ভারতে তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা জেনারেশন জেড বা জেন-জি আন্দোলন দেশটির ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) জন্য নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। বেকারত্ব, শিক্ষাব্যবস্থায় অনিয়ম, দুর্নীতির অভিযোগ এবং নির্বাচনি স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্নকে কেন্দ্র করে তরুণদের অসন্তোষ বাড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্ব ও সরকারের রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে চলমান আলোচনায়।
এএফপি ও রয়টার্সের বিশ্লেষণের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক দশকের বেশি সময় ধরে ভারতের রাজনীতিতে বিজেপি ও মোদির যে প্রভাব তৈরি হয়েছে, তা এখন বিভিন্ন দিক থেকে প্রশ্নের মুখে পড়ছে। তরুণদের আন্দোলন এই অসন্তোষকে আরও দৃশ্যমান করেছে।
প্রতিবেদনে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামে পরিচিত জেন-জি আন্দোলনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আন্দোলনটি বিজেপির অপরাজেয় ভাবমূর্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে এবং ক্রমেই রাজনৈতিক আলোচনার অংশ হয়ে উঠছে।
## অর্থনৈতিক অসন্তোষ আন্দোলনের কেন্দ্রে
জেন-জি আন্দোলনের অন্যতম প্রধান বিষয় কর্মসংস্থান। শিক্ষিত তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত চাকরির সুযোগ তৈরি না হওয়া, নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ আন্দোলনের পরিসর বাড়াচ্ছে।
প্রতিবেদনে আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৬ সালের কর্মসংস্থানবিষয়ক একটি প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, ১৫ থেকে ২৫ বছর বয়সী শ্রমশক্তিতে থাকা স্নাতকদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ৪০ শতাংশ।
এই পরিসংখ্যান তরুণদের কর্মসংস্থানসংক্রান্ত উদ্বেগের একটি চিত্র তুলে ধরে। তবে বেকারত্বের হার নির্দিষ্ট বয়সসীমা ও শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণকারী স্নাতকদের জন্য প্রযোজ্য; একে ভারতের সব তরুণের বেকারত্বের হার হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
প্রতিবেদনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কর্মসংস্থানের সংকট জাত, শ্রেণি, অঞ্চল ও ধর্মের বিভাজন পেরিয়ে তরুণদের মধ্যে অভিন্ন অসন্তোষ তৈরি করছে। ফলে ধর্মীয় পরিচয় ও জাতীয়তাবাদভিত্তিক রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি অর্থনৈতিক নীতির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন বাড়ছে।
## মোদির রাজনৈতিক ভাবমূর্তি নিয়ে প্রশ্ন
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নরেন্দ্র মোদি দীর্ঘদিন ধরে সরকারের বিভিন্ন সাফল্যকে তাঁর নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত করে রাজনৈতিক ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছেন। কিন্তু তরুণদের অসন্তোষ এখন শুধু প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান বা অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; তা সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বের দিকেও কেন্দ্রীভূত হচ্ছে।
শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের ঘটনাকে বিজেপির জন্য রাজনৈতিক চাপের একটি উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছে ফরেন পলিসি। প্রতিবেদনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এ ধরনের ঘটনা তরুণদের সামনে সরকারের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ও নেতৃত্বের ভাবমূর্তি নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে।
ফরেন পলিসির বিশ্লেষণে মোদির প্রতি জনমতের বার্তা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে সতর্ক করা হয়েছে, তরুণদের অসন্তোষের কার্যকর সমাধান না হলে ভারতের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্ক আরও বাড়তে পারে।
## জরিপে উঠে এসেছে জনমতের উদ্বেগ
প্রতিবেদনে সি-ভোটারের ‘মুড অব দ্য নেশন’ জরিপের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। জরিপ অনুযায়ী, ৪৭ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, ভারতের গণতন্ত্র হুমকির মুখে রয়েছে।
জরিপে বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি এবং তরুণদের অসন্তোষকে একসঙ্গে যুক্ত করে বহুমুখী সংকটের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। তবে জরিপের ফলাফল বুঝতে এর নমুনা, প্রশ্নের ধরন ও জরিপ পরিচালনার সময় বিবেচনা করা জরুরি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, জরিপের হিসাব অনুযায়ী, এখনই নির্বাচন হলে বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় আসনের চেয়ে ১১টি আসন কম পেতে পারে। জানুয়ারির জরিপের তুলনায় দলটির সম্ভাব্য আসনের হিসাব ২৬টি কমেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বিজেপি নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স (এনডিএ) জোটের অবস্থানকে জরিপে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল বলা হয়েছে।
এ ধরনের জরিপভিত্তিক আসনসংখ্যা নির্বাচনের প্রকৃত ফল নয়; এগুলো নির্দিষ্ট সময়ের জনমত ও জরিপের পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল অনুমান।
## মোদির জনপ্রিয়তা ও অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে অসন্তোষ
প্রতিবেদনে উদ্ধৃত জরিপের তথ্য অনুযায়ী, মোদির জনপ্রিয়তার হার ৪৯ শতাংশে নেমেছে। তাঁর কাজকে ‘চমৎকার’ বলে মূল্যায়ন করা উত্তরদাতার হার ৩৫ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমে ৩০ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে।
জরিপে ৫৬ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, ভারতের অর্থনৈতিক নীতিগুলো বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। একই সঙ্গে বেকারত্বকে দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা এবং মূল্যবৃদ্ধিকে সরকারের বড় ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন অনেকে।
এই ফলাফল থেকে বোঝা যায়, অর্থনৈতিক সুযোগ, চাকরি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ে জনমতের উদ্বেগ রাজনৈতিক নেতৃত্বের মূল্যায়নেও প্রভাব ফেলছে। তবে জরিপের ফলকে পুরো জনগোষ্ঠীর মতামতের নিখুঁত প্রতিফলন ধরে নেওয়ার আগে এর পদ্ধতিগত সীমাবদ্ধতা বিবেচনা করা প্রয়োজন।
## ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে
জরিপের উদ্ধৃত তথ্য অনুযায়ী, ভারতের ৮০ শতাংশের বেশি উত্তরদাতা ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। প্রায় ৭০ শতাংশ বেকারত্বকে গুরুতর সমস্যা হিসেবে দেখেছেন। ৬৭ শতাংশ মনে করেন, সরকারি নিয়োগ পরীক্ষা ন্যায্যভাবে পরিচালিত হয় না।
সরকার সংকট মোকাবিলায় কেমন করছে, সে প্রশ্নে ৫৩ শতাংশ উত্তরদাতা সরকারের কাজকে দুর্বল বা খুব দুর্বল বলে মূল্যায়ন করেছেন। অন্যদিকে, ৬৭ শতাংশ তরুণ যন্তর মন্তরে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভের প্রতি সহানুভূতি জানিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই তথ্যগুলো কর্মসংস্থান, সরকারি নিয়োগের স্বচ্ছতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের ব্যাপ্তি সম্পর্কে ধারণা দেয়। তবে আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতি থাকা এবং সরাসরি আন্দোলনে অংশ নেওয়া এক বিষয় নয়।
## ‘মোদি ফর্মুলা’ নিয়ে বিতর্ক
দ্য প্রিন্টের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মোদির তৃতীয় মেয়াদে তাঁর রাজনৈতিক কৌশল বিভিন্ন দিক থেকে চাপের মুখে রয়েছে। এই কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে কঠোর হিন্দুত্বভিত্তিক জাতীয়তাবাদ, কল্যাণমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন, দৃশ্যমান অবকাঠামো নির্মাণ এবং দুর্নীতিমুক্ত নেতৃত্বের ভাবমূর্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক শেখর গুপ্তের মূল্যায়নে, নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক, বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে সন্দেহ, জিডিপির পরিসংখ্যান নিয়ে আলোচনা, মূল্যস্ফীতি, রুপির ওপর চাপ এবং শেয়ারবাজারের ওঠানামা সরকারের সামনে একাধিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
এ ছাড়া মন্ত্রিসভার পুনর্গঠন নিয়ে দ্বিধা এবং জোটসঙ্গীদের সমালোচনাও রাজনৈতিক চাপের অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, পশ্চিম এশিয়ার অস্থিরতা, জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্কও ভারতের নীতিনির্ধারণের পরিবেশকে প্রভাবিত করছে বলে বিশ্লেষণে বলা হয়েছে।
তবে এসব বিষয়কে সরকারের রাজনৈতিক কৌশল ব্যর্থ হওয়ার চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে দেখা যায় না; এগুলো বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন।
## বিরোধী দলগুলোর জন্য নতুন সুযোগ?
জেন-জি আন্দোলন সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে না থাকলেও বিরোধী দলগুলোর জন্য নতুন রাজনৈতিক পরিসর তৈরি করছে বলে বিবিসি ও রয়টার্সের বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী তরুণদের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। প্রতিবেদনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তিনি মোদির শক্তিশালী নেতৃত্বের ভাবমূর্তির বিপরীতে গণতান্ত্রিক অধিকার ও রাজনৈতিক জবাবদিহির প্রশ্নকে সামনে আনার সুযোগ পাচ্ছেন।
তবে কোনো আন্দোলনের দাবি বিরোধী দলগুলোর বক্তব্যের সঙ্গে মিলে গেলেই আন্দোলনটি কোনো নির্দিষ্ট দলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। আন্দোলনের স্বতন্ত্র নেতৃত্ব, দাবির ধরন এবং অংশগ্রহণকারীদের অবস্থান আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
## আসন্ন নির্বাচন হতে পারে রাজনৈতিক পরীক্ষার ক্ষেত্র
প্রতিবেদনে উত্তরপ্রদেশের আসন্ন রাজ্য নির্বাচনকে জেন-জি আন্দোলনের রাজনৈতিক প্রভাব বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। রাজপথের অসন্তোষ ভোটের আচরণে প্রতিফলিত হলে বিজেপি ও বিরোধী দলগুলোর নির্বাচনি অবস্থানে তার প্রভাব পড়তে পারে।
তবে আন্দোলনে অংশগ্রহণ, জরিপে সরকারের সমালোচনা এবং নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্তের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক নিশ্চিত নয়। নির্বাচনের ফল নির্ভর করবে স্থানীয় ইস্যু, প্রার্থী, জোট, প্রচার এবং ভোটারদের বিভিন্ন বিবেচনার ওপর।
## সামনে কী চ্যালেঞ্জ?
ভারতে জেন-জি আন্দোলন কর্মসংস্থান, শিক্ষাব্যবস্থার স্বচ্ছতা, দুর্নীতির অভিযোগ এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে জনপরিসরে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। এসব বিষয়কে ঘিরে তরুণদের অসন্তোষ সরকারের জন্য রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে, একই সঙ্গে বিরোধী দলগুলোর সামনে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার সুযোগও তৈরি হচ্ছে।
বিজেপি ও সরকারের সামনে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—তরুণদের উদ্বেগের কার্যকর সমাধান কীভাবে করা হবে এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থা কীভাবে বজায় রাখা হবে। অন্যদিকে, আন্দোলনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নির্ভর করবে এর দাবিগুলো কতটা সংগঠিত থাকে, রাজনৈতিক দলগুলো কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানায় এবং জনঅসন্তোষ নির্বাচনি আচরণে কতটা প্রতিফলিত হয় তার ওপর।
সব মিলিয়ে, জেন-জি আন্দোলন ভারতের রাজনীতিতে তরুণদের কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক প্রত্যাশা ও জবাবদিহির প্রশ্নকে আরও দৃশ্যমান করেছে। তবে বিজেপি বা মোদির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে নির্ভরযোগ্য তথ্য, জরিপের সীমাবদ্ধতা এবং পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ বিবেচনা করা জরুরি।
**সূত্র:** বিবিসি, রয়টার্স, এএফপি, ফরেন পলিসি ও দ্য প্রিন্টে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও বিশ্লেষণ।








