GULF BANGLA বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন +880 1755727432
Home / প্রবাসের খবর / যুক্তরাষ্ট্র / পৌনে দুই বছরে ৩ লাখের বেশি ভিসা বাতিল করল ট্রাম্প প্রশাসন, কেন?

পৌনে দুই বছরে ৩ লাখের বেশি ভিসা বাতিল করল ট্রাম্প প্রশাসন, কেন?

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে তিন লাখের বেশি ভিসা বাতিল করেছে তাঁর প্রশাসন। দেশটির অভিবাসনবিরোধী কঠোর পদক্ষেপের মধ্যে মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) এ তথ্য জানিয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ভিসা বাতিলের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। এর ফলে প্রশ্ন উঠেছে, এত বিপুলসংখ্যক ভিসা কেন বাতিল করা হচ্ছে, কোন ধরনের ভিসাধারীরা এর আওতায় পড়ছেন এবং এ ক্ষেত্রে অভিবাসন ও জাতীয় নিরাপত্তানীতির ভূমিকা কতটা।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু হওয়ার পর থেকে গত ১০ আগস্ট পর্যন্ত এক লাখ ৭৫ হাজারের বেশি ভিসা বাতিলের তথ্য জানিয়েছিল মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর। সর্বশেষ হিসাবে সেই সংখ্যা তিন লাখ ছাড়িয়েছে।

## আইন লঙ্ঘন ও অপরাধের অভিযোগ

ট্রাম্প প্রশাসনের বক্তব্য, ভিসার শর্ত ভঙ্গ, প্রতারণা, অপরাধে জড়িত থাকা কিংবা জননিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করার অভিযোগে বিদেশি নাগরিকদের ভিসা বাতিল করা হচ্ছে।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের আগের তথ্য অনুযায়ী, হামলা, মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো, চুরি এবং মাদকসংক্রান্ত অপরাধ ভিসা বাতিলের উল্লেখযোগ্য কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে।

প্রশাসনের যুক্তি, যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি পাওয়ার পরও ভিসাধারীদের দেশটির আইন ও ভিসার শর্ত মেনে চলতে হবে। এসব শর্ত লঙ্ঘন করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

তবে সর্বশেষ তিন লাখের বেশি ভিসা বাতিলের মধ্যে কোন কারণে কতটি ভিসা বাতিল হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ বিভাজন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

## জাতীয় নিরাপত্তার যুক্তিতে কঠোর যাচাই

জাতীয় নিরাপত্তা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলে ভিসা যাচাই-বাছাই জোরদার করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। ভিসাধারীদের কর্মকাণ্ড এবং আবেদনকারীদের দেওয়া তথ্য যাচাইয়ের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র টমি পিগটের বক্তব্য অনুযায়ী, আইন লঙ্ঘন, প্রতারণা কিংবা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করা বিদেশি নাগরিকদের বিষয়ে প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে।

তবে নিরাপত্তার স্বার্থে নেওয়া এসব পদক্ষেপের পরিধি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। সমালোচকদের আশঙ্কা, কঠোর নীতির প্রয়োগে সরকারের সমালোচক বা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়া বিদেশি নাগরিকেরাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।

## ফিলিস্তিনপন্থি বিক্ষোভ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট

ভিসা বাতিলের সবচেয়ে বিতর্কিত দিকগুলোর একটি হলো রাজনৈতিক মতপ্রকাশ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঘটনা।

গাজায় ইসরাইলের হামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ফিলিস্তিনপন্থি বিদেশি নাগরিকদের ভিসা বাতিলের ঘটনা নিয়ে মানবাধিকারকর্মীরা সমালোচনা করেছেন।

এ ছাড়া রক্ষণশীল রাজনৈতিক ভাষ্যকার চার্লি কার্কের হত্যাকাণ্ড নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করার পর কয়েকজন বিদেশির ভিসা বাতিলের ঘটনাও বিতর্ক তৈরি করেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ ধরনের ছয়টি ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

একই সময়ে ভিসাপ্রার্থী ও অভিবাসীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কার্যক্রম যাচাইয়ের বিষয়েও কঠোরতা বাড়ানো হয়েছে।

মানবাধিকারকর্মীদের আশঙ্কা, এ ধরনের নজরদারি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। অন্যদিকে প্রশাসন আইন প্রয়োগ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার যুক্তিতে এসব পদক্ষেপের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

## অভিবাসন ব্যবস্থায় প্রতারণা ঠেকানোর উদ্যোগ

ভিসা আবেদনে মিথ্যা তথ্য দেওয়া, প্রতারণা এবং অভিবাসন ব্যবস্থার অপব্যবহার ঠেকানোও ট্রাম্প প্রশাসনের ঘোষিত লক্ষ্য।

প্রশাসনের অবস্থান অনুযায়ী, ভিসা পাওয়া মানেই যুক্তরাষ্ট্রে অনির্দিষ্টকাল অবস্থানের নিশ্চয়তা নয়। ভিসার শর্ত ভঙ্গ বা আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

তবে সমালোচকদের মতে, কিছু প্রতারণার ঘটনা মোকাবিলার নামে বৃহত্তর অভিবাসী জনগোষ্ঠীর ওপর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর ঝুঁকি রয়েছে। মিনেসোটার সোমালি-আমেরিকান সম্প্রদায়কে ঘিরে নেওয়া পদক্ষেপের ক্ষেত্রেও এ ধরনের উদ্বেগ সামনে এসেছে।

## বৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়াও কঠিন হচ্ছে?

ট্রাম্পের ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারে অবৈধ অভিবাসন বন্ধের প্রতিশ্রুতি গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছিল। কিন্তু ক্ষমতায় ফেরার পর তাঁর প্রশাসনের বিভিন্ন পদক্ষেপ বৈধ অভিবাসনপ্রক্রিয়াতেও প্রভাব ফেলেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কিছু কর্মভিসায় ব্যয়বহুল ফি আরোপ এবং আবেদনকারীদের যাচাই-বাছাই বাড়ানোর কারণে বৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে যেতে আগ্রহীদের জন্যও প্রক্রিয়া কঠিন হয়ে উঠেছে।

এর ফলে শিক্ষার্থী, কর্মী ও অন্যান্য ভিসাপ্রার্থীদের ক্ষেত্রে নীতিগত পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে সব ধরনের ভিসা বা আবেদনকারীর ওপর একই নিয়মে প্রভাব পড়ছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো বিস্তারিত তথ্য প্রতিবেদনে নেই।

## কয়েক মাসে ভিসা বাতিলের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ১০ আগস্টের হিসাবে, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরুর পর থেকে ভিসা বাতিলের সংখ্যা ছিল এক লাখ ৭৫ হাজারের বেশি। ২০ অক্টোবরের হিসাবে তা তিন লাখ ছাড়িয়েছে।

অর্থাৎ, এ দুই হিসাবের মধ্যবর্তী সময়ে বাতিল হওয়া ভিসার সংখ্যা অন্তত এক লাখ ২৫ হাজার বেড়েছে। এটি ভিসা বাতিল কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।

তবে প্রকাশিত তথ্য থেকে অপরাধ, প্রতারণা, ভিসার শর্ত লঙ্ঘন ও জাতীয় নিরাপত্তার বিবেচনায় কতটি ভিসা বাতিল হয়েছে, তা নির্দিষ্টভাবে জানা যায় না। একইভাবে, সংশ্লিষ্ট সব অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়েছে কি না, সে সম্পর্কেও পূর্ণাঙ্গ তথ্য দেওয়া হয়নি।

## নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন

ট্রাম্প প্রশাসন ভিসা বাতিলের পদক্ষেপকে আইন প্রয়োগ, অভিবাসন ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ এবং দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অংশ হিসেবে তুলে ধরছে। অন্যদিকে মানবাধিকারকর্মীরা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং বৈষম্যমূলক নজরদারির সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।

বিশেষ করে রাজনৈতিক বিক্ষোভে অংশ নেওয়া বিদেশি নাগরিকদের ভিসা বাতিল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কার্যক্রম যাচাইয়ের বিষয়টি বিতর্ককে আরও জোরালো করেছে।

সব মিলিয়ে, তিন লাখের বেশি ভিসা বাতিলের ঘটনা ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অভিবাসননীতির ব্যাপ্তি তুলে ধরছে। তবে এই পদক্ষেপের পূর্ণ প্রভাব বুঝতে ভিসা বাতিলের কারণভিত্তিক তথ্য, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আইনি অবস্থার বিস্তারিত জানা গুরুত্বপূর্ণ।

Social Icons