প্লাস্টিক দূষণ এখন আর শুধু নদী, সমুদ্র কিংবা মাটির সমস্যা নয়। প্রতিদিনের খাবার, পানীয় ও বাতাসের সঙ্গে অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা অজান্তেই মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। বিজ্ঞানীরা মানবদেহের বিভিন্ন টিস্যু ও জৈবিক নমুনায় এসব কণার উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন। তবে দীর্ঘমেয়াদে এগুলো মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর ঠিক কী ধরনের প্রভাব ফেলে, তা নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে।
শরীরে এসব কণা কত দিন অবস্থান করে, কোন অঙ্গের ওপর কী প্রভাব ফেলে এবং দীর্ঘ মেয়াদে রোগের ঝুঁকি বাড়ায় কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি।
কীভাবে শরীরে প্রবেশ করে মাইক্রোপ্লাস্টিক?
পাঁচ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিকের কণাকে মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়। প্লাস্টিকের বড় বস্তু ভেঙে ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হওয়ার পাশাপাশি গাড়ির টায়ারের ক্ষয়, কৃত্রিম কাপড়ের তন্তু এবং বিভিন্ন দৈনন্দিন পণ্যের ব্যবহার থেকেও এসব কণা তৈরি হতে পারে।
দূষিত পানি, খাবার ও বাতাসের মাধ্যমে মাইক্রোপ্লাস্টিক মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। গবেষণায় রক্ত, ফুসফুস, গর্ভফুল এবং পুরুষের প্রজননস্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট নমুনায় এসব কণার উপস্থিতির তথ্য পাওয়া গেছে।
তবে কোনো নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হওয়া আর ওই কণার কারণে সরাসরি রোগ সৃষ্টি হওয়া এক বিষয় নয়। এ দুইয়ের মধ্যে সম্পর্ক নির্ধারণে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
শরীরে ঢুকে কী ক্ষতি করতে পারে?
মাইক্রোপ্লাস্টিকের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন দিক থেকে গবেষণা করছেন। এর মধ্যে রয়েছে প্রদাহ, শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা, অন্ত্রের অসুস্থতা এবং রক্তনালির জটিলতার সঙ্গে সম্ভাব্য সম্পর্ক। স্নায়ুতন্ত্র ও প্রজননস্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব নিয়েও অনুসন্ধান চলছে।
তবে এসব ক্ষেত্রে মাইক্রোপ্লাস্টিক সরাসরি রোগের কারণ কি না, তা নিশ্চিত করতে আরও শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক প্রমাণ প্রয়োজন।
সব ধরনের প্লাস্টিক কণার প্রভাবও এক রকম নয়। কণার আকার, গঠন, রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য এবং শরীরে প্রবেশের পথের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নির্ভর করতে পারে।
এ ছাড়া প্লাস্টিক তৈরিতে ব্যবহৃত কিছু রাসায়নিক উপাদানের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকিও গবেষকদের বিবেচনায় রয়েছে। কণার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য এবং সংশ্লিষ্ট রাসায়নিকের প্রভাব আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা জরুরি।
প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার কি যথেষ্ট?
প্লাস্টিক দূষণ কমানোর একটি পরিচিত উপায় পুনর্ব্যবহার। তবে শুধু ব্যবহৃত প্লাস্টিক সংগ্রহ করে নতুন পণ্য তৈরি করলেই সমস্যার পুরোপুরি সমাধান হয় না।
হার্ভার্ড টি এইচ চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথের প্রতিবেদনে উদ্ধৃত তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে উৎপাদিত প্লাস্টিকের আনুমানিক ৯ শতাংশ পুনর্ব্যবহার করা হয়। বাকি প্লাস্টিকের বড় অংশ বর্জ্য হিসেবে জমা হয়, পুড়িয়ে ফেলা হয় কিংবা প্রাকৃতিক পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে।
এ কারণে অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, পণ্যের নকশায় পরিবর্তন আনা এবং বর্জ্য সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনা উন্নত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
দৈনন্দিন জীবনের যেসব উৎস থেকে ছড়ায় দূষণ
প্লাস্টিক দূষণ বলতে সাধারণত বোতল, পলিথিনের ব্যাগ ও খাবারের প্যাকেটের কথা মনে আসে। কিন্তু এর কিছু উৎস সহজে চোখে পড়ে না।
গাড়ির টায়ার রাস্তার সঙ্গে ঘর্ষণের ফলে ক্ষয় হয়ে ক্ষুদ্র কণা ছড়াতে পারে। আবার পলিয়েস্টারের মতো কৃত্রিম তন্তু দিয়ে তৈরি পোশাক ধোয়ার সময় সূক্ষ্ম তন্তু পানিতে মিশতে পারে। বর্জ্যপানির মাধ্যমে এসব কণা পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ থাকে।
দূষণ কমাতে কাপড় ধোয়ার সময় মাইক্রোফাইবার সংগ্রহের উপযোগী ফিল্টার ব্যবহার করা যেতে পারে। অপ্রয়োজনীয় গাড়ির যাত্রা কমানো, গণপরিবহন ব্যবহার এবং সম্ভব হলে হেঁটে চলার অভ্যাসও টায়ারের ক্ষয়জনিত দূষণ কমাতে সহায়ক হতে পারে।
ব্যক্তিগতভাবে কী করা যায়?
মাইক্রোপ্লাস্টিকের সংস্পর্শ পুরোপুরি এড়িয়ে চলা কঠিন। তবে কিছু অভ্যাস পরিবেশে প্লাস্টিক বর্জ্য ছড়িয়ে পড়া কমাতে সাহায্য করতে পারে।
- অপ্রয়োজনীয় একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের পণ্য এড়িয়ে চলুন।
- পুনর্ব্যবহারযোগ্য ব্যাগ ও পানির বোতল ব্যবহার করুন।
- পোশাক ধোয়ার সময় মাইক্রোফাইবার ফিল্টার ব্যবহারের সুযোগ থাকলে তা বিবেচনা করুন।
- প্লাস্টিক বর্জ্য যত্রতত্র না ফেলে যথাযথভাবে সংগ্রহ ও নিষ্পত্তি করুন।
- ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে যাচাই করা বৈজ্ঞানিক তথ্যের ওপর নির্ভর করুন।
মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ থাকলেও এর সব স্বাস্থ্যপ্রভাব এখনো নিশ্চিত নয়। তাই আতঙ্কিত হওয়ার বদলে দূষণের উৎস কমানো, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং এ বিষয়ে আরও গবেষণার ওপর গুরুত্ব দেওয়াই প্রয়োজন।







