ভারতের চলমান ছাত্র আন্দোলনে নতুন আলোচিত মুখ হয়ে উঠেছেন নেহা বোরা। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির রাজনীতি, বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা এবং বিভিন্ন নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগের প্রতিবাদে সক্রিয় এই তরুণী এখন দেশটির যুব ও ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ। খবর বিবিসির।
নেহা বোরা অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন বা আইসার সভাপতি। সংগঠনটি সিপিআইএমএল (লিবারেশন)-এর ছাত্র সংগঠন হিসেবে ভারতের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সক্রিয়।
চলতি বছরের জুলাইয়ে নেহা প্রথম বড়ভাবে আলোচনায় আসেন। মেডিকেল কলেজে ভর্তির ‘নিট’ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে হওয়া আন্দোলনে তিনি অংশ নেন। অভিজিৎ দীপক ও সোনম ওয়াংচুকের পাশাপাশি তার উপস্থিতিও নজর কাড়ে।
বিভিন্ন আন্দোলনে সক্রিয় নেহা
এরপর ঝাড়খণ্ড পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায় কথিত অনিয়মের প্রতিবাদে ছাত্র আন্দোলনে যোগ দিতে রাঁচিতে যান নেহা। সেখানে আন্দোলনের সময় তার মুখে কালি ছুড়ে মারা হয়।
ঘটনার পরও আন্দোলন থেকে সরে যাননি তিনি। নেহা জানান, কালি ছুড়ে তাকে ভয় দেখানো যাবে না। এর আগে দিল্লির আন্দোলনে তিনি লাঠিচার্জ ও প্যালেট গানের মুখোমুখি হয়েছেন বলেও দাবি করেন।
পরে বিহারে গিয়ে আন্দোলনের সময় গ্রেফতার হওয়া শিক্ষার্থীদের মুক্তির দাবিতেও কর্মসূচিতে অংশ নেন তিনি। এসব কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি পান নেহা।
দিল্লিতেও আন্দোলনে নেহা
বর্তমানে দিল্লিতে সমর্থকদের নিয়ে আবারও আন্দোলনে নেমেছেন নেহা বোরা। এবার তার দাবির কেন্দ্রে রয়েছেন ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার।
বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের চলমান এসআইআর প্রক্রিয়ায় অনিয়ম হয়েছে। এর ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষ ভোটাধিকার হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন বলে তারা দাবি করছে।
নেহা ও তার সমর্থকেরা এ বিষয়ে প্রতিবাদ জানিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবি তুলেছেন।
পড়াশোনা ও রাজনৈতিক পথচলা
নেহা বোরার বাড়ি উত্তরাখণ্ডে। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করার পর তিনি আম্বেদকর ইউনিভার্সিটি, দিল্লি থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করছেন।
দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় ও জেএনইউতে বামপন্থি ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থেকে তিনি সক্রিয় হয়ে ওঠেন। বর্তমানে ভারতের বিভিন্ন গণআন্দোলনেও তাকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে দেখা যাচ্ছে।
বিজেপি সমর্থক পরিবারে বেড়ে ওঠা
নেহা এমন একটি পরিবারে বড় হয়েছেন, যেখানে বিজেপির সমর্থকও রয়েছেন। নিজের রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে পরিবারের সঙ্গে মতপার্থক্যের কথাও তিনি বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, দিল্লিতে আসার পর রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবারের ভেতরে এ নিয়ে মতপার্থক্য আরও স্পষ্ট হয়।
গণআন্দোলন নিয়ে নেহার অবস্থান
নেহার মতে, সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনের গুরুত্ব শুধু কোনো নির্দিষ্ট মন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে সীমাবদ্ধ নয়। তরুণদের একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর পরিবর্তে নিজেদের অধিকার ও দাবির জন্য একসঙ্গে লড়াই করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
তিনি চান, ছাত্র আন্দোলন থেকে তৈরি হওয়া শক্তি নির্বাচন, শ্রমিকের অধিকার, নারী সংরক্ষণ এবং ডিলিমিটেশনের মতো বিভিন্ন ইস্যুতেও ছড়িয়ে পড়ুক।
তার কাছে এসব আন্দোলন গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামো রক্ষার বৃহত্তর লড়াইয়ের অংশ।
অভিজিৎ দীপকের সঙ্গে তুলনা
সামাজিক মাধ্যমে সম্প্রতি নেহা বোরা ও আন্দোলনকর্মী অভিজিৎ দীপককে নিয়ে তুলনা শুরু হয়েছে। কে বেশি দক্ষ বা পরিণত, তা নিয়ে অনলাইনে নানা মন্তব্যও দেখা যায়।
একটি পোস্টে নেহাকে অভিজিৎ দীপকের চেয়ে বেশি প্রতিভাবান বলে মন্তব্য করা হলে অভিজিৎ নিজেই তাতে সম্মতি জানান।
পরে নেহা সেই তুলনা নাকচ করে বলেন, বিষয়টি তুলনার নয়, বরং সংহতির। তারা একসঙ্গে আন্দোলন করছেন বলেও উল্লেখ করেন।
এর জবাবে অভিজিৎ লেখেন, ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ।’
আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে নেহাও অভিজিৎ দীপকের ভূমিকার প্রশংসা করেছেন। তার মতে, দীপক আন্দোলনকারীদের সঙ্গে নিজেকে আলাদা না করে একজন সহযোদ্ধা হিসেবেই তুলে ধরেছেন।
এভাবেই বিভিন্ন ইস্যুতে ধারাবাহিক আন্দোলন, স্পষ্ট বক্তব্য এবং সক্রিয় ভূমিকার কারণে নেহা বোরা এখন ভারতের ছাত্র ও যুব আন্দোলনের অন্যতম আলোচিত মুখ হয়ে উঠেছেন।









