ডিসেম্বরে দেশে ফেরার বিষয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে বিদেশে অবস্থান করছেন তিনি। তাঁর সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে এখন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সহিংসতার বিচার, আইনি জবাবদিহি এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন সামনে এসেছে।
কৃষিবিদ মো. মনোয়ারুল ইসলাম এনামের লেখা মতামতধর্মী নিবন্ধে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়টি কেবল একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যাবর্তনের প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে অতীতের শাসনামল, মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং বিচারপ্রক্রিয়ার বিষয়গুলোও জড়িয়ে রয়েছে।
জুলাই-আগস্টের সহিংসতা ও জবাবদিহির দাবি
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে প্রাণহানির ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গভীর প্রভাব ফেলেছে। নিবন্ধে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তরের অনুসন্ধানের বরাতে বলা হয়েছে, ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হন।
নিবন্ধে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, সরকারি যাচাইয়ে ৮৪৩ জনকে শহীদ এবং ১৪ হাজার ৩৭০ জনকে আহত হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। নিহতদের মধ্যে শিশু ছিল এবং আহতদের অনেকে স্থায়ী শারীরিক ক্ষতির শিকার হয়েছেন বলেও এতে বলা হয়।
এসব ঘটনার পর শেখ হাসিনাসহ তৎকালীন সরকারের বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জবাবদিহির দাবি ওঠে। লেখকের মতে, নিহতদের পরিবার ও আহত ব্যক্তিদের কাছে সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের বিষয়টি ন্যায়বিচারের প্রশ্নের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
জুলাইয়ের মামলা ও শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অভিযোগ
নিবন্ধে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) একটি গবেষণার তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ১৯ নভেম্বর পর্যন্ত জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার হত্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে সারা দেশে ১ হাজার ৭৮৫টি মামলা করা হয়েছিল। এর মধ্যে ৮৩৭টি ছিল হত্যা মামলা। শেখ হাসিনার নাম ৬৬৩টি মামলায় আসামি হিসেবে রয়েছে বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে; এর মধ্যে ৪৫৩টি হত্যা মামলা।
লেখকের বক্তব্য, এসব মামলা ও অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দেশে ফিরলে শেখ হাসিনার সামনে বিচারিক প্রক্রিয়া এবং জবাবদিহির প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে মামলায় নাম থাকা এবং আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। প্রতিটি অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি সংশ্লিষ্ট আদালতের প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।
মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে সমালোচনা
শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও গণমাধ্যমে সমালোচনা প্রকাশিত হয়েছে বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে।
এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশনের হিসাব উদ্ধৃত করে লেখক জানান, ২০০৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে ৬২৩ জন গুমের শিকার হয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে কতজন ফিরে এসেছেন, কতজনের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে এবং কতজন নিখোঁজ রয়েছেন, সে সম্পর্কেও নিবন্ধে পরিসংখ্যান দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া কথিত ‘ক্রসফায়ার’ ও ‘বন্দুকযুদ্ধ’, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং বিরোধী মত দমনের অভিযোগও লেখাটিতে উঠে এসেছে। এসব বিষয়ে রাষ্ট্রীয় দায় নির্ধারণের জন্য পৃথক তদন্ত, প্রমাণ এবং আইনগত প্রক্রিয়ার গুরুত্ব রয়েছে।
দুর্নীতি, অর্থপাচার ও ব্যাংকিং খাত নিয়ে প্রশ্ন
শেখ হাসিনার শাসনামল নিয়ে আলোচনায় দুর্নীতি, অর্থপাচার, খেলাপি ঋণ এবং বড় অবকাঠামো প্রকল্পের ব্যয়ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে তুলে ধরেছেন লেখক।
নিবন্ধে ২০২৪ সালের শেষ দিকে প্রকাশিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অর্থনৈতিক শ্বেতপত্রের বরাতে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অবৈধভাবে বিদেশে পাচারের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং কয়েকটি বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও আলোচনায় এসেছে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, পদ্মা সেতু ও বিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন প্রকল্পের ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে নিবন্ধে। তবে এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রকৃত আর্থিক ক্ষতি, দায়ী ব্যক্তি এবং সংশ্লিষ্ট ঘটনার সত্যতা নির্ধারণে নির্ভরযোগ্য তদন্ত ও আইনগত সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নির্বাচন ও রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে বিতর্ক
নিবন্ধে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনকে ঘিরে বিরোধী দলগুলোর অভিযোগের কথাও তুলে ধরা হয়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে ছিল গ্রেফতার, ভয়ভীতি প্রদর্শন, বিরোধী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাধা এবং অসম নির্বাচনী পরিবেশ তৈরির বিষয়।
লেখকের মতে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অবাধ নির্বাচন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক সংগঠন করার অধিকার এবং শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা পরিবর্তনের সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ। এসব বিষয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ও ভবিষ্যৎ গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নকে জটিল করেছে।
আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ড ও ট্রাইব্যুনালের রায়
নিবন্ধে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের মে মাসে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা হয় এবং পরে নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধন স্থগিত করে। একই সময়ে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই গণঅভ্যুত্থান-সংক্রান্ত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা চলছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
লেখকের বর্ণনা অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেন। তিনি তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং বিচারপ্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিহিত করেছেন বলেও নিবন্ধে উল্লেখ রয়েছে।
নিবন্ধে আরও বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে প্রধান প্রসিকিউটর জানান, নির্ধারিত ৩০ দিনের মধ্যে আপিল না করায় শেখ হাসিনার আপিলের বিধিবদ্ধ সুযোগ শেষ হয়েছে। দেশে ফিরলে তাঁকে বিদ্যমান আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে বলেও সরকারের বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়েছে।
এসব আইনি তথ্যের বর্তমান অবস্থা, আপিলের সুযোগ এবং সংশ্লিষ্ট আদেশের কার্যকারিতা সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হালনাগাদ আদালত-নথি ও সরকারি বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।
শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন ও আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ
লেখকের মতে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরা এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিকভাবে ফিরে আসা দুটি পৃথক বিষয়। একজন ব্যক্তির আইনি অবস্থান নির্ধারিত হবে তাঁর বিরুদ্ধে থাকা মামলা, আদালতের রায় ও প্রযোজ্য আইনের ভিত্তিতে। অন্যদিকে দলটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নির্ভর করবে নিষেধাজ্ঞা, নিবন্ধনের অবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট আইনগত ও সাংগঠনিক পরিস্থিতির ওপর।
আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামল নিয়ে নির্বাচন, মানবাধিকার, অর্থনীতি, দুর্নীতি ও জবাবদিহির যেসব প্রশ্ন উঠেছে, সেগুলোর রাজনৈতিক মূল্যায়নও ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ থাকবে বলে মনে করেন লেখক।
সব মিলিয়ে, ডিসেম্বরে শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন কি না এবং ফিরলে তাঁর আইনি অবস্থান কী হবে—তা নিয়ে আলোচনা চলছেই। লেখকের বিশ্লেষণে, সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হবে ক্ষমতার রাজনীতির চেয়ে বিচার, জবাবদিহি এবং অতীতের ঘটনাগুলোর আইনি নিষ্পত্তি।
লেখক: কৃষিবিদ মো. মনোয়ারুল ইসলাম এনাম। নিবন্ধে তাঁকে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ও সংস্থাপন-২ বিভাগের উপ-রেজিস্ট্রার হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়েছে।





