নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পর বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। দেশটির ছয়টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেল ও ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় ৯০০ জনের বেশি মানুষ আটকা পড়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তাদের উদ্ধারে অভিযান চালাচ্ছেন উদ্ধারকারীরা। টানেলের প্রবেশমুখে জমে থাকা কাদা ও ধ্বংসস্তূপ সরানোর চেষ্টা চলছে।
সোমবার (৩১ আগস্ট) নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এ তথ্য জানিয়েছে।
কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো থেকে ৯৩৩ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের উদ্ধারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
টানেলের ভেতরে বুকসমান কাদা
উদ্ধারকারী দলের প্রকাশ করা ছবি ও ভিডিওতে ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখা গেছে।
ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে টানেলের প্রবেশমুখের কাদা ও ধ্বংসাবশেষ সরানো হচ্ছে।
নেপাল সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজা রাম বাসনেত জানান, বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ টানেলের ভেতরে জমে গেছে। এতে উদ্ধারকাজ বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
উদ্ধারকারী দলের সদস্য আশিস গুরুং জানান, টানেলের ভেতরের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ।
কোথাও কোথাও কাদার গভীরতা বুক পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।
রোববার তার দল রুস্বানার চিলিমে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে পৌঁছানোর চেষ্টা করে।
টানেলের ভেতরে কাদার গভীরতা মাপতে পর্বতারোহীরা কাঠের তক্তা ব্যবহার করেন। পরে এসব তক্তা দিয়ে অস্থায়ী সেতু তৈরি করা হয়।
নিরাপত্তার জন্য দড়িও ব্যবহার করা হচ্ছে।
গুরুং জানান, তারা টানেলের প্রায় ১৩০ মিটার ভেতরে যেতে পেরেছেন। এরপর আরও ভেতরে মরদেহের মতো কিছু দেখতে পান তারা।
তবে জলবিদ্যুৎ কোম্পানির দেওয়া নকশায় টানেলের ভেতরে কিছু নিরাপদ জায়গার কথা বলা হয়েছে। সেখানে আটকা পড়া মানুষ আশ্রয় নিয়ে বেঁচে থাকতে পারেন বলে আশা করছেন উদ্ধারকারীরা।
নেপালে মৃত ৯১৯, নিখোঁজ হাজারো
গত বুধবার হিমালয় থেকে বরফ, পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের ভয়াবহ স্রোত নেমে আসে।
এতে নেপালের বিস্তীর্ণ এলাকায় নজিরবিহীন ধ্বংসযজ্ঞ হয়।
দেশটিতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৯১৯ জনে দাঁড়িয়েছে।
তিব্বতের অংশে আরও ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।
নেপালে এখনো ৪ হাজার ২৪৭ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
নিখোঁজদের মধ্যে ৫৯২ জন বিদেশি নাগরিক।
তিব্বতে আরও ৫৪৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
খারাপ আবহাওয়ায় বারবার বন্ধ হয়েছে উদ্ধারকাজ
শুক্রবার থেকে খারাপ আবহাওয়া ও নতুন বন্যার আশঙ্কায় কয়েক দফা উদ্ধার অভিযান বন্ধ রাখতে হয়েছে।
নেপাল-চীন সীমান্তে দুর্যোগের কারণে একটি হ্রদ তৈরি হয়েছে। সেটি উপচে পড়ায় নদীগুলোতে নতুন করে বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তবে সোমবার আবহাওয়া পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।
এর ফলে উদ্ধারকাজ আবারও গতি পেয়েছে বলে জানিয়েছেন রাসুয়া জেলার প্রশাসক নরেন্দ্র পারিয়ার।
নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ এই ঘটনাকে নজিরবিহীন ও ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তিনি জানান, মানুষের জীবন বাঁচাতে উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাওয়া হবে।
উদ্ধার অভিযানে প্রায় ২১ হাজার নিরাপত্তাকর্মী কাজ করছেন। তাদের সঙ্গে বেসামরিক কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবীরাও রয়েছেন।
ভারত ও চীনের সহায়তা নিচ্ছে নেপাল
এর আগে নেপাল জানিয়েছিল, অনুসন্ধান ও উদ্ধারকাজে বিদেশি সহায়তার প্রয়োজন নেই।
তবে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেল থেকে মানুষ উদ্ধারে এখন ভারত ও চীনের বিশেষজ্ঞ সহায়তা নেওয়া হচ্ছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, বেইজিং ২ হাজার ১০০ জনের বেশি উদ্ধারকর্মী মোতায়েন করেছে।
ত্রাণ ও উদ্ধারকাজে অন্তত ২২ কোটি ইউয়ান বরাদ্দ করা হয়েছে।
নিখোঁজদের সন্ধানে চীনা সেনারা জীবন শনাক্তকারী বিশেষ সরঞ্জাম ব্যবহার করছেন।
৯০ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন
রেড ক্রসের হিসাবে, এই দুর্যোগে নেপালে ৯০ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।
দুর্যোগটির সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা চলছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম জানিয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে হিমবাহের অস্থিতিশীলতা বেড়েছে।
এর ফলে তিব্বত মালভূমিতে এ ধরনের ‘ক্রায়োস্ফিয়ার দুর্যোগ’ নতুন ও বাড়তে থাকা ঝুঁকি হয়ে উঠছে।
তবে ভবিষ্যৎ দুর্যোগ মোকাবিলায় তথ্য ভাগাভাগি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
নেপালের দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, হিমবাহের ঝুঁকি ও পানির স্তর সম্পর্কে চীনের কাছ থেকে পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়া যায়নি।
তাদের আশঙ্কা, তথ্যের ঘাটতি ভবিষ্যতে দুর্যোগ মোকাবিলায় সমস্যা তৈরি করতে পারে।
এদিকে বন্যায় ভেসে যাওয়া অনেক মরদেহ এখনো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
হিমালয়ের বিভিন্ন এলাকায় সেগুলো অগভীর কবরে দাফন করা হচ্ছে।
উদ্ধার অভিযান এখনো চলছে। ফলে মৃত ও নিখোঁজের সংখ্যা আরও পরিবর্তিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান






