কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ভবিষ্যতে মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন অ্যানথ্রপিক ও গুগল ডিপমাইন্ডের দুই গবেষক। এআই উন্নয়নের গতি, নিরাপত্তা ও ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ থেকে তারা নিজেদের পদ ছেড়েছেন। একই সঙ্গে এআই খাতে আরও স্বচ্ছতা ও স্বাধীন নজরদারির দাবি জানিয়েছেন তারা।
অ্যানথ্রপিকে এআই নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা একটি গবেষণা দলের নেতৃত্বে ছিলেন জো বেন্টন। অন্যদিকে জশ এঙ্গেলস গুগল ডিপমাইন্ডে এআই নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করতেন। চাকরি ছাড়ার পর প্রথমবারের মতো এনবিসি নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তারা এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে কথা বলেন।
বেন্টনের মতে, এআই গবেষণা খুব দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। এই গতি আরও বাড়লে একসময় তা মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
এঙ্গেলস বলেন, এআইয়ের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নেতৃত্বের অভাব রয়েছে। সবাই চেষ্টা করলেও মানুষকে সুরক্ষিত রাখার জন্য যথেষ্ট উদ্যোগ নেই বলে তিনি মনে করেন।
সম্প্রতি অ্যানথ্রপিকের আরেক সাবেক গবেষক জ্যাকব কক্সন চাকরি ছাড়ার ঘোষণা দেন। এরপর এআইয়ের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এআই উন্নয়নের গতি ও এর সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
বেন্টন ও এঙ্গেলস মনে করেন, এআই যত দ্রুত উন্নত হচ্ছে, এর সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে সাধারণ মানুষকেও তত বেশি জানানো প্রয়োজন।
হাগিং ফেসে এআইয়ের সাইবার হামলার প্রসঙ্গ
এআইয়ের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগের উদাহরণ হিসেবে তারা হাগিং ফেসে সাম্প্রতিক একটি সাইবার হামলার কথা উল্লেখ করেছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে সাইবার নিরাপত্তা পরীক্ষার সময় ওপেনএআইয়ের একটি শক্তিশালী এআই মডেল হাগিং ফেসের সিস্টেমে অননুমোদিতভাবে প্রবেশ করে। এ সময় মডেলটি নির্ধারিত কাজের বাইরে গিয়ে কিছু পদক্ষেপ নেয়।
এঙ্গেলসের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব ঘটনায় কোনো মানুষ সরাসরি এআইকে খারাপ কিছু করার নির্দেশ দিয়েছিল এমন নয়। বরং কাজ শেষ করার জন্য এআই মডেল নিজেই এমন কিছু পদ্ধতি বেছে নিয়েছিল, যা নিরাপত্তার সীমা ছাড়িয়ে যায়।
ওপেনএআই জানিয়েছে, ওই ঘটনার পর তারা নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও শক্ত করেছে। ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী এআই মডেল তৈরির ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণের বিষয়েও বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
অ্যানথ্রপিকও জানিয়েছে, এআই থেকে বড় ধরনের সুবিধা পাওয়ার পাশাপাশি বড় ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। এসব ঝুঁকি কমাতে শক্তিশালী নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে তারা কাজ করছে।
এআই কোম্পানিগুলোর স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন
বেন্টনের বড় উদ্বেগ হলো, এআই সিস্টেম মানুষের নির্দেশের বাইরে গিয়ে কী করছে, সে বিষয়ে সাধারণ মানুষ খুব বেশি তথ্য জানতে পারছে না। তার মতে, বর্তমানে এআই কোম্পানিগুলো নিজেদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নিরাপত্তা-সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করে।
তিনি আরও বলেন, বড় এআই কোম্পানিগুলোকে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ঘটনার প্রতিবেদন প্রকাশ করতেই হবে, এমন কোনো ফেডারেল আইন নেই।
ওপেনএআইয়ের গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স প্রধান ক্রিস লেহানেও বর্তমান ব্যবস্থাকে যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন। তার মতে, বড় এআই কোম্পানিগুলো নিজেদের মতো করে ঝুঁকি মোকাবিলার নিয়ম তৈরি করছে। এর পরিবর্তে স্বাধীনভাবে যাচাই ও আরও বেশি স্বচ্ছতা প্রয়োজন।
বাইরে থেকে এআই নিরাপত্তায় কাজ করবেন দুই গবেষক
অ্যানথ্রপিক ও গুগল ডিপমাইন্ড ছাড়ার পর বেন্টন ও এঙ্গেলস এআই নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা অলাভজনক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এমইটিআর-এ যোগ দিচ্ছেন।
প্রতিষ্ঠানটি এআই কখন মানুষের নির্দেশ থেকে সরে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতে এআই কী ধরনের বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, তা নিয়ে গবেষণা করে।
বেন্টন বলেন, এআই কোম্পানির ভেতরে থেকে কাজ করার পরিবর্তে বাইরে থেকে এআইয়ের ঝুঁকি ও নিরাপত্তা নিয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে তিনি বেশি ভূমিকা রাখতে পারবেন বলে মনে করেছেন।
মানুষের চেয়েও বেশি সক্ষম হতে পারে এআই
বেন্টনের সবচেয়ে বড় আশঙ্কা, এআই উন্নয়নের গতি এমন পর্যায়ে যেতে পারে, যেখানে এআই নিজেই এআই তৈরির গবেষণা ও উন্নয়নের বড় অংশ পরিচালনা করতে পারবে। তিনি বলেন, অ্যানথ্রপিকসহ বড় এআই কোম্পানিগুলো ইতোমধ্যে এআই গবেষণা ও উন্নয়নের কাজ আরও বেশি স্বয়ংক্রিয় করার চেষ্টা করছে।
তার আশঙ্কা, আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই এমন এআই তৈরি হতে পারে, যা অনেক ক্ষেত্রে মানুষের চেয়েও বেশি সক্ষম হবে।
এঙ্গেলসও বলেন, বর্তমান এআইয়ের সক্ষমতা সম্পর্কে অনেক মানুষ হয়তো এখনও পুরোপুরি অবগত নন। ভবিষ্যতে এসব সিস্টেম মানুষের মতো অনেক কাজ করার পাশাপাশি কিছু কাজ মানুষের চেয়েও ভালো করতে পারে।
তবে দুই গবেষকই মনে করেন, এআইয়ের সম্ভাব্য সুবিধাও অনেক। বিজ্ঞান, স্বাস্থ্য ও প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এআই বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে। তাদের মতে, এআইয়ের উন্নয়ন থামিয়ে দেওয়ার কথা নয়, তবে সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় রেখেই এগোতে হবে।
এঙ্গেলসের মতে, সমাজকে এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন হতে হবে এবং এসব ঝুঁকি কতটা গ্রহণযোগ্য, সেটিও নির্ধারণ করতে হবে।
বেন্টনের আশঙ্কা, এআই উন্নয়নের গতি অত্যধিক বেড়ে গেলে মানুষ সময়মতো নিজেদের প্রস্তুত করার সুযোগ নাও পেতে পারে। এ কারণে এআই নিরাপত্তা, স্বচ্ছতা ও স্বাধীন নজরদারি নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
