GULF BANGLA বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন +880 1755727432
Home / ধর্ম ও সমাজ / লোকদেখানো ইবাদত ও সৎকর্মের সওয়াব নষ্ট করে

লোকদেখানো ইবাদত ও সৎকর্মের সওয়াব নষ্ট করে

ইবাদতের মূল প্রাণ হলো ইখলাস বা একনিষ্ঠতা। একজন মুমিন নামাজ, রোজা, দান-সদকা, কোরআন তিলাওয়াত কিংবা অন্য যেকোনো সৎকর্ম করবেন একমাত্র আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির জন্য। মানুষের প্রশংসা, সামাজিক মর্যাদা কিংবা নাম-যশ অর্জনের উদ্দেশ্যে নেক আমল করলে সেই আমল আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না। ইসলামের পরিভাষায় এ ধরনের লোকদেখানো মনোভাবকে ‘রিয়া’ বা ‘লৌকিকতা’ বলা হয়।

দান করার পর খোঁটা দেওয়া এবং লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে সম্পদ ব্যয় করার ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন—

‘হে মুমিনগণ! তোমরা খোঁটা ও কষ্ট দেওয়ার মাধ্যমে তোমাদের দান-সদকা বাতিল করো না—সেই ব্যক্তির মতো, যে তার সম্পদ ব্যয় করে লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে এবং আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি বিশ্বাস রাখে না।’
(সুরা বাকারা, আয়াত: ২৬৪)

আয়াতটিতে লোকদেখানো আমলকে এমন একটি মসৃণ পাথরের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, যার ওপর সামান্য মাটি জমেছে। প্রবল বৃষ্টি হলে সেই মাটি ধুয়ে যায় এবং পাথরটি একেবারে খালি হয়ে পড়ে। তেমনি ইখলাসহীন আমল বাহ্যিকভাবে সুন্দর ও মূল্যবান মনে হলেও আখিরাতে তার কোনো প্রতিদান পাওয়া যাবে না।

নিয়তই আমলের ভিত্তি

একই কাজ দুই ব্যক্তি করলেও তাদের প্রতিদান এক নাও হতে পারে। কারণ আল্লাহ তাআলা শুধু বাহ্যিক কাজ দেখেন না; তিনি মানুষের অন্তরের নিয়তও জানেন। কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দান করলে তা ইবাদত হিসেবে গণ্য হয়। কিন্তু কেউ যদি দানশীল হিসেবে পরিচিত হওয়ার জন্য সম্পদ ব্যয় করে, তবে মানুষের প্রশংসাই হবে তার পার্থিব প্রতিদান।

হজরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) কিয়ামতের দিনের অত্যন্ত ভয়াবহ একটি দৃশ্য তুলে ধরেছেন। সেখানে একজন যোদ্ধা, একজন আলেম ও কোরআনের কারী এবং একজন দানশীল ব্যক্তিকে আল্লাহর দরবারে উপস্থিত করা হবে।

যোদ্ধা বলবে, সে আল্লাহর পথে জীবন দিয়েছে। কিন্তু তাকে বলা হবে, সে যুদ্ধ করেছে যেন মানুষ তাকে বীর বলে। আলেম ও কারী বলবে, সে জ্ঞান অর্জন করেছে, মানুষকে শিক্ষা দিয়েছে এবং কোরআন পাঠ করেছে। তাকে বলা হবে, তার উদ্দেশ্য ছিল মানুষ যেন তাকে আলেম ও কারী বলে। দানশীল ব্যক্তি বলবে, সে আল্লাহর পথে সম্পদ ব্যয় করেছে। তাকেও বলা হবে, সে দান করেছে যেন মানুষ তাকে দানশীল বলে।

তারা দুনিয়ায় মানুষের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত প্রশংসা পেয়েছে; কিন্তু নিয়ত বিশুদ্ধ না থাকায় আখিরাতে তাদের আমল কোনো উপকারে আসবে না। বরং তাদের জাহান্নামে নিক্ষেপ করার নির্দেশ দেওয়া হবে।
(সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৯০৫)

এই হাদিস আমাদের শেখায়—কাজ যত বড়ই হোক, নিয়ত বিশুদ্ধ না হলে তা আল্লাহর কাছে মূল্যহীন হয়ে যেতে পারে।

রিয়া মুনাফিকদের বৈশিষ্ট্য

পবিত্র কোরআনে লোকদেখানো ইবাদতকে মুনাফিকদের একটি লক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন—

‘তারা যখন সালাতের জন্য দাঁড়ায়, তখন শৈথিল্যভরে দাঁড়ায়; তারা মানুষকে দেখানোর জন্য তা করে এবং আল্লাহকে খুব কমই স্মরণ করে।’
(সুরা নিসা, আয়াত: ১৪২)

আরেক স্থানে আল্লাহ তাআলা বলেন—

‘অতএব দুর্ভোগ সেই নামাজিদের জন্য, যারা নিজেদের নামাজ সম্পর্কে উদাসীন; যারা লোক দেখানোর জন্য ইবাদত করে।’
(সুরা মাউন, আয়াত: ৪–৬)

লোকদেখানো ব্যক্তির কাছে মানুষের উপস্থিতিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। মানুষের সামনে সে ইবাদত সুন্দর ও দীর্ঘ করে, কিন্তু একাকী অবস্থায় ইবাদতের প্রতি অবহেলা করে। অথচ একজন প্রকৃত মুমিন মানুষের প্রশংসার চেয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে বেশি গুরুত্ব দেন।

রিয়া কেন ‘ক্ষুদ্র শিরক’

আল্লাহ তাআলা বলেন—

‘যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার প্রতিপালকের ইবাদতে কাউকেও শরিক না করে।’
(সুরা কাহফ, আয়াত: ১১০)

রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘আমি তোমাদের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টির আশঙ্কা করি, তা হলো ক্ষুদ্র শিরক।’ সাহাবিরা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! ক্ষুদ্র শিরক কী?’ তিনি বললেন, ‘রিয়া বা লোকদেখানো আমল।’
(মুসনাদে আহমাদ)

রিয়াকে ক্ষুদ্র শিরক বলা হয়, কারণ বাহ্যিকভাবে আমলটি আল্লাহর জন্য করা হলেও এর মধ্যে মানুষের প্রশংসা ও সন্তুষ্টি লাভের আকাঙ্ক্ষা যুক্ত থাকে। অর্থাৎ যে আমল শুধু আল্লাহর জন্য হওয়ার কথা, সেখানে অন্যের দৃষ্টি ও প্রশংসাকে অংশীদার করা হয়।

দাজ্জালের ফিতনার চেয়েও ভয়ংকর

হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আমি কি তোমাদের এমন একটি বিষয় সম্পর্কে জানাব না, যা আমার কাছে তোমাদের জন্য দাজ্জালের ফিতনার চেয়েও বেশি ভয়ংকর?’

সাহাবিরা বললেন, ‘অবশ্যই জানাবেন।’

তিনি বললেন, ‘তা হলো গোপন শিরক। একজন ব্যক্তি নামাজে দাঁড়ায়, এরপর অন্য কেউ তাকে দেখছে বুঝতে পেরে সে তার নামাজকে আরও সুন্দর করে।’
(সুনানে ইবনে মাজাহ)

রিয়া অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে মানুষের অন্তরে প্রবেশ করে। অনেক সময় ব্যক্তি নিজেও বুঝতে পারে না যে তার কাজের মধ্যে মানুষের প্রশংসা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে। এ কারণেই প্রতিটি আমলের আগে, আমলের সময় এবং আমল শেষ হওয়ার পর নিজের নিয়ত পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

দান করে খোঁটা দেওয়াও বিপজ্জনক

দান-সদকা শুধু সম্পদ দেওয়ার নাম নয়; এর সঙ্গে দাতার আচরণও জড়িত। কাউকে সাহায্য করার পর বারবার সেই অনুগ্রহের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া, তাকে ছোট করা কিংবা কষ্ট দেওয়া দানের সওয়াব নষ্ট করে দিতে পারে।

একজন মুমিন এমনভাবে দান করবেন, যেন সাহায্যগ্রহণকারী ব্যক্তি অপমানিত না হন। দানের কথা প্রচার করে নিজের মর্যাদা বাড়ানোর চেষ্টা না করে যতটা সম্ভব গোপনে দান করা উত্তম। তবে অন্যদের উৎসাহিত করা বা কোনো কল্যাণমূলক কাজের স্বচ্ছতা রক্ষার প্রয়োজন হলে প্রকাশ্যে দান করা যেতে পারে—শর্ত হলো, নিয়ত যেন আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই থাকে।

রিয়া থেকে বাঁচার উপায়

রিয়া থেকে আত্মরক্ষার জন্য কয়েকটি বিষয় অনুসরণ করা প্রয়োজন—

  • প্রত্যেক আমলের আগে নিজের নিয়ত যাচাই করা।
  • সম্ভব হলে নফল ইবাদত ও দান গোপনে করা।
  • মানুষের প্রশংসা ও সমালোচনাকে আমলের উদ্দেশ্য না বানানো।
  • নিজের সৎকর্ম প্রচার করার অপ্রয়োজনীয় প্রবণতা পরিহার করা।
  • আমল কবুল হওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে নিয়মিত দোয়া করা।
  • নিজের আমল নিয়ে অহংকার না করে আল্লাহর অনুগ্রহ হিসেবে বিবেচনা করা।
  • মানুষ দেখছে কি না—তা না ভেবে সর্বাবস্থায় সুন্দরভাবে ইবাদত করা।

মানুষের প্রশংসা ক্ষণস্থায়ী; কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টি ও আখিরাতের প্রতিদান চিরস্থায়ী। তাই আমাদের প্রতিটি ইবাদত ও সৎকর্ম শুধু আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করা উচিত।

আল্লাহ তাআলা আমাদের অন্তরকে রিয়া, অহংকার ও খ্যাতির মোহ থেকে পবিত্র করুন। আমাদের সব ইবাদত ও সৎকর্ম একমাত্র তাঁর জন্য করার তাওফিক দিন এবং আমাদের আমলগুলো কবুল করুন। আমিন।

Social Icons