বৃদ্ধ ও হৃদরোগে আক্রান্ত মাকে নিজের সঙ্গে রেখে ভরণপোষণ করতে রাজি নন পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার নাগডেমরা ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম পুলিশ সাগর হোসেন। মাকে নিজের সঙ্গে রাখতে বাধ্য করা হলে আত্মহত্যা করবেন বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
অন্যদিকে, জীবনের শেষ সময়ে ছেলের সঙ্গে থেকে সামান্য খাবার খেয়েও বাকি জীবন কাটানোর আকুতি জানিয়েছেন তাঁর মা মুন্নি খাতুন (৫৫)। ছেলের কাছ থেকে আশ্রয় ও ভরণপোষণ পাওয়ার আশায় তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিম আহমেদের কার্যালয়ে অভিযোগের শুনানি হয়। সেখানে সাগর মাকে নিজের সঙ্গে রাখতে পারবেন না বলে জানান। তবে মায়ের ভরণপোষণের জন্য মাসে কত টাকা দিতে হবে, তা ইউএনওর কাছে জানতে চান।
ছেলের সঙ্গে থাকতে চান অসুস্থ মা
মুন্নি খাতুনের স্বামী সিরাজুল ইসলাম অনেক আগেই মারা গেছেন। তাঁদের দুই সন্তানের মধ্যে একজন ছেলে সাগর হোসেন এবং একজন মেয়ে। মেয়ের বিয়ে হয়ে যাওয়ায় বৃদ্ধ বয়সে ছেলেকেই নিজের প্রধান অবলম্বন হিসেবে দেখছেন মুন্নি।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সাগরের বিয়ের পর থেকেই মা-ছেলের মধ্যে পারিবারিক বিরোধ দেখা দেয়। একপর্যায়ে ছেলে মাকে নিয়মিত ভরণপোষণ দেওয়া বন্ধ করে দেন এবং নিজের সঙ্গে রাখতেও অনীহা প্রকাশ করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
মুন্নি খাতুনের অভিযোগ, ছেলের কাছ থেকে আশ্রয় ও ভরণপোষণ পাওয়ার জন্য তিনি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছে একাধিকবার গিয়েছেন। স্থানীয়ভাবে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেও স্থায়ী সমাধান না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত ইউএনওর কাছে লিখিত অভিযোগ করেন তিনি।
শুনানিতে মাকে রাখতে আপত্তি ছেলের
বৃহস্পতিবার বিকেলে ইউএনওর কার্যালয়ে মা ও ছেলের বক্তব্য শোনা হয়। এ সময় সেলিম আহমেদ সাগরকে তাঁর বৃদ্ধ ও অসুস্থ মাকে নিজের সঙ্গে রেখে দেখাশোনা করার বিষয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেন।
তবে সাগর নিজের অবস্থানে অনড় থাকেন। তিনি বলেন, মাকে তাঁর সঙ্গে থাকতে দেওয়া হলে আত্মহত্যা করবেন। একই সঙ্গে মাকে নিজের সঙ্গে রাখতে পারবেন না বলেও জানান তিনি।
এ সময় মায়ের ভরণপোষণের জন্য মাসে কত টাকা দিতে হবে, তা নির্ধারণ করে দেওয়ার অনুরোধ করেন সাগর।
‘নুন-পান্তা খেয়েও ছেলের সঙ্গে থাকতে চাই’
ছেলের সঙ্গে থাকার আকুতি জানিয়ে মুন্নি খাতুন বলেন, তাঁর স্বামী অনেক আগেই মারা গেছেন এবং মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত। এই অবস্থায় ছেলেকে ছাড়া তাঁর আর কে আছেন, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
মুন্নি খাতুনের ভাষায়, ‘আমি ছেলের কাছে টাকা-পয়সা চাই না। নুন-পান্তা খেয়েও যদি ছেলের সঙ্গে থাকতে পারি, তাহলে বাকি জীবনটা পার করে দিতে পারব।’
তিনি আরও বলেন, মায়ের অধিকার নিয়ে ছেলের ঘরে থাকতে চান। জীবনের শেষ সময়ে সন্তানের কাছে একটু আশ্রয় পাওয়াই তাঁর একমাত্র চাওয়া।
স্থানীয়ভাবে সমাধানের চেষ্টা ব্যর্থ
নাগডেমরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাফিজুল ইসলাম বলেন, মা-ছেলের বিরোধ মেটাতে তিনি শুরু থেকেই চেষ্টা করেছেন। তবে সাগর কোনো সমাধানে রাজি না হওয়ায় স্থানীয়ভাবে সমস্যাটির নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়নি।
পরে মুন্নি খাতুন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ করেন বলে জানান তিনি।
কয়েক দিনের সময় দিলেন ইউএনও
ইউএনও সেলিম আহমেদ বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর উভয় পক্ষকে ডেকে শুনানি করা হয়েছে। একজন বৃদ্ধ ও অসুস্থ মা সন্তানের কাছে আশ্রয় ও ভরণপোষণ প্রত্যাশা করছেন—বিষয়টি মানবিকভাবে বিবেচনা করতে ছেলেকে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
তিনি জানান, মা-ছেলের বিরোধের সমাধানের জন্য সাগর হোসেনকে কয়েক দিনের সময় দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কীভাবে বিষয়টির সমাধান করা যায়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পরিবারের বিরোধ যেন আরও জটিল না হয় এবং বৃদ্ধা মাকে যেন কষ্টের মধ্যে থাকতে না হয়, সে বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই সমাধানের চেষ্টা চলছে বলে জানান ইউএনও।









