ইউরোপের বিভিন্ন দেশে শিক্ষা খাতে বিনিয়োগের ঘাটতি, আবাসন ব্যয় বৃদ্ধি, অনিশ্চিত কর্মসংস্থান ও জীবনযাত্রার বাড়তি খরচের প্রতিবাদে আন্দোলনে নেমেছেন তরুণেরা। দেশভেদে বিক্ষোভের তাৎক্ষণিক কারণ আলাদা হলেও এসব কর্মসূচি ক্রমেই জেনারেশন জেড বা জেন-জির বৃহত্তর অসন্তোষের প্রকাশ হয়ে উঠছে।
স্পেন, ফ্রান্স, ইতালি, পর্তুগাল, গ্রিস, আলবেনিয়া ও সার্বিয়ায় বিভিন্ন দাবিতে বিক্ষোভ চলছে। কোথাও শিক্ষাব্যবস্থায় বিনিয়োগ বাড়ানোর দাবি, কোথাও সাশ্রয়ী আবাসনের অধিকার, আবার কোথাও দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও সরকার পরিবর্তনের দাবি সামনে এসেছে।
তরুণদের বড় উদ্বেগ হলো, আগের প্রজন্মের মতো শিক্ষা, চাকরি ও স্থিতিশীল জীবন গড়ার সুযোগ তাঁরা পাবেন কি না। তাঁদের আশঙ্কা, ক্রমবর্ধমান ব্যয় ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ তাঁদের সামনে নতুন বাধা তৈরি করছে।
## কেন বিক্ষোভে নামছেন ইউরোপের তরুণেরা?
ইউরোপের বিভিন্ন দেশের আন্দোলন বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি অভিন্ন কারণ দেখা যায়। এর মধ্যে রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত অর্থের অভাব, বাসাভাড়া বৃদ্ধি, নিরাপদ চাকরির সংকট এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত বিস্তার। বিশেষ করে কর্মজীবনের শুরুতে থাকা তরুণদের জন্য প্রবেশপর্যায়ের চাকরির সুযোগ কতটা স্থিতিশীল থাকবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
ইউরোপের রাজনীতি পরবর্তী প্রজন্মের জন্য প্রত্যাশিত সুযোগ তৈরি করতে পারছে না—এমন হতাশাকে চলমান আন্দোলনের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন ডেইলি নিউজলেটারের ইউরোপীয় প্রতিনিধি ও সহপ্রতিষ্ঠাতা-প্রধান সম্পাদক জুলিয়াস ফিন্টেলম্যান।
তাঁর মতে, উদার গণতন্ত্রের অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল, পরবর্তী প্রজন্ম আগের প্রজন্মের চেয়ে ভালো জীবন পাবে। কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে না বলে অনেক তরুণ মনে করছেন।
## এক দেশের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ছে অন্য দেশে
ইউরোপের বিভিন্ন দেশের তরুণদের আন্দোলনের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ছে। ইতালি ও গ্রিসের বিক্ষোভকারীরা তাঁদের স্লোগানে ফ্রান্সের আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে ধরেছেন। অন্যদিকে, স্পেনে আবাসন সংকটকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া প্রতিবাদের প্রভাব পর্তুগালেও ছড়িয়ে পড়েছে।
ফ্রান্সের প্রধান ছাত্র সংগঠন ইউএনইএফের ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যালিস ডি ব্রিটিটো সিএনএনকে জানিয়েছেন, ইউরোপের বিভিন্ন দেশের ছাত্র সংগঠন নিজেদের অভিজ্ঞতা ও আন্দোলনের কৌশল বিনিময় করছে।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দেশগুলোর মধ্যে পার্থক্য থাকলেও শিক্ষায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং আবাসন সংকট মোকাবিলার দাবিতে উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে।
ইতালির ছাত্র সংগঠনের নেতা সাবরিনা ব্রিজোলাও শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান, সরকারি স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
## ফ্রান্সে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে অসন্তোষ
ফ্রান্সে নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর সময় সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ নতুন ঘটনা নয়। তবে এবার আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়েছে।
ইউএনইএফের ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যালিস ডি ব্রিটিটোর মতে, শিক্ষার্থীরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরে পর্যাপ্ত শিক্ষক ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ঘাটতি দেখতে পান। এ ধরনের পরিস্থিতি নিয়ে গত নয় বছর ধরেই প্রতিবাদ হয়ে আসছে।
এবার শিক্ষার্থীদের দাবির মধ্যে রয়েছে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমানো, শিক্ষকদের জন্য বরাদ্দ বৃদ্ধি, জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং তরুণদের বিরুদ্ধে পুলিশি সহিংসতা বন্ধ করা।
ডি ব্রিটিটো বলেন, মানুষ এখন উত্তরের অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গ্রিসেও হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও শিক্ষক মিছিল করেছেন। এথেন্সে পার্লামেন্ট ভবনের সামনে বিক্ষোভকারীরা সরকারি ও বিনা মূল্যের শিক্ষার দাবিতে স্লোগান দেন।
ইতালির রোমে ৭ অক্টোবর একটি উচ্চবিদ্যালয় দখলে নেওয়ার পর শিক্ষার্থীরা নিজেদের কর্মসূচির বিবৃতিতে ফ্রান্সের আন্দোলনের কথা উল্লেখ করেন।
তবে ইতালির শিক্ষামন্ত্রী জুসেপ্পে ভালদিতারা দুই দেশের পরিস্থিতির মধ্যে মিল থাকার বিষয়টি নাকচ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, ফ্রান্সের শিক্ষাব্যবস্থায় দ্বিতীয় প্রজন্মের অভিবাসীদের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে যে জটিলতা রয়েছে, তা ইতালির পরিস্থিতির সঙ্গে এক নয়।
## আবাসন সংকটে বাড়ছে ক্ষোভ
শিক্ষার পাশাপাশি সাশ্রয়ী আবাসনের অভাব ইউরোপের তরুণদের আন্দোলনের অন্যতম প্রধান ইস্যু হয়ে উঠেছে।
স্পেনে ৮৭ বছর বয়সী মারিকারমেন আবাসকালের বাড়ি থেকে উচ্ছেদের ঘটনা নতুন করে প্রতিবাদের সূত্রপাত ঘটায়। পরে আবাসনসংকট নিয়ে বিক্ষোভ আরও বিস্তৃত হয় এবং দেশটির সরকার আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দেয়।
ইতালির রোমে বিক্ষোভের অংশ হিসেবে গড়ে তোলা শিবিরে অবস্থানরত শিক্ষার্থীরা সিএনএনকে বলেন, সাশ্রয়ী বাসস্থান ছাড়া ভালো শিক্ষা নিশ্চিত করাও কঠিন।
শিক্ষার্থী এলিসা পাস্তোরে জানান, রোমে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি তাঁকে ভাইয়ের সঙ্গে একটি কক্ষ ভাড়া নিয়ে থাকতে হয়। সেই ভাড়া পরিশোধ করতেই তাঁদের আর্থিক চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে। ভাই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার আগে ডিগ্রির প্রথমার্ধে অর্থ সাশ্রয়ের জন্য তাঁকে রোমের বাইরে থেকে ১২০ কিলোমিটার যাতায়াত করতে হতো।
পর্তুগালের রাজধানী লিসবনেও আবাসন সংকট নিয়ে বিক্ষোভ জোরালো হয়েছে। শহরের রোসিও স্কয়ারে কয়েক দিন ধরে সন্ধ্যায় হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়েছেন। তাঁদের কেউ কেউ সেখানে তাঁবুও খাটিয়েছেন।
মঙ্গলবার ভোরে ৫৫ জনকে গ্রেপ্তারের পর সেখানে নতুন করে বিক্ষোভ শুরু হয়। আন্দোলনকারীরা বাড়িভাড়া বৃদ্ধির সীমা নির্ধারণ এবং উচ্ছেদ সহজ করার নতুন আইন বাতিলের দাবি জানিয়েছেন।
## জীবনযাত্রার ব্যয়ও বাড়াচ্ছে চাপ
আবাসন ও শিক্ষা নিয়ে অসন্তোষের পাশাপাশি জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মানুষকে আন্দোলনে যুক্ত করছে।
ইতালিতে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে ট্রাকচালকদের অবরোধের কারণে মহিষের দুধ দিয়ে তৈরি মোজারেলা পনির এবং কিছু ধরনের পাস্তা উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইরান যুদ্ধের পর জ্বালানির দাম বাড়াকে কেন্দ্র করে এ অবরোধ শুরু হয়।
এসব ঘটনা দেখাচ্ছে, তরুণদের দাবির সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে বৃহত্তর সামাজিক অসন্তোষও যুক্ত হচ্ছে। ফলে আন্দোলন শুধু শিক্ষার্থী বা তরুণদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না।
## আলবেনিয়া ও সার্বিয়ায় দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন
আলবেনিয়া ও সার্বিয়ায় বিক্ষোভের কেন্দ্রে রয়েছে দুর্নীতিবিরোধী দাবি। এসব আন্দোলন ক্রমে সরকার পরিবর্তনের দাবিতেও রূপ নিচ্ছে।
আলবেনিয়ায় কয়েক মাস ধরে দফায় দফায় শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সমর্থনপুষ্ট একটি বিলাসবহুল আবাসন প্রকল্পের পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে আন্দোলনটির সূচনা হয়েছিল।
গত সপ্তাহে দেশটিতে বিক্ষোভ সহিংস হয়ে ওঠার পরও প্রধানমন্ত্রী এদি রামা পদত্যাগের দাবি প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি অভিযোগ করেন, বিক্ষোভকারীরা আলবেনিয়ার ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হওয়ার পরিকল্পনাকে হুমকির মুখে ফেলছেন এবং এ জন্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের দায়ী করেন।
রয়টার্সকে এক বিক্ষোভকারী জানান, তাঁরা পরিবর্তন চান এবং নতুন সরকার দেখতে চান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁরা আলোচনা বা সমঝোতার পরিবর্তে দ্রুত সরকার পরিবর্তনের দাবি জানাচ্ছেন।
অন্যদিকে, সার্বিয়ায় গত দুই বছর ধরে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে চলা আন্দোলন দেশটির দীর্ঘদিনের নেতা আলেকসান্দার ভুচিচের বিরুদ্ধে অন্যতম শক্তিশালী বিরোধী শক্তি হয়ে উঠেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোববারের সংসদীয় নির্বাচনে এই আন্দোলনের প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
## বিক্ষোভে যুক্ত হচ্ছেন শ্রমিক ও জলবায়ুকর্মীরাও
ফ্রান্সে শনিবার প্যারিস, মার্সেই, লিওঁ, লিল, অর্লেয়াঁ ও বোর্দোসহ বিভিন্ন শহরে কয়েক হাজার মানুষ বিক্ষোভ করেছেন। এতে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বড় শ্রমিক সংগঠন সিজিটি, কৃষক, জলবায়ুকর্মী এবং ২০১৮ সালে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে গড়ে ওঠা ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের সদস্যরাও অংশ নেন।
গত সপ্তাহান্তে সহিংস পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় নতুন করে সংঘাত এড়াতে কর্তৃপক্ষ পুরো সপ্তাহজুড়ে প্রস্তুতি নিয়েছে।
এদিকে, ফ্রান্স ও স্পেনের প্রধান শ্রমিক সংগঠনগুলো যথাক্রমে ৫ ও ১১ নভেম্বর সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে। জার্মানিতে ‘জেন জেড রেগেল্ট’ নামে একটি সংগঠন ৩১ অক্টোবর দেশজুড়ে বিক্ষোভের আহ্বান জানিয়েছে। ব্রিটেন ও ইতালির ছাত্র সংগঠনগুলোও শিক্ষার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের প্রতিবাদে আগামী ২০ নভেম্বর যৌথ কর্মসূচির পরিকল্পনা করছে।
## ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তাই বড় উদ্বেগ
ইউরোপজুড়ে চলমান বিক্ষোভের কারণ দেশভেদে আলাদা হলেও তরুণদের উদ্বেগের জায়গাগুলো অনেকটাই এক। শিক্ষা, আবাসন, কর্মসংস্থান, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং জলবায়ু সংকট—সবকিছু মিলিয়ে ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁদের অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ ও বিভিন্ন দেশের ছাত্র সংগঠনগুলোর পারস্পরিক যোগাযোগ আন্দোলনের অভিজ্ঞতা ও দাবি ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করছে।
ফলে স্থানীয় কোনো সমস্যা থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভও বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক অসন্তোষের রূপ নিচ্ছে। ইউরোপের সরকারগুলোর সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো—তরুণদের শিক্ষা, বাসস্থান ও কর্মসংস্থানসংক্রান্ত উদ্বেগের কার্যকর সমাধান কীভাবে নিশ্চিত করা যায়।









