দারিদ্র্যের মধ্যে শৈশব, কারখানায় শ্রমিকের কাজ, শ্রমিক আন্দোলনে নেতৃত্ব, দুর্নীতির মামলায় কারাবাস—সব বাধা পেরিয়ে ব্রাজিলের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছেন লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। শ্রমিক অধিকার ও দারিদ্র্য কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করা এই নেতা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও আলোচিত। বিশেষ করে গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযান এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির সমালোচনা করে বারবার সংবাদ শিরোনাম হয়েছেন তিনি।
লুলার রাজনৈতিক জীবন উত্থান-পতনে ভরা। ২০০২ সালে প্রথমবার ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন তিনি। এরপর ২০০৬ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে জয় পান। দুর্নীতির মামলায় কারাগারে যাওয়ার পর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়লেও ২০২২ সালের নির্বাচনে আবারও জয়ী হন। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে তৃতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন তিনি। মূল প্রতিবেদনে ২০২৬ সালের নির্বাচনে চতুর্থবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার দাবিও করা হয়েছে। তবে এ তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
## দারিদ্র্যের মধ্যে কেটেছে শৈশব
লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার জন্ম ১৯৪৫ সালের ২৭ অক্টোবর ব্রাজিলের পারনামবুকো রাজ্যের গারানিউন্স শহরে। দরিদ্র কৃষক পরিবারের সন্তান হওয়ায় ছোটবেলা থেকেই অভাবের সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে তাকে। উন্নত জীবনের আশায় তার মা সন্তানদের নিয়ে সাও পাওলোতে চলে যান। তখন লুলার বয়স ছিল মাত্র সাত বছর।
পরিবারের আর্থিক সংকট মোকাবিলায় শৈশবেই কাজ শুরু করেন লুলা। রাস্তায় চিনাবাদাম ও ফল বিক্রি করেছেন। জুতায় পালিশ করার কাজও করেছেন। পরে কারখানায় শ্রমিক হিসেবে যোগ দেন। আনুষ্ঠানিক শিক্ষা বেশি দূর এগোয়নি। তবে কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ধাতব শিল্পে কাজ করার দক্ষতা অর্জন করেন তিনি। একপর্যায়ে লেদ মেশিন পরিচালনার কাজও শেখেন।
কারখানায় কাজ করার সময় শ্রমিকদের কম মজুরি, কঠিন কর্মপরিবেশ এবং নানা বঞ্চনা কাছ থেকে দেখেন লুলা। এসব অভিজ্ঞতা তার রাজনৈতিক চিন্তাভাবনায় প্রভাব ফেলে। শ্রমিকদের অধিকার, ন্যায্য মজুরি এবং সামাজিক বৈষম্য কমানোর বিষয়গুলো পরবর্তী সময়ে তার রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।
## শ্রমিক আন্দোলন থেকে রাজনীতিতে প্রবেশ
১৯৭০-এর দশকে ব্রাজিলের সামরিক শাসন চলাকালে শ্রমিক ইউনিয়নের কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হয়ে ওঠেন লুলা। ১৯৭৫ সালে সাও বার্নার্দো দো কাম্পু ও দিয়াদেমা অঞ্চলের ধাতবশ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি নির্বাচিত হন। এর মাধ্যমে শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকদের মধ্যে তার পরিচিতি বাড়তে থাকে।
শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি ও কর্মপরিবেশ উন্নত করার দাবিতে একাধিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন তিনি। ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে তার নেতৃত্বে বড় ধরনের ধর্মঘট সংগঠিত হয়। ১৯৭৯ সালে প্রায় দেড় লাখ শ্রমিকের অংশগ্রহণে একটি উল্লেখযোগ্য ধর্মঘটের নেতৃত্ব দেন লুলা। এ সময় কর্তৃপক্ষের দমন-পীড়নের মুখে পড়েন তিনি। জাতীয় নিরাপত্তা আইনের আওতায় তাকে গ্রেপ্তারও করা হয়।
তবে এসব ঘটনা তার জনপ্রিয়তা কমাতে পারেনি। বরং শ্রমিকদের অধিকার ও সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের নেতা হিসেবে তার পরিচিতি আরও বাড়ে।
১৯৮০ সালে শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা, বুদ্ধিজীবী ও বামপন্থি রাজনৈতিক কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে ওয়ার্কার্স পার্টি বা পার্টিদো দোস ত্রাবালহাদোরেস (পিটি) প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন লুলা। দলটি শ্রমিকের অধিকার, দারিদ্র্য হ্রাস ও সামাজিক ন্যায়বিচারের ওপর গুরুত্ব দেয়।
১৯৮৬ সালে সাও পাওলো থেকে ফেডারেল ডেপুটি নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৮৯ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নিলেও জয় পাননি। ১৯৯৪ ও ১৯৯৮ সালের নির্বাচনেও পরাজিত হন। তবে প্রতিটি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তার রাজনৈতিক ভিত্তি বিস্তৃত হতে থাকে।
## ২০০২ সালে প্রথমবার প্রেসিডেন্ট
টানা তিনটি নির্বাচনে পরাজয়ের পর ২০০২ সালে নির্বাচনী কৌশলে পরিবর্তন আনেন লুলা। শ্রমিক ও দরিদ্র মানুষের অধিকারের পক্ষে অবস্থান বজায় রাখলেও অর্থনীতি ও বিনিয়োগ নিয়ে তুলনামূলক মধ্যপন্থি বার্তা দেন। এতে ব্যবসায়ী ও মধ্যবিত্ত ভোটারদের একাংশের সমর্থন পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
নির্বাচনে জয়ী হয়ে ২০০৩ সালের জানুয়ারিতে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন তিনি। তার সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার ছিল ক্ষুধা ও দারিদ্র্য কমানো। দরিদ্র পরিবারকে আর্থিক সহায়তা, ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
লুলার প্রথম দুই মেয়াদে সামাজিক কর্মসূচির সম্প্রসারণ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তার জনপ্রিয়তা বাড়াতে ভূমিকা রাখে। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রাজিলের রপ্তানি বৃদ্ধিও অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। ২০০৬ সালে দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন তিনি। ২০১০ সালে তার সমর্থিত প্রার্থী দিলমা রুসেফ প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
## দুর্নীতির মামলা ও কারাবাস
লুলার রাজনৈতিক জীবনে বড় সংকট তৈরি হয় ব্রাজিলের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পেট্রোব্রাসকে ঘিরে দুর্নীতির তদন্তের সময়। ‘অপারেশন কার ওয়াশ’ নামে পরিচিত এই তদন্তের অংশ হিসেবে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। ২০১৭ সালে একটি মামলায় তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। ২০১৮ সালে কারাগারে যাওয়ায় ওই বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি তিনি।
লুলার সমর্থকেরা দাবি করেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তাকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখা হয়েছিল। অন্যদিকে বিরোধীরা তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগকে গুরুত্ব দেয়।
২০১৯ সালে কারাগার থেকে মুক্তি পান লুলা। ২০২১ সালে ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্ট তার বিরুদ্ধে দেওয়া সাজা বাতিল করে। আদালতের সিদ্ধান্তে বলা হয়, যে আদালতে তার বিচার হয়েছিল, সেই আদালতের মামলাটি বিচারের এখতিয়ার ছিল না। বিচারকের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এর ফলে লুলা আবার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান।
২০২২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তৎকালীন ডানপন্থি প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর মুখোমুখি হন তিনি। দ্বিতীয় দফার ভোটে জয়ী হয়ে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে তৃতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন লুলা।
## কেন যুক্তরাষ্ট্রের নীতির সমালোচনা করেন লুলা?
লুলার পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো আন্তর্জাতিক বিষয়ে ব্রাজিলের স্বাধীন অবস্থান বজায় রাখার চেষ্টা। তিনি বহুপক্ষীয় কূটনীতি, আন্তর্জাতিক সংলাপ এবং জাতিসংঘের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেন। তার মতে, সামরিক বা অর্থনৈতিক শক্তির জোরে কোনো দেশের ওপর অন্য দেশের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি নিয়েও প্রকাশ্যে সমালোচনা করেছেন লুলা। মূল প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৬ সালের এপ্রিলে স্পেনের সংবাদপত্র এল পায়েসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের হুমকির সমালোচনা করেন তিনি। লুলার বক্তব্য ছিল, কোনো দেশের নেতারই অন্য একটি দেশকে ইচ্ছামতো হুমকি দেওয়ার অধিকার নেই।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে গ্লোবাল সাউথের ভূমিকা বাড়ানোর পক্ষেও কথা বলেন তিনি। তার মতে, আন্তর্জাতিক সংঘাত সমাধানে সামরিক পদক্ষেপের পাশাপাশি আলোচনা ও কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি।
## গাজা ইস্যুতে ইসরাইলের সমালোচনা
ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযান নিয়ে লুলার বক্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিতর্ক তৈরি করেছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলায় ইসরাইলি বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির নিন্দা জানান তিনি। একই সঙ্গে গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযানের তীব্র সমালোচনা করেন।
লুলা যুদ্ধবিরতি, গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছানো এবং ফিলিস্তিনিদের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অধিকারের পক্ষে কথা বলেছেন। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিসর সফরের সময় ইসরাইলের সামরিক কর্মকাণ্ড নিয়ে তার মন্তব্যের পর দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে টানাপোড়েন দেখা দেয়।
তার সমর্থকদের মতে, বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি বন্ধ করা এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইন রক্ষার জন্য তিনি এই অবস্থান নিয়েছেন। সমালোচকদের বক্তব্য, তার কিছু মন্তব্য কূটনৈতিক উত্তেজনা বাড়িয়েছে।
লুলা একদিকে ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অধিকারের পক্ষে কথা বলেছেন, অন্যদিকে ইসরাইলি বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলারও নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি দীর্ঘমেয়াদি শান্তির জন্য দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
## লুলার সামনে কী চ্যালেঞ্জ?
মূল প্রতিবেদনে ২০২৬ সালের নির্বাচনে ডানপন্থি সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারোকে হারিয়ে লুলার চতুর্থবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার দাবি করা হয়েছে। সেখানে আরও বলা হয়েছে, তার জয় নিয়ে বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক নেতারা প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তবে নির্বাচনের ফল ও সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়াগুলো নির্ভরযোগ্য সূত্রে যাচাই করা প্রয়োজন।
ব্রাজিলের রাজনীতিতে লুলার দীর্ঘদিনের প্রভাবের পেছনে শ্রমিক আন্দোলনের অভিজ্ঞতা, দরিদ্র মানুষের সঙ্গে সংযোগ এবং সামাজিক সহায়তা কর্মসূচির ভূমিকা রয়েছে। তবে দুর্নীতির অভিযোগ ঘিরে বিতর্ক, রাজনৈতিক বিভাজন এবং পররাষ্ট্রনীতির বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনাও অব্যাহত।
দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয়, অপরাধ এবং কর্মসংস্থানের মতো বিষয়গুলো তার সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, আমাজন বনাঞ্চল সংরক্ষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলাও ব্রাজিলের ভবিষ্যৎ নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
দারিদ্র্য থেকে উঠে এসে শ্রমিক আন্দোলনের নেতা এবং পরে রাষ্ট্রপ্রধান হওয়া লুলা দা সিলভার জীবন ব্রাজিলের রাজনীতিতে এক ব্যতিক্রমী অধ্যায়। তার রাজনৈতিক সাফল্যের পাশাপাশি বিতর্কও রয়েছে। এই দুই দিকই তাকে দেশটির অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।









