GULF BANGLA বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন +880 1755727432
Home / লাইফ স্টাইল / ৫০ বছরে পুরুষের টেস্টোস্টেরন কমেছে ৫৪ শতাংশ, গবেষণায় উদ্বেগ

৫০ বছরে পুরুষের টেস্টোস্টেরন কমেছে ৫৪ শতাংশ, গবেষণায় উদ্বেগ

পুরুষের যৌনস্বাস্থ্য, পেশি গঠন, শুক্রাণু উৎপাদন ও প্রজননক্ষমতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হরমোন টেস্টোস্টেরন। গত কয়েক দশকে পুরুষদের শরীরে এ হরমোনের মাত্রা কমে যাওয়ার প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একটি গবেষণায় ১৯৭২ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা প্রায় ৫৪ শতাংশ কমার কথা জানানো হয়েছে।

যুক্তরাজ্যের লন্ডনে ইউরোপিয়ান সোসাইটি অব হিউম্যান রিপ্রোডাকশন অ্যান্ড এমব্রায়োলজির বার্ষিক সভায় গবেষণাটির ফলাফল তুলে ধরা হয়। এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম *দ্য গার্ডিয়ান*।

তবে গবেষণায় পাওয়া এই পরিসংখ্যানের ব্যাখ্যা এবং এর পেছনে থাকা কারণগুলো নিশ্চিতভাবে বুঝতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

## টেস্টোস্টেরন কেন গুরুত্বপূর্ণ?

টেস্টোস্টেরন পুরুষের প্রধান যৌন হরমোন। বয়ঃসন্ধিকালে শারীরিক পরিবর্তন, পেশি ও হাড়ের বিকাশ, যৌন আকাঙ্ক্ষা এবং শুক্রাণু উৎপাদনে এ হরমোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

শরীরে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে কমে গেলে যৌন আকাঙ্ক্ষা হ্রাস, ক্লান্তি, পেশির শক্তি কমে যাওয়া এবং কিছু ক্ষেত্রে প্রজননস্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে এসব লক্ষণের পেছনে ঘুমের সমস্যা, মানসিক চাপ, অন্য কোনো রোগ বা ওষুধের প্রভাবও থাকতে পারে।

শুধু উপসর্গ দেখে টেস্টোস্টেরনের ঘাটতি নিশ্চিত করা যায় না। প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শে পরীক্ষা করাতে হয়।

## কেন কমতে পারে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা?

গবেষকদের ধারণা, পুরুষের টেস্টোস্টেরন কমে যাওয়ার পেছনে একাধিক বিষয় ভূমিকা রাখতে পারে। এর মধ্যে অতিরিক্ত ওজন, ডায়াবেটিস ও বিপাকীয় সমস্যার মতো স্বাস্থ্যগত কারণ রয়েছে। পাশাপাশি পরিবেশে থাকা কিছু রাসায়নিক উপাদানের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়েও আলোচনা হচ্ছে।

### ১. অতিরিক্ত ওজন ও বিপাকীয় সমস্যা

অতিরিক্ত শরীরের চর্বি এবং বিপাকীয় সমস্যার সঙ্গে টেস্টোস্টেরনের নিম্নমাত্রার সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে স্থূলতা ও টাইপ-২ ডায়াবেটিসের মতো অবস্থায় কিছু পুরুষের হরমোনের মাত্রা কমে যেতে পারে।

তবে সবার ক্ষেত্রে এর প্রভাব এক নয়। ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং সংশ্লিষ্ট রোগের যথাযথ ব্যবস্থাপনা সামগ্রিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখতেও সহায়ক হতে পারে।

### ২. হরমোনে প্রভাব ফেলে এমন রাসায়নিক

কিছু প্লাস্টিক, গৃহস্থালি পণ্য ও অন্যান্য সামগ্রীতে এমন রাসায়নিক থাকতে পারে, যেগুলো শরীরের হরমোন নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে। এ ধরনের উপাদানকে বলা হয় এন্ডোক্রাইন-বিঘ্নকারী রাসায়নিক।

এসব রাসায়নিকের সংস্পর্শ এবং প্রজননস্বাস্থ্যের সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা চলছে। তবে টেস্টোস্টেরনের দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের কতটা এসব উপাদানের কারণে ঘটেছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।

### ৩. পরিবেশগত পরিবর্তন

পরিবেশদূষণ ও বৈশ্বিক উষ্ণতার মতো বিষয়গুলোর সঙ্গে হরমোনের পরিবর্তনের সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়েও গবেষকেরা আলোচনা করছেন। তবে এসব পরিবর্তন সরাসরি টেস্টোস্টেরন কমার কারণ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ এখনো পর্যাপ্ত নয়।

গবেষণায় দেখা যাওয়া দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতার পেছনে জীবনযাপন, স্বাস্থ্যগত অবস্থা, পরিবেশ এবং তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতিসহ একাধিক বিষয় ভূমিকা রাখতে পারে।

## গবেষকেরা কী বলছেন?

গবেষক হাগাই লেভিনের বক্তব্য অনুযায়ী, ১৯৭২ থেকে ২০১৯ সালের তথ্য বিশ্লেষণে পুরুষদের টেস্টোস্টেরনের মাত্রা উল্লেখযোগ্য হারে কমার প্রবণতা দেখা গেছে। তাঁর মতে, এ পরিবর্তনকে কেবল আকস্মিক ঘটনা বা পরিসংখ্যানগত ভুল হিসেবে উড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়।

ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের হরমোন বিশেষজ্ঞ চান্না জয়সেনাও পুরুষের প্রজননস্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, বিভিন্ন সময়ের গবেষণায় পাওয়া ফলাফলের ধারাবাহিকতা বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।

এর আগে বিভিন্ন গবেষণায় পুরুষদের শুক্রাণুর সংখ্যা কমে যাওয়ার প্রবণতা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে শুক্রাণুর সংখ্যা ও টেস্টোস্টেরনের মাত্রা দুটি পৃথক বিষয়; একটির পরিবর্তন দিয়ে অন্যটির অবস্থা নিশ্চিত করা যায় না।

## টেস্টোস্টেরন কমার লক্ষণ কী?

টেস্টোস্টেরনের ঘাটতি হলে কিছু পুরুষের মধ্যে যেসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে, সেগুলো হলো—

– যৌন আকাঙ্ক্ষা কমে যাওয়া
– অস্বাভাবিক ক্লান্তি বা শক্তি কম অনুভব করা
– পেশির শক্তি বা ভর কমে যাওয়া
– যৌন সক্ষমতা নিয়ে সমস্যা
– কিছু ক্ষেত্রে মেজাজ বা মনোযোগে পরিবর্তন

এসব লক্ষণ অন্য রোগ বা শারীরিক সমস্যার কারণেও হতে পারে। তাই নিজে নিজে রোগ নির্ণয় না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

## টেস্টোস্টেরনের মাত্রা ঠিক রাখতে কী করবেন?

স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সহায়তা করতে পারে। এ জন্য কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে—

– শরীরের ওজন স্বাস্থ্যকর সীমায় রাখার চেষ্টা করা
– নিয়মিত শরীরচর্চা করা
– পর্যাপ্ত ও নিয়মিত ঘুম নিশ্চিত করা
– সুষম খাবার খাওয়া
– ডায়াবেটিসসহ দীর্ঘমেয়াদি রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা
– চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া হরমোন বা টেস্টোস্টেরন বাড়ানোর ওষুধ ব্যবহার না করা

তবে এসব অভ্যাস সব ক্ষেত্রে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা স্বাভাবিক করে দেবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। হরমোনের ঘাটতির পেছনে নির্দিষ্ট রোগ বা অন্য কারণ থাকলে তার চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে।

## কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?

দীর্ঘদিন ধরে যৌন আকাঙ্ক্ষা কমে যাওয়া, অস্বাভাবিক ক্লান্তি, পেশির শক্তি কমে যাওয়া কিংবা প্রজননস্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা উচিত।

চিকিৎসক উপসর্গ, শারীরিক অবস্থা ও চিকিৎসার ইতিহাস বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা দিতে পারেন। টেস্টোস্টেরনের ঘাটতি নির্ণয়ে সাধারণত উপসর্গের পাশাপাশি উপযুক্ত সময়ে করা রক্ত পরীক্ষার ফলও বিবেচনা করা হয়।

নিজে থেকে টেস্টোস্টেরন গ্রহণ করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে বাইরে থেকে টেস্টোস্টেরন গ্রহণ শুক্রাণু উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারে এবং সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলে সমস্যা তৈরি করতে পারে।

## আরও গবেষণার প্রয়োজন

পুরুষের টেস্টোস্টেরনের মাত্রা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় যে প্রবণতা উঠে এসেছে, তা প্রজননস্বাস্থ্য নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। তবে এ পরিবর্তনের পেছনে কোন কারণ কতটা দায়ী, তা নির্ধারণ করতে আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে জীবনযাপন ও পরিবেশগত ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো এবং উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণার ফলাফলকে ব্যক্তিগত রোগ নির্ণয় হিসেবে না দেখে স্বাস্থ্যসচেতনতার একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হিসেবে বিবেচনা করাই যুক্তিযুক্ত।

Social Icons