GULF BANGLA বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন +880 1755727432
Home / রাজনীতি / ‘আসামের বাঙালি মুসলমানদের লড়াই বাংলাদেশেরও’, বললেন নাহিদ ইসলাম

‘আসামের বাঙালি মুসলমানদের লড়াই বাংলাদেশেরও’, বললেন নাহিদ ইসলাম

ভারতের আসামে বাংলাভাষী মুসলমানদের বাড়িঘর ও মসজিদ উচ্ছেদের অভিযোগের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তার মতে, আসামের বাঙালি মুসলমানদের অধিকার ও অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের ইতিহাস, জাতীয় স্বার্থ ও সীমান্ত পরিস্থিতিও জড়িত।

সোমবার (২৬ অক্টোবর) প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, রোববার (২৫ অক্টোবর) দিবাগত রাতে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে নাহিদ ইসলাম আসামের উচ্ছেদ অভিযান, নাগরিকত্ব, ভাষাগত পরিচয় এবং বাংলাদেশের কূটনৈতিক ভূমিকা নিয়ে বক্তব্য দেন।

তিনি অভিযোগ করেন, আসামের নগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকায় বাংলাভাষী মুসলমানদের ঘরবাড়ি উচ্ছেদের ঘটনা শুধু কিছু পরিবারের ক্ষতিই নয়; বরং ওই অঞ্চলে তাদের ঐতিহাসিক উপস্থিতি ও রাজনৈতিক অস্তিত্বের ওপরও আঘাত।

## দুই দিনে ১১০০ বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ

নাহিদ ইসলামের ফেসবুক পোস্ট অনুযায়ী, গত ১৭ ও ১৮ অক্টোবর মাত্র দুই দিনে আসামে বাংলাভাষী মুসলমানদের ১১০০-এর বেশি বাড়িঘর এবং ১০টিরও বেশি মসজিদ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন, ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে অন্তত ৩৩টি উচ্ছেদ অভিযানে ২২ হাজারের বেশি পরিবার গৃহহীন হয়েছে।

তার বক্তব্য, এসব অভিযান কেন বারবার একই সম্প্রদায়ের মানুষকে লক্ষ্য করে পরিচালিত হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন।

তবে উচ্ছেদ হওয়া বাড়িঘর, মসজিদ ও পরিবারের সংখ্যা এবং অভিযানের কারণ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের তথ্য দিয়ে এসব দাবির স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।

## হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি নিয়ে নাহিদের সমালোচনা

নাহিদ ইসলাম তার পোস্টে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা ও বিজেপির রাজনীতির সমালোচনা করেন। তার অভিযোগ, আসামে দীর্ঘদিনের জাতিগত ও ভাষাগত বিরোধকে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের কাঠামোয় উপস্থাপন করা হচ্ছে, যার ফলে বাংলাভাষী মুসলমানেরা বিশেষভাবে চাপের মুখে পড়ছেন।

তিনি দাবি করেন, বাংলাভাষী মুসলমানদের ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা তাদের নাগরিক অধিকার ও সামাজিক নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।

পোস্টে তিনি আরও অভিযোগ করেন, উচ্ছেদ অভিযানের পাশাপাশি ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া, আধার কার্ড পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা এবং নাগরিকত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তার মতো বিষয়ও এই জনগোষ্ঠীর সংকট বাড়াচ্ছে।

## এনআরসি, সিএএ ও নাগরিকত্বের প্রশ্ন

আসামের নাগরিকত্ব বিতর্কের প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন (এনআরসি) এবং নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ)-এর কথা উল্লেখ করেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, এনআরসি থেকে বাদ পড়া ১৯ লাখ মানুষের বিষয়টি এখনো বড় উদ্বেগের কারণ। একই সঙ্গে সিএএর আওতায় অমুসলিমদের নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ এবং বাংলাভাষী মুসলমানদের অবস্থান নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন।

তিনি অভিযোগ করেন, কিছু ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া পাশ কাটিয়ে মানুষকে সীমান্তের দিকে ঠেলে দেওয়ার ঘটনা ঘটছে। তার মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ মানুষের নাগরিক অধিকার ও নিরাপত্তার জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

নাগরিকত্ব ও বহিষ্কারসংক্রান্ত অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আইন, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং প্রতিটি ঘটনার তথ্য যাচাই করা জরুরি।

## সিলেট ও বরাক উপত্যকার ঐতিহাসিক যোগসূত্র

নাহিদ ইসলাম তার পোস্টে আসামের সঙ্গে বাংলাদেশের বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলের ঐতিহাসিক সম্পর্ক তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, ১৮৭৪ সালে সিলেটকে বাংলার প্রশাসনিক কাঠামো থেকে সরিয়ে আসামের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল। পরে ১৯৪৭ সালের গণভোটের পর সিলেটের বড় অংশ পূর্ববঙ্গে যুক্ত হলেও করিমগঞ্জসহ কিছু এলাকা আসামে থেকে যায়।

তার মতে, এই ইতিহাসের কারণে সিলেট ও বরাক উপত্যকার মানুষের মধ্যে ভাষা, সংস্কৃতি ও পারিবারিক সম্পর্কের দীর্ঘ যোগসূত্র রয়েছে। ফলে আসামের পরিস্থিতি বাংলাদেশের মানুষের কাছে নিছক প্রতিবেশী দেশের ঘটনা নয়।

তিনি ১৯৬১ সালের ১৯ মে শিলচর রেলস্টেশনে বাংলা ভাষার দাবিতে আন্দোলনের সময় পুলিশের গুলিতে ১১ জন নিহত হওয়ার ঘটনাও স্মরণ করেন। নাহিদের বক্তব্য, বরাক উপত্যকার ভাষা আন্দোলন বাঙালি হিন্দু ও মুসলমানের যৌথ ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

## মওলানা ভাসানীর আন্দোলনের প্রসঙ্গ

আসামের বাংলাভাষী মুসলমানদের অধিকার রক্ষার ইতিহাস ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নাহিদ ইসলাম মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সংগ্রামের কথাও তুলে ধরেন।

তার পোস্টে বলা হয়, আসামের চরাঞ্চলের কৃষক ও শোষিত মানুষের অধিকার রক্ষায় ভাসানী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ‘লাইন প্রথা’ ও ‘বাঙাল খেদাও’ রাজনীতির বিরুদ্ধে তার আন্দোলন ওই অঞ্চলে বাঙালি মুসলমানদের নাগরিক মর্যাদা রক্ষার সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত ছিল বলে নাহিদ উল্লেখ করেন।

তার মতে, আসামের বাংলাভাষী মুসলমানদের ইতিহাস ও নাগরিক অধিকারকে বর্তমান রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে রেখে দেখা সম্ভব নয়।

## ‘কেবল কূটনৈতিক চিঠিতে কি বুলডোজার থামবে?’

আসামের পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সরকারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, সীমান্তে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) দায়িত্ব পালন করছে এবং ভারতকে এ বিষয়ে একাধিক চিঠি দেওয়া হয়েছে বলে জানা যায়। তবে তার প্রশ্ন, শুধু কূটনৈতিক চিঠি পাঠিয়ে উচ্ছেদ ও সীমান্ত দিয়ে মানুষ ঠেলে পাঠানোর অভিযোগের সমাধান সম্ভব কি না।

নাহিদ ইসলামের মতে, সীমান্ত পরিস্থিতি ও সম্ভাব্য পুশইন নিয়ে সরকারের একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করা উচিত। একই সঙ্গে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মঞ্চে রাষ্ট্রহীনতার ঝুঁকি ও মানবিক সংকট তুলে ধরার আহ্বান জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, কোনো পুশইন বা প্রত্যাবাসন গ্রহণ না করার বিষয়ে সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

## বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সম্প্রীতি রক্ষার আহ্বান

আসামের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে যেন কোনো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা বিঘ্নিত না হয়, সে বিষয়েও সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন নাহিদ ইসলাম।

তার বক্তব্য, প্রতিবেশী দেশের সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশে অস্থিরতা তৈরি হলে তা উল্টো আসামের বাংলাভাষী মুসলমানদের ওপর চাপ বাড়াতে পারে। তাই দেশের ভেতরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।

## বাংলাদেশের সামনে কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ

নাহিদ ইসলামের পোস্টে আসামের বাঙালি মুসলমানদের পরিস্থিতিকে ইতিহাস, নাগরিক অধিকার ও বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হয়েছে। তিনি মনে করেন, সীমান্ত দিয়ে মানুষকে ঠেলে পাঠানোর অভিযোগ এবং নাগরিকত্বসংক্রান্ত অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় বাংলাদেশের আরও সুস্পষ্ট কূটনৈতিক অবস্থান প্রয়োজন।

তবে এ ধরনের সংকট সমাধানে বাংলাদেশের সম্ভাব্য পদক্ষেপ নির্ভর করবে যাচাই করা তথ্য, দ্বিপক্ষীয় আলোচনা, আন্তর্জাতিক আইন এবং সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষার ওপর।

সব মিলিয়ে, আসামে বাংলাভাষী মুসলমানদের উচ্ছেদ ও নাগরিকত্বসংক্রান্ত অভিযোগ নিয়ে নাহিদ ইসলাম বাংলাদেশের সরকারের কাছে আরও দৃঢ় কূটনৈতিক উদ্যোগের আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি ইতিহাসের স্বীকৃতি, নাগরিক মর্যাদা এবং দেশের অভ্যন্তরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

**সূত্র:** দৈনিক যুগান্তরের প্রতিবেদন ও নাহিদ ইসলামের ফেসবুক পোস্ট।

Social Icons