কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানী সমুদ্রসৈকতসংলগ্ন একটি রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর নিখোঁজ রয়েছেন যশোরের মনিরামপুরের একই পরিবারের চারজন। তাঁরা হলেন নাহিদুর রহমান তুহিন (৪১), তাঁর স্ত্রী আফসানা মতিন তানজি (৩৬) এবং তাঁদের দুই মেয়ে রুজাইনা ইনায়া (৮) ও সুনাইনা ইহানা (৩)।
অগ্নিকাণ্ডের আগে শুক্রবার রাতেও ছোট ছেলের সঙ্গে কথা হয়েছিল মা মতিয়ার রহমানের। কিন্তু এরপর থেকে তাঁদের সঙ্গে আর যোগাযোগ করতে পারেননি তিনি। স্বজনদের আশঙ্কা, অগ্নিকাণ্ডে উদ্ধার হওয়া অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহগুলোর মধ্যে তাঁদের পরিবারের সদস্যরা থাকতে পারেন। তবে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার আগে এ বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।
শুক্রবার রাতেও কথা হয়েছিল ছেলের সঙ্গে
যশোরের মনিরামপুর পৌরসভার মোহনপুর কারিকরপাড়ার বাসিন্দা মতিয়ার রহমান জানান, ছোট ছেলে নাহিদুর রহমান তুহিনের সঙ্গে শুক্রবার রাতে তাঁর শেষ কথা হয়।
মাকে ছেলে জানিয়েছিলেন, তাঁরা সমুদ্রসৈকতে আছেন, বাচ্চারা খেলছে। মঙ্গলবার ঢাকায় ফিরবেন এবং বুধবার মাকে ঢাকার মিরপুরের বাসায় যেতে বলেছিলেন।
ছেলের সঙ্গে শেষ কথোপকথনের স্মৃতি মনে করে শোকাহত মতিয়ার রহমান বলেন, শুক্রবার রাতেও কথা হয়েছিল। ছেলে পরিবারের সবাইকে নিয়ে সমুদ্রসৈকতে আনন্দ করছিল। এখন তাঁদের সঙ্গে আর কথা হবে না—এ কথা বলতে গিয়ে তিনি নির্বাক হয়ে পড়েন।
১৫ বছর ধরে ঢাকায় থাকতেন নাহিদ
নাহিদের চাচাতো ভাই ও প্রতিবেশীরা জানান, প্রায় ১৫ বছর ধরে ঢাকায় বসবাস করছিলেন তিনি। রাজধানীর শ্যামলীতে ‘গ্র্যান্ড পাওয়ার কোম্পানি’ নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পরিবার নিয়ে থাকতেন মিরপুরে।
স্বজনদের তথ্য অনুযায়ী, ১৬ থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত কক্সবাজারের ইনানীর ‘টুপটুপ রিসোর্টে’ থাকার জন্য বুকিং দিয়েছিলেন নাহিদ।
তাঁর ফুফু রোকসানা আক্তার রূপালী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, তাঁরা মারা গেছেন—এ কথা তিনি বিশ্বাস করতে পারছেন না। এখনো মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়নি বলে তাঁরা আশায় আছেন, হয়তো পরিবারের সদস্যরা কোথাও রয়েছেন।
চারটি মরদেহের পরিচয় শনাক্ত হয়নি
প্রতিবেদন অনুযায়ী, অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১০ জনের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। বাকি চারজনের মরদেহ পুড়ে যাওয়ায় তাঁদের পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। পরিচয় শনাক্ত করতে ডিএনএ পরীক্ষা করা হবে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।
নাহিদের বড় ভাই জাহিদুর রহমান জানান, আগুনের খবর পাওয়ার পর থেকে ছোট ভাই, ভাইয়ের স্ত্রী ও দুই ভাতিজির কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহগুলোর মধ্যে তাঁরা রয়েছেন কি না, তা জানার জন্য তিনি সিলেট থেকে কক্সবাজারে পৌঁছেছেন।
তিনি বলেন, উদ্ধার হওয়া চারটি মরদেহের মধ্যে দুটি শিশুর। তবে চেহারা চেনার মতো পরিস্থিতি না থাকায় তাঁরা এখনো কাউকে শনাক্ত করতে পারেননি। আহতদের মধ্যেও তাঁর ভাই বা ভাইয়ের স্ত্রীকে পাওয়া যায়নি। পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলছে।
জাহিদুর রহমান আরও জানান, রিসোর্টের মেমো থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে, ১৬ থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত সেখানে থাকার বুকিং দিয়েছিলেন নাহিদ।
ডিএনএ পরীক্ষার অপেক্ষায় স্বজনেরা
নাহিদের চাচা খালিদুর রহমান জানান, ঢাকার কর্মস্থল ও ব্যক্তিগত বিভিন্ন সূত্রে যোগাযোগ করেও নিখোঁজ চারজনের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তাঁর ভাষ্য, পুড়ে যাওয়া মরদেহগুলোর ডিএনএ পরীক্ষা ছাড়া পরিচয় নিশ্চিত করা কঠিন।
মনিরামপুর থানার ওসি আবু সাঈদ জানান, নাহিদের বড় ভাই জাহিদুর রহমান কক্সবাজারে পৌঁছেছেন। পরিবারের সদস্যদের মরদেহ এখনো শনাক্ত হয়নি বলে তিনি জানতে পেরেছেন। ডিএনএ পরীক্ষা ছাড়া নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়।
ইনানীর রিসোর্টে আগুনে ১০ পর্যটকের মৃত্যু
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত শনিবার সকালে কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানী সমুদ্রসৈকতসংলগ্ন ‘টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে’ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করেন।
আগুন থেকে বাঁচতে কাঠের অবকাঠামোয় নির্মিত রিসোর্টটির শৌচাগারে আশ্রয় নিয়েও চারজন রক্ষা পাননি। সেখান থেকে তাঁদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এ ঘটনায় একই পরিবারের চারজন নিখোঁজ থাকায় স্বজনদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাঁদের পরিচয় ও অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে এখন মরদেহ শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ার ফলাফলের অপেক্ষা করছেন পরিবারের সদস্যরা।
সূত্র: যুগান্তর, তৌহিদ জামান, যশোর।









