রংপুরে শিক্ষক চক্রবর্তী পরিবারের চার খুনের ঘটনায় নতুন তথ্য সামনে এসেছে। এ ঘটনায় সাক্ষী শান্ত দাস আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তবে চার হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত মোটিভ নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা রয়েছে এবং তদন্তে একাধিক অসঙ্গতির বিষয়ও সামনে এসেছে।
রোববার বিকালে রংপুর মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-২-এর বিচারক রফিকুল ইসলামের আদালতে শান্ত এই জবানবন্দি দেন।
ইয়াবা কেনার জন্য মোবাইল বন্ধক
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের আগে সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস শান্তর কাছে মোবাইল ফোন বন্ধক রেখে ইয়াবা কিনেছিলেন।
পুলিশের কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে শান্ত জানিয়েছিলেন, ২১ আগস্ট রাতে তিন ধাপে পাঁচটি ইয়াবা কেনেন সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ। এর মধ্যে সিদ্ধার্থ ৩ হাজার ৫০০ টাকায় শান্তর কাছে মোবাইল ফোন বন্ধক রেখে ইয়াবা কেনেন।
পরদিন বিকালে টাকা পরিশোধ করে সিদ্ধার্থ তার মোবাইল ফোনটি ফেরত নেন। পুলিশের একটি সূত্রের দাবি, মোবাইল ফেরত নেওয়ার ওই টাকা গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ি থেকে লুট করা হয়েছিল। আদালতে শান্ত একই বক্তব্য দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধের বিরুদ্ধে হত্যা স্বীকারের দাবি
পুলিশ জানায়, শান্তর বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসার অভিযোগ থাকলেও তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই। তাকে আটকের সময়ও কোনো মাদক পাওয়া যায়নি। এ কারণে তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়নি।
অন্যদিকে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধকে ২৩ আগস্ট ভোরে গ্রেফতার করা হয়। ওই রাতেই তারা আদালতে হত্যার কথা স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয়।
তবে তদন্ত নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে। কারণ পুলিশ এখনো হত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট মোটিভ নিশ্চিত করতে পারেনি। এমনকি গ্রেফতার দুই আসামির ডিএনএ নমুনাও পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়নি। চারজনের ভিসেরা রিপোর্টের নমুনাও ঘটনার ১২ দিন পর পাঠানো হয়েছে।
পুলিশের দাবি, ইয়াবা সেবন থেকেই হত্যাকাণ্ড
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ ২৭ আগস্ট সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন, ইয়াবা সেবনের জন্য গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে উঠেছিল সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ।
ভোরে গণপতি তাদের দেখে ফেললে ধরা পড়ার আশঙ্কায় প্রথমে তাকে এবং পরে তার স্ত্রী, মেয়ে ও ছেলেকে হত্যা করা হয় বলে পুলিশের দাবি। এরপর ঘটনাটিকে চুরি বা ডাকাতি হিসেবে দেখাতে ঘরের জিনিসপত্র এলোমেলো করে স্বর্ণালংকার ও টাকা নিয়ে যায় তারা।
কমিশনারের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা নয়টি ইয়াবা সেবন করেছিল এবং নেশাগ্রস্ত অবস্থাতেই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়।
ঘটনার সময় নিয়ে পুলিশের বক্তব্যে অমিল
ময়নাতদন্তে চারজনের মৃত্যুর কারণ হিসেবে শ্বাসরোধ বা গলায় ফাঁস দেওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। আদালতে আসামিদের দেওয়া জবানবন্দির সঙ্গে ময়নাতদন্তের তথ্যের মিল রয়েছে বলেও পুলিশ দাবি করেছে।
তবে যুগান্তরের অনুসন্ধানে ঘটনার সময় নিয়ে পুলিশের বক্তব্যের সঙ্গে অমিল পাওয়া গেছে। প্রতিবেশীর সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, সিদ্ধার্থ ভোর ৪টা ৩৮ মিনিটে কোথাও যাচ্ছিলেন এবং ৪টা ৪৩ মিনিট পর্যন্ত বাড়ির সামনের গলিতে ফিরে আসেন।
এদিকে ময়নাতদন্তে চারজনের পাকস্থলীতে খাবার এবং শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। চিকিৎসকের বক্তব্য অনুযায়ী, মৃত্যুর দুই থেকে তিন ঘণ্টা আগে তারা খাবার খেয়েছিলেন।
বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়েও প্রশ্ন
নিহত আগামী চক্রবর্তী ভোর ৫টা ৫৫ মিনিটে বন্ধুর সঙ্গে ফোনে কথা বলার সময় জানিয়েছিলেন, রাতে বিদ্যুৎ না থাকায় তাদের খুব কষ্টে রাত কাটে।
পুলিশের দাবি, হত্যার পর সিসিটিভি ফুটেজ যাতে পাওয়া না যায়, সে জন্য বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল। তবে অনুসন্ধানে হত্যার আগেই বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
অন্য কেউ জড়িত কি না, উঠছে প্রশ্ন
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ওসি জিন্নাত আলীও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, শুধু সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধই হত্যাকাণ্ডে জড়িত কি না।
তার ধারণা, অন্য কেউ জড়িত থাকলে তারা বিষয়টি আড়াল করতে পারে। তাই তদন্ত শেষ হওয়ার আগে তাদের চূড়ান্ত হত্যাকারী বলা যাচ্ছে না বলে মনে করছেন তদন্ত কর্মকর্তা।
ঘটনার পর গা-ঢাকা দেওয়া একজন ব্যক্তি হত্যাকাণ্ডের মোটিভ জানার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারেন বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন।






