চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতিতে নারীর ডিম্বাণু সংগ্রহ করে ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ করা সম্ভব। ‘এগ ফ্রিজিং’ বা ‘ওসাইট ক্রায়োপ্রিজারভেশন’ নামে পরিচিত এই পদ্ধতিতে অনিষিক্ত ডিম্বাণু হিমায়িত অবস্থায় রাখা হয়। পরবর্তীতে সন্তান নেওয়ার প্রয়োজন হলে ওই ডিম্বাণু শুক্রাণু দিয়ে নিষিক্ত করে ভ্রূণ তৈরি করা হয় এবং তা জরায়ুতে স্থাপন করে গর্ভধারণের চেষ্টা করা হয়।
ক্যানসারের মতো রোগের চিকিৎসার আগে ভবিষ্যতে সন্তান ধারণের সক্ষমতা ধরে রাখতে কেউ কেউ ডিম্বাণু সংরক্ষণ করেন। আবার চিকিৎসাগত প্রয়োজন না থাকলেও বয়স বাড়ার সঙ্গে সন্তান ধারণের সক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কায় অনেকে আগে থেকেই এ পদ্ধতি গ্রহণ করেন। প্রশ্ন হলো, ইসলামের দৃষ্টিতে ডিম্বাণু সংরক্ষণ কতটা বৈধ?
চিকিৎসা গ্রহণের মূলনীতি
ইসলামে চিকিৎসা গ্রহণ বৈধ। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘আল্লাহ এমন কোনো রোগ পাঠাননি যার আরোগ্যের ব্যবস্থা দেননি।’ (সহিহ বুখারি: ৫৬৭৮)
তবে সন্তান ধারণ ও প্রজননসংক্রান্ত চিকিৎসার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কিছু বিষয় বিবেচনা করতে হয়। এর সঙ্গে সন্তানের বংশপরিচয়, স্বামী-স্ত্রীর বৈধ সম্পর্ক এবং ব্যবহৃত শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর পরিচয়ের বিষয়ও জড়িত। তাই আধুনিক কোনো প্রজননপ্রযুক্তি বৈধ কি না, তা কীভাবে এবং কোন পরিস্থিতিতে ব্যবহার করা হচ্ছে তার ওপর নির্ভর করে।
কৃত্রিম প্রজননের ক্ষেত্রে শরিয়তের অবস্থান
আন্তর্জাতিক ইসলামি ফিকহ একাডেমি ১৯৮৬ সালে কৃত্রিম প্রজনন বা টেস্টটিউব বেবি নিয়ে একটি সিদ্ধান্ত দেয়। এতে বলা হয়েছে, স্বামী-স্ত্রীর নিজেদের শুক্রাণু ও ডিম্বাণু ব্যবহার করে বৈধ বিবাহের মধ্যে ভ্রূণ তৈরি করে স্ত্রীর জরায়ুতে স্থাপন করা যেতে পারে।
তবে অন্য পুরুষের শুক্রাণু বা অন্য নারীর ডিম্বাণু ব্যবহার করা যাবে না। এমন কোনো পদ্ধতিও গ্রহণ করা যাবে না, যাতে সন্তানের আসল বাবা-মা বা বংশপরিচয় নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়।
অর্থাৎ টেস্টটিউব বেবি বা কৃত্রিম প্রজনন পদ্ধতিকে সরাসরি নিষিদ্ধ করা হয়নি। এখানে মূল বিষয় হলো কার শুক্রাণু ও ডিম্বাণু ব্যবহার করা হচ্ছে এবং পুরো প্রক্রিয়াটি বৈধ দাম্পত্য সম্পর্কের মধ্যে হচ্ছে কি না।
ডিম্বাণু ফ্রিজিং কি জায়েজ?
এ বিষয়ে সমকালীন আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। জর্ডানের সরকারি ইফতা বোর্ড ২০১৭ সালে নারীর ডিম্বাণু ফ্রিজিং নিয়ে একটি সিদ্ধান্ত দেয়। সেখানে বলা হয়েছে, ডিম্বাণু সংরক্ষণকে সরাসরি নিষিদ্ধ বলা যাবে না। তবে ভবিষ্যতে সেটি যেন বৈধ বিবাহের মধ্যেই ব্যবহার করা হয় এবং বংশপরিচয় নিয়ে কোনো জটিলতা তৈরি না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কোনো নারী অবিবাহিত থাকা অবস্থায় বা আগের বিয়ের সময় নিজের ডিম্বাণু সংরক্ষণ করতে পারেন। পরে নতুন করে বৈধ বিয়ে হলে সেই স্বামীর সঙ্গে তা ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। তবে একই স্বামীর সঙ্গে বিয়ে থাকা অবস্থায় ডিম্বাণু সংরক্ষণ করে পরে তা নিষিক্ত করাকে বেশি নিরাপদ ও সতর্কতাপূর্ণ বলা হয়েছে।
অন্যদিকে কিছু আলেম ডিম্বাণু সংরক্ষণের সময় নমুনা মিশে যাওয়া, ভুল ব্যক্তির কাছে চলে যাওয়া বা অন্যভাবে অপব্যবহারের আশঙ্কার কথা বলেছেন। তাই তারা এ বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।
ফলে ডিম্বাণু ফ্রিজিংকে সব অবস্থায় হারাম বলা যেমন ঠিক নয়, তেমনি কোনো শর্ত ছাড়াই সব অবস্থায় জায়েজ বলাও ঠিক নয়।
কী কী শর্ত মানতে হবে?
ডিম্বাণু সংরক্ষণ ও পরে ব্যবহারের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি।
এক. ডিম্বাণুটি ওই নারীর নিজের হতে হবে। অন্য নারীর ডিম্বাণু ব্যবহার করা যাবে না।
দুই. পরে সেটি নিষিক্ত করতে হবে বৈধ স্বামীর শুক্রাণু দিয়ে। অন্য কোনো পুরুষের শুক্রাণু ব্যবহার করা যাবে না।
তিন. সংরক্ষিত ডিম্বাণুর পরিচয় ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। সেটি যেন অন্য কারও ডিম্বাণুর সঙ্গে মিশে না যায় বা ভুল ব্যক্তির ব্যবহারে না যায়, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
চার. ডিম্বাণু নিষিক্ত করে তৈরি ভ্রূণ ওই নারীর নিজের জরায়ুতেই স্থাপন করতে হবে। অন্য নারীর জরায়ু ব্যবহারের মতো পদ্ধতিতে বংশপরিচয় ও মাতৃত্ব নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
পাঁচ. ডিম্বাণু ব্যবহার ও নিষিক্ত করার সময় বৈধ বিবাহ থাকতে হবে। আগে ডিম্বাণু সংরক্ষণ করা হলেও পরে বৈধ দাম্পত্য সম্পর্ক ছাড়া তা ব্যবহার করা যাবে না।
চিকিৎসার প্রয়োজন আর ব্যক্তিগত সুবিধা কি এক?
সব ক্ষেত্রে বিষয়টি একভাবে দেখা হয় না। কোনো নারীর ক্যানসারের চিকিৎসা করতে হবে এবং সেই চিকিৎসায় তার ডিম্বাশয়ের কার্যক্ষমতা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকলে ভবিষ্যতে সন্তান ধারণের সুযোগ ধরে রাখতে চিকিৎসকের পরামর্শে ডিম্বাণু সংরক্ষণের প্রয়োজন হতে পারে। এ ধরনের চিকিৎসাগত প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
অন্যদিকে শুধু ক্যারিয়ার, পড়াশোনা বা ব্যক্তিগত পরিকল্পনার কারণে সন্তান নেওয়ার সময় পিছিয়ে দেওয়ার জন্য ডিম্বাণু সংরক্ষণ করা হলে বিষয়টি আলাদা। তাই নিজের পরিস্থিতি অনুযায়ী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও যোগ্য আলেমের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
ডিম্বাণু ফ্রিজিং আর ভ্রূণ ফ্রিজিং কি এক?
না, দুটো এক বিষয় নয়। ডিম্বাণু ফ্রিজিংয়ের সময় ডিম্বাণু এখনো নিষিক্ত হয়নি। পরে বৈধ স্বামীর শুক্রাণু দিয়ে সেটি নিষিক্ত করে ভ্রূণ তৈরি করা হয়।
অন্যদিকে ভ্রূণ ফ্রিজিংয়ের ক্ষেত্রে ডিম্বাণু ও শুক্রাণু আগে থেকেই নিষিক্ত হয়ে ভ্রূণ তৈরি হয়। ফলে পরে সেই ভ্রূণ কীভাবে ব্যবহার করা হবে এবং তখন বৈবাহিক সম্পর্ক আছে কি না, এসব প্রশ্ন সামনে আসে। তাই দুই বিষয়কে একই বিধানের মধ্যে দেখা ঠিক নয়।
স্বামী মারা গেলে বা তালাক হলে কী হবে?
শুধু ডিম্বাণু সংরক্ষণ করা থাকলে সেটি এখনো নিষিক্ত হয়নি। কিন্তু স্বামীর শুক্রাণু দিয়ে আগে থেকেই ভ্রূণ তৈরি করে সংরক্ষণ করা হলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে যায়।
তালাক বা স্বামীর মৃত্যুর পর সেই ভ্রূণ ব্যবহার করা যাবে কি না, এ বিষয়ে আলাদা ফিকহি প্রশ্ন রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ নিয়মের ওপর নির্ভর না করে যোগ্য মুফতি বা নির্ভরযোগ্য ফতোয়া বোর্ডের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ডিম্বাণু সংরক্ষণ করলেই কি ভবিষ্যতে সন্তান হবে?
না। ডিম্বাণু সংরক্ষণ ভবিষ্যতে সন্তান হওয়ার নিশ্চয়তা দেয় না। কোন বয়সে ডিম্বাণু সংগ্রহ করা হয়েছে, কতগুলো সংরক্ষণ করা হয়েছে, সেগুলোর মান কেমন এবং পরবর্তী নিষিক্তকরণ ও ভ্রূণ জরায়ুতে স্থাপনের প্রক্রিয়া কতটা সফল হয়েছে, এসব বিষয়ের ওপর ফলাফল নির্ভর করে।
তাই ডিম্বাণু ফ্রিজিংকে ভবিষ্যতে সন্তান হওয়ার নিশ্চয়তা হিসেবে দেখা ঠিক নয়। বিশেষ করে চিকিৎসাগত প্রয়োজন থাকলে ডিম্বাণু সংরক্ষণের আগে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও নির্ভরযোগ্য আলেমের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ এখানে চিকিৎসার প্রয়োজনের পাশাপাশি বৈবাহিক সম্পর্ক, বংশপরিচয় এবং ভবিষ্যতে ডিম্বাণুটি কীভাবে ব্যবহার করা হবে, এসব বিষয়ও বিবেচনা করতে হয়।


