নিজে ধূমপান না করলেও অন্যের সিগারেটের ধোঁয়া শ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করার কারণে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারেন যে কেউ। পরোক্ষ ধূমপান বা সেকেন্ড-হ্যান্ড স্মোক ফুসফুসের ক্যানসার, হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশেষ করে শিশু, গর্ভবতী নারী এবং আগে থেকেই হৃদযন্ত্র বা ফুসফুসের সমস্যায় ভুগছেন—এমন ব্যক্তিদের জন্য এই ধোঁয়া আরও ক্ষতিকর হতে পারে।
বাড়ির বারান্দা, গাড়ি, চায়ের দোকান কিংবা খোলা জায়গায় অন্য কেউ ধূমপান করলে সেই ধোঁয়া আশপাশের মানুষের শরীরেও প্রবেশ করতে পারে। তাই ধূমপান না করলেই তামাকের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকা যায় না।
পরোক্ষ ধূমপান কী এবং কেন ক্ষতিকর?
জ্বলন্ত সিগারেট থেকে নির্গত ধোঁয়া এবং ধূমপায়ীর নিঃশ্বাসের সঙ্গে বেরিয়ে আসা ধোঁয়া মিলিয়ে পরোক্ষ ধূমপানের সংস্পর্শ তৈরি হয়। এই ধোঁয়ায় হাজারো রাসায়নিক পদার্থ রয়েছে, যার মধ্যে অনেকগুলো বিষাক্ত এবং ক্যানসার সৃষ্টিকারী হিসেবে পরিচিত।
ভারতের পুনের এমওসি ক্যানসার কেয়ারের ক্যানসার বিশেষজ্ঞ ডা. অশ্বিন রাজভোজের মতে, অনেকে নিজে ধূমপান করেন না বলে পরোক্ষ ধূমপানের ঝুঁকিকে গুরুত্ব দেন না। অথচ বাতাসে ছড়িয়ে থাকা সিগারেটের ধোঁয়াও ফুসফুস ও রক্তনালীর ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে।
স্যার এইচ এন রিলায়েন্স ফাউন্ডেশন হাসপাতালের মেডিকেল অ্যান্ড প্রিসিশন অনকোলজির পরিচালক ডা. সেবন্তী লিমায়ও সতর্ক করেছেন, পরোক্ষ ধূমপান কেবল দুর্গন্ধের বিষয় নয়। এর সংস্পর্শে এলে ক্যানসার, হৃদ্রোগ এবং শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন সমস্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
ফুসফুস ও হৃদযন্ত্রের ওপর কী প্রভাব পড়ে?
পরোক্ষ ধূমপানের ধোঁয়া নিয়মিত বা দীর্ঘ সময় ধরে গ্রহণ করলে ফুসফুসের ক্যানসারসহ বিভিন্ন গুরুতর রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। এ ছাড়া ধোঁয়ার সংস্পর্শে অল্প সময়ের জন্য এলেও রক্তনালীর কার্যক্রমে প্রভাব পড়তে পারে এবং শরীরে প্রদাহজনিত পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শের কারণে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। ধূমপান না করলেও অন্যের ধোঁয়া নিয়মিত গ্রহণ করলে এসব ঝুঁকি এড়িয়ে চলা কঠিন হয়ে পড়ে।
পরোক্ষ ধূমপানের কোনো নিরাপদ মাত্রা প্রতিষ্ঠিত নেই। তাই ধোঁয়ার সংস্পর্শ যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিবেশীর সিগারেটের ধোঁয়াও কি ক্ষতিকর?
কেউ বাড়ির বারান্দায়, গাড়িতে বা খোলা জানালার পাশে ধূমপান করলে ধোঁয়া অন্য মানুষের কাছেও পৌঁছাতে পারে। বিশেষ করে ঘন ঘন বা দীর্ঘ সময় ধরে এই ধোঁয়ার সংস্পর্শে এলে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে।
ডা. রাজভোজের মতে, অন্যের ধূমপানের ধোঁয়া থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে সংস্পর্শ এড়িয়ে চলাই সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলোর একটি।
শুধু জানালা খুলে রাখা বা নির্দিষ্ট একটি কোণায় ধূমপান করলেই ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয় না। তাই বাড়ি ও গাড়িকে সম্পূর্ণ ধূমপানমুক্ত রাখা এবং আশপাশে কেউ ধূমপান করলে সম্ভব হলে ধোঁয়া থেকে দূরে সরে যাওয়া জরুরি।
যাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বেশি
শিশু, গর্ভবতী নারী এবং আগে থেকেই হৃদরোগ বা ফুসফুসের সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের পরোক্ষ ধূমপানের বিষয়ে বিশেষ সতর্ক থাকা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন ডা. লিমায়।
শিশুদের ক্ষেত্রে তামাকের ধোঁয়ার সংস্পর্শে হাঁপানির উপসর্গ বেড়ে যেতে পারে, শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে এবং ফুসফুসের স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
গর্ভাবস্থায় তামাকের ধোঁয়ার সংস্পর্শও মা ও শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের কারণ। তাই বাড়ি, কর্মস্থল ও যাতায়াতের জায়গায় ধূমপানমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
পরোক্ষ ধূমপান থেকে বাঁচতে করণীয়
পরোক্ষ ধূমপানের ঝুঁকি কমাতে কয়েকটি বিষয় অনুসরণ করা যেতে পারে—
- নিজের বাড়ি ও গাড়িতে ধূমপান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ রাখুন।
- অন্য কেউ ধূমপান করলে সম্ভব হলে ধোঁয়ার জায়গা থেকে সরে যান।
- শিশু ও গর্ভবতী নারীদের তামাকের ধোঁয়া থেকে দূরে রাখুন।
- ঘরের ভেতরে বা জানালার পাশে ধূমপান করে ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয়েছে—এমন ধারণা করবেন না।
- কর্মস্থল ও জনসমাগমস্থলে ধূমপানমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে সচেতন হোন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরোক্ষ ধূমপানকে অন্যের ব্যক্তিগত অভ্যাস হিসেবে উপেক্ষা করা ঠিক নয়। কারণ এর প্রভাব পড়ে এমন মানুষের ওপরও, যারা নিজেরা ধূমপান করেন না। ক্যানসার ও অন্যান্য গুরুতর রোগের ঝুঁকি কমাতে তামাকের ধোঁয়া থেকে দূরে থাকা এবং ধূমপানমুক্ত পরিবেশ তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: যুগান্তর প্রতিবেদন।









