পিঠে ব্যথা হলেই যে কিডনির সমস্যা হয়েছে, এমন নয়। আবার কখনো কখনো কিডনির অসুস্থতার কারণেও পিঠের পাশের দিকে ব্যথা হতে পারে। সাধারণ পিঠের ব্যথা অনেক সময় পেশির টান, ভুল বসার ভঙ্গি কিংবা মেরুদণ্ডের সমস্যার কারণে দেখা দেয়। অন্যদিকে, কিডনির ব্যথার পেছনে থাকতে পারে কিডনিতে পাথর, সংক্রমণ বা মূত্রনালীর বিভিন্ন সমস্যা।
দুই ধরনের ব্যথার অবস্থান ও প্রকৃতিতে কিছু পার্থক্য থাকলেও শুধু লক্ষণ দেখে নিশ্চিতভাবে রোগ নির্ণয় করা সম্ভব নয়। তাই ব্যথার ধরন, অবস্থান এবং এর সঙ্গে অন্য কোনো উপসর্গ দেখা দিচ্ছে কি না, সেদিকে খেয়াল রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতের ফর্টিস হাসপাতাল, শালিমার বাগের নেফ্রোলজি বিভাগের পরিচালক ডা. যোগেশ ছাবড়া এক সাক্ষাৎকারে পিঠের ব্যথা ও কিডনির ব্যথার পার্থক্য এবং যেসব লক্ষণ অবহেলা করা উচিত নয়, সেগুলো ব্যাখ্যা করেছেন।
## পিঠের ব্যথা ও কিডনির ব্যথা কোথায় হয়?
দুই ধরনের ব্যথার পার্থক্য বোঝার ক্ষেত্রে ব্যথার অবস্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারে।
ডা. যোগেশ ছাবড়ার মতে, সাধারণ পিঠের ব্যথা সাধারণত পিঠের নিচের অংশে, মেরুদণ্ডের আশপাশে এবং সংশ্লিষ্ট পেশিতে বেশি অনুভূত হয়। ব্যথার কারণ স্লিপ ডিস্ক বা স্নায়ুর ওপর চাপ হলে তা নিতম্ব কিংবা পায়ের দিকেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
অন্যদিকে, কিডনির ব্যথা সাধারণত শরীরের গভীরে অনুভূত হয়। এটি পিঠের দুই পাশের যেকোনো এক পাশে বা উভয় পাশে, পাঁজরের ঠিক নিচের অংশে হতে পারে।
তবে ব্যথার অবস্থান একাই কিডনির সমস্যা নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট নয়। তাই ব্যথার পাশাপাশি প্রস্রাবের পরিবর্তন, জ্বর বা অন্য কোনো উপসর্গ আছে কি না, সেটিও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
## ব্যথার ধরনেও থাকতে পারে পার্থক্য
সাধারণ পিঠের ব্যথা অনেক সময় পেশিতে টান, শক্ত হয়ে থাকা কিংবা তীক্ষ্ণ ব্যথার মতো অনুভূত হয়। ঝুঁকে কাজ করা, ভারী জিনিস তোলা, শরীর মোচড়ানো বা দীর্ঘক্ষণ একই ভঙ্গিতে বসে থাকলে এ ধরনের ব্যথা বেড়ে যেতে পারে। আবার কিছু ক্ষেত্রে বিশ্রাম নেওয়া বা অবস্থান পরিবর্তন করলে ব্যথা কমে আসে।
কিডনির সমস্যার কারণে সৃষ্ট ব্যথা তুলনামূলকভাবে গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। তবে কিডনির সমস্যার ধরন অনুযায়ী ব্যথার প্রকৃতি ভিন্ন হতে পারে।
কিডনিতে পাথর থাকলে ব্যথা তীব্র হতে পারে এবং ঢেউয়ের মতো বাড়তে-কমতে পারে। অন্যদিকে, কিডনিতে সংক্রমণ হলে একটানা ব্যথা বা অস্বস্তির সঙ্গে জ্বর ও কাঁপুনির মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
তবে সব ক্ষেত্রে একই ধরনের লক্ষণ দেখা যায় না। তাই শুধু ব্যথার তীব্রতা বা প্রকৃতি দেখে নিজে নিজে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।
## কিডনির সমস্যার সঙ্গে যেসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে
ডা. ছাবড়ার মতে, কিডনির ব্যথার সঙ্গে কিছু মূত্রনালিসংক্রান্ত ও শারীরিক উপসর্গ থাকতে পারে। যেমন—
– প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়া বা ব্যথা।
– ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ পাওয়া।
– প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত যাওয়া।
– প্রস্রাব ঘোলাটে হওয়া বা দুর্গন্ধযুক্ত প্রস্রাব।
– শরীরে জ্বর বা উত্তাপ অনুভব করা এবং কাঁপুনি দেওয়া।
– বমি বমি ভাব।
– পিঠের নিচের অংশে বা শরীরের পাশের দিকে ব্যথা।
সাধারণ পেশির টানজনিত পিঠের ব্যথার সঙ্গে সাধারণত প্রস্রাবের এসব উপসর্গ থাকে না। তবে জ্বর বা প্রস্রাবের সমস্যা না থাকলেই যে কিডনির কোনো সমস্যা নেই, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
## কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি?
পিঠের ব্যথার সঙ্গে জ্বর, কাঁপুনি, প্রস্রাবে রক্ত, প্রস্রাবের সময় ব্যথা বা ক্রমাগত বমি বমি ভাব দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। এসব উপসর্গ কিডনির সংক্রমণ বা কিডনিতে পাথরের মতো সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
এ ছাড়া কিছু লক্ষণ দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা নেওয়া দরকার। যেমন—
– ব্যথা অত্যন্ত তীব্র হওয়া বা ক্রমেই বাড়তে থাকা।
– প্রস্রাব করতে না পারা।
– বিভ্রান্তি বা জ্ঞান হারিয়ে ফেলা।
– বমির কারণে শরীরে পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখা দেওয়া।
– পিঠের ব্যথার সঙ্গে পায়ে দুর্বলতা বা কুঁচকির আশপাশে অসাড়তা দেখা দেওয়া।
– মূত্রাশয় বা অন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ হারানো।
বিশেষ করে পিঠের ব্যথার সঙ্গে নতুন করে পায়ে দুর্বলতা, কুঁচকিতে অসাড়তা কিংবা প্রস্রাব-পায়খানার নিয়ন্ত্রণে পরিবর্তন দেখা দিলে দেরি না করে জরুরি বিভাগে যেতে হবে।
## পিঠের ব্যথা ও কিডনির সমস্যা কীভাবে নির্ণয় করা হয়?
ব্যথার প্রকৃত কারণ নির্ধারণের জন্য চিকিৎসক প্রথমে রোগীর উপসর্গ, ব্যথার অবস্থান ও স্থায়িত্ব সম্পর্কে জানতে চাইবেন। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী শারীরিক পরীক্ষা করবেন।
সম্ভাব্য কারণের ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসক কয়েক ধরনের পরীক্ষা করাতে পারেন। এর মধ্যে রয়েছে—
**প্রস্রাব পরীক্ষা:** প্রস্রাবে সংক্রমণ, রক্ত বা অন্যান্য অস্বাভাবিকতা আছে কি না, তা যাচাই করতে সাহায্য করে।
**রক্ত পরীক্ষা:** কিডনির কার্যকারিতা এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয় মূল্যায়নের জন্য প্রয়োজন হতে পারে।
**আল্ট্রাসাউন্ড বা সিটি স্ক্যান:** কিডনিতে পাথর বা অন্য কোনো গঠনগত সমস্যা সন্দেহ হলে চিকিৎসক এসব পরীক্ষার পরামর্শ দিতে পারেন।
সব রোগীর ক্ষেত্রে একই পরীক্ষা প্রয়োজন হয় না। উপসর্গ ও চিকিৎসকের মূল্যায়নের ভিত্তিতেই উপযুক্ত পরীক্ষা নির্ধারণ করা হয়।
## চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ব্যথানাশক ওষুধ নয়
পিঠে ব্যথা হলে অনেকেই নিজের সিদ্ধান্তে ব্যথানাশক ওষুধ খেয়ে থাকেন। কিন্তু কিডনির সমস্যা থাকার আশঙ্কা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এ ধরনের ওষুধ সেবন করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
ডা. ছাবড়া নিজে নিজে রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ব্যথানাশক ওষুধ গ্রহণের বিষয়ে সতর্ক করেছেন। কারণ কিছু ব্যথানাশক ওষুধ কিডনির কার্যকারিতার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই ব্যথার কারণ না জেনে বারবার ওষুধ খাওয়ার পরিবর্তে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। ব্যথা দীর্ঘস্থায়ী হলে, বারবার ফিরে এলে বা অন্য উপসর্গের সঙ্গে দেখা দিলে বিষয়টি অবহেলা করা ঠিক নয়।
## শেষ কথা
পিঠের সাধারণ ব্যথা ও কিডনির ব্যথার মধ্যে পার্থক্য বুঝতে ব্যথার অবস্থান, ধরন এবং সঙ্গে থাকা অন্যান্য উপসর্গ লক্ষ্য করা গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ পিঠের ব্যথা অনেক সময় নড়াচড়া বা শরীরের ভঙ্গির সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। অন্যদিকে, কিডনির সমস্যায় পিঠের পাশের গভীর ব্যথার পাশাপাশি প্রস্রাবের সমস্যা, জ্বর, কাঁপুনি বা বমি বমি ভাব দেখা দিতে পারে।
তবে এসব লক্ষণ দিয়ে একা নিশ্চিতভাবে রোগ নির্ণয় করা যায় না। প্রয়োজন অনুযায়ী প্রস্রাব পরীক্ষা, রক্ত পরীক্ষা কিংবা ইমেজিং পরীক্ষার মাধ্যমে চিকিৎসক প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করতে পারেন। তীব্র ব্যথা, প্রস্রাব বন্ধ হয়ে যাওয়া, জ্ঞান হারানো বা পিঠের ব্যথার সঙ্গে পায়ে দুর্বলতা ও কুঁচকিতে অসাড়তার মতো লক্ষণ দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা নেওয়া উচিত।
**সূত্র: যুগান্তর লাইফস্টাইলের প্রতিবেদন অবলম্বনে।**









