাবে বারবার নতুন ছবি তৈরি না করা।
- একই ধরনের কাজের জন্য একাধিকবার এআই ব্যবহার না করা।
- ট্রেন্ডে অংশ নিলেও প্রয়োজনের অতিরিক্ত ছবি বা ভিডিও তৈরি না করা।
- মনে রাখা, কয়েক সেকেন্ডে ছবি তৈরি হলেও এর পেছনে কাজ করে বড় সার্ভার, বিদ্যুৎ ও শীতলীকরণ ব্যবস্থা।
তাই আশির দশকের এআই ট্রেন্ড চলুক, ছবি বানানোও চলুক। তবে শুধু ট্রেন্ডের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে অপ্রয়োজনীয়ভাবে এআই ব্যবহার করে বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবহার বাড়ানো এড়িয়ে চলাই হতে পারে বেশি দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত।
সূত্র: আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ), যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রিভারসাইডের গবেষণা এবং জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়ের পানি, পরিবেশ ও স্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণা।
