GULF BANGLA বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন +880 1755727432
Home / আন্তর্জাতিক / ভুজ ভূমিকম্প কীভাবে বদলে দিয়েছিল নরেন্দ্র মোদির রাজনৈতিক জীবন?

ভুজ ভূমিকম্প কীভাবে বদলে দিয়েছিল নরেন্দ্র মোদির রাজনৈতিক জীবন?

২০০১ সালের ভয়াবহ ভুজ ভূমিকম্প শুধু গুজরাটের বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেনি, রাজ্যটির রাজনীতিতেও বড় পরিবর্তনের পথ তৈরি করেছিল। সেই সময় বিজেপির জাতীয় পর্যায়ের সংগঠক ছিলেন নরেন্দ্র মোদি। ভূমিকম্পের কয়েক মাস পর তিনি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হন। এরপর দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্গঠন হয়ে ওঠে তাঁর প্রশাসনিক জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষা।

২০২৬ সালের ৭ অক্টোবর সরকারপ্রধান হিসেবে টানা ২৫ বছর পূর্ণ করেন মোদি। এ উপলক্ষে তিনি ভুজ ভূমিকম্পের অভিজ্ঞতা স্মরণ করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই বিপর্যয় তাঁকে পুনর্গঠনের কাজে অবিচল থাকার শিক্ষা দিয়েছে।

গুজরাটের রাজনীতিতে তখন অস্থিরতা

২০০১ সালের ২৬ জানুয়ারি গুজরাটের কচ্ছ অঞ্চলে ভয়াবহ ভূমিকম্প আঘাত হানে। ভুজসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে। ঘরবাড়ি ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধসে পড়ে। শুরু হয় উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনর্বাসনের কঠিন কাজ।

সে সময় গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন কেশুভাই প্যাটেল। তবে ভূমিকম্পের আগেই তাঁর সরকারের রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়েছিল। প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ে সমালোচনা এবং নির্বাচনী ব্যর্থতা বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছিল।

২০০১ সালের আগস্টে সাবরমতী বিধানসভা আসনের উপনির্বাচনেও বিজেপি পরাজিত হয়। ভূমিকম্প-পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলা নিয়ে প্রশ্নের সঙ্গে এই রাজনৈতিক ধাক্কা যুক্ত হয়ে কেশুভাইয়ের নেতৃত্বের ওপর চাপ আরও বাড়ায়।

শেষ পর্যন্ত বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব গুজরাটে নেতৃত্ব পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়। দলীয় সংগঠনে অভিজ্ঞ নরেন্দ্র মোদিকে নতুন মুখ হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। ২০০১ সালের ৭ অক্টোবর তিনি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।

সংগঠক থেকে সরকারপ্রধান

মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার আগে মোদি দীর্ঘদিন বিজেপির সাংগঠনিক কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) সঙ্গে কাজ করার পর ১৯৮৭ সালে তিনি বিজেপিতে যোগ দেন। পরে গুজরাটে দলের সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৯৫ সালের বিধানসভা নির্বাচনে গুজরাটে বিজেপির সাফল্যের পেছনে তাঁর সাংগঠনিক ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলে মনে করা হয়। একই বছর তাঁকে জাতীয় রাজনীতিতে নিয়ে আসা হয়। দলের জাতীয় সম্পাদক হিসেবে তিনি হরিয়ানা ও হিমাচল প্রদেশে সাংগঠনিক কাজের দায়িত্ব পান।

১৯৯৮ সালে বিজেপির জাতীয় সাধারণ সম্পাদক (সংগঠন) হন মোদি। এর মাধ্যমে দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়ে তাঁর অবস্থান আরও শক্ত হয়।

তবে গুজরাটে তাঁর প্রভাব বাড়ার সঙ্গে দলের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার সঙ্গে বিরোধও তৈরি হয়েছিল। শঙ্করসিংহ ওয়াঘেলা তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। এসব রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই মোদি রাজ্যের বাইরে জাতীয় পর্যায়ের দায়িত্ব পালন করছিলেন।

ভূমিকম্পের পর ভুজে গিয়েছিলেন মোদি

ভুজ ভূমিকম্পের পর মোদি নিজের রাজ্যে ফিরে আসেন। পরে বিভিন্ন বক্তব্যে তিনি জানান, ভূমিকম্পের দ্বিতীয় দিনেই কচ্ছ অঞ্চলে পৌঁছেছিলেন তিনি। তখন তিনি মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন না, ছিলেন বিজেপির একজন দলীয় সংগঠক।

২০২২ সালে ভুজে ভূমিকম্প স্মৃতিসৌধ ‘স্মৃতিবন’ উদ্বোধনের সময় সেই অভিজ্ঞতা স্মরণ করেন মোদি। তিনি বলেন, বিপর্যয়ের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনে তাঁকে সাহায্য করেছে।

তবে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে শুধু একজন ব্যক্তির ভূমিকা ছিল না। রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকার, সশস্ত্র বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সম্মিলিতভাবে কাজ করেছিল।

ভূমিকম্পের পর ২০০১ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি গুজরাট রাজ্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠিত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে পুনর্বাসন, বাড়িঘর পুনর্নির্মাণ, জীবিকা পুনরুদ্ধার এবং অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়।

পুনর্গঠন ছিল মোদির প্রথম বড় প্রশাসনিক পরীক্ষা

মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর মোদির সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জগুলোর একটি ছিল ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল পুনর্গঠন। উদ্ধার ও ত্রাণের প্রাথমিক পর্যায় পেরিয়ে তখন প্রয়োজন ছিল দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার।

কচ্ছের পুনর্গঠন নিয়ে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টের গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, দায়িত্ব নেওয়ার পর মোদি পুনর্গঠন কর্মসূচি পর্যালোচনা করেন। কাজ এগিয়ে নিতে আরও উদ্যোগ প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেছিলেন।

পুনর্বাসন পরিকল্পনায় শুধু জরুরি সহায়তা নয়, ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর ও সরকারি ভবন পুনর্নির্মাণ, স্থানীয় অর্থনীতি সচল করা এবং মানুষের জীবিকা ফিরিয়ে আনার বিষয়ও গুরুত্ব পায়। ভবিষ্যতে দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানোও ছিল এসব উদ্যোগের অংশ।

তবে ভূমিকম্পের পর পুনর্গঠন শুরু হয়েছিল মোদি মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার আগেই। তাই পুরো কর্মসূচির কৃতিত্ব এককভাবে তাঁর নামে দেওয়া যথাযথ হবে না।

মোদির উত্থানের পেছনে ছিল একাধিক কারণ

ভুজ ভূমিকম্প মোদির রাজনৈতিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করেছিল। কিন্তু এই ঘটনাই তাঁকে মুখ্যমন্ত্রী বানিয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।

মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার আগেই তিনি বিজেপির প্রভাবশালী সংগঠক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন। দলের সাংগঠনিক কাজ ও নির্বাচনী প্রচারে তাঁর অভিজ্ঞতা ছিল। পাশাপাশি কেশুভাই প্যাটেলের সরকারের রাজনৈতিক সংকট এবং ২০০২ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপির অবস্থান শক্ত করার প্রয়োজনও নেতৃত্ব পরিবর্তনের পেছনে ভূমিকা রেখেছিল।

অর্থাৎ, ভূমিকম্প ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট। এর সঙ্গে দলীয় রাজনীতি, প্রশাসনিক সমালোচনা এবং নির্বাচনী হিসাবও যুক্ত ছিল।

২৫ বছর পরও কেন গুরুত্বপূর্ণ ভুজের স্মৃতি?

২০০১ সালের ৭ অক্টোবর গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর মোদির রাজনৈতিক যাত্রা নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করে। ২০১৪ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর সেই যাত্রা জাতীয় পর্যায়ে বিস্তৃত হয়।

ভুজ ভূমিকম্প তাঁর জন্য ছিল দলীয় সংগঠক থেকে সরাসরি প্রশাসনিক দায়িত্বে আসার সময়কার অন্যতম বড় অভিজ্ঞতা। সেখানে তাঁকে ত্রাণ, পুনর্বাসন, অবকাঠামো পুনর্গঠন এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবন স্বাভাবিক করার মতো জটিল বিষয় মোকাবিলা করতে হয়েছিল।

২০২৬ সালের অক্টোবরে সরকারপ্রধান হিসেবে ২৫ বছর পূর্ণ করার সময় সেই অভিজ্ঞতা আবার আলোচনায় আসে। মোদির রাজনৈতিক উত্থান বুঝতে ভুজ ভূমিকম্পের গুরুত্ব রয়েছে। তবে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রাকে ব্যাখ্যা করতে হলে সেই সময়ের দলীয় পরিস্থিতি ও গুজরাটের প্রশাসনিক সংকটকেও বিবেচনায় নিতে হবে।

Social Icons