যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হারসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত এবং মূল্যস্ফীতির নতুন তথ্যের অপেক্ষায় বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম কমেছে। বিনিয়োগকারীদের অবস্থান সমন্বয় ও মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অনিশ্চয়তার মধ্যেও মূল্যবান ধাতুটির বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) স্পট মার্কেটে স্বর্ণের দাম প্রায় ১ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৩৮ ডলারে নেমে আসে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বিশ্ববাজারে স্বর্ণের সর্বশেষ দাম কত?
বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় সকাল ১০টা ১০ মিনিটে স্পট মার্কেটে স্বর্ণের দাম শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ৩৭ দশমিক ৯৮ ডলারে দাঁড়ায়।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রে ডিসেম্বর মাসে সরবরাহের জন্য স্বর্ণের ফিউচার দর প্রায় অপরিবর্তিত ছিল। এ সময় প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ছিল ৪ হাজার ৪৯ দশমিক ৮০ ডলার।
স্পট মার্কেটের স্বর্ণের দাম ও ফিউচার দর এক নয়। স্পট মার্কেটে স্বর্ণের তাৎক্ষণিক বাজারমূল্য প্রতিফলিত হয়, আর ফিউচার চুক্তিতে ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট সময়ে সরবরাহের জন্য দাম নির্ধারিত থাকে।
কেন কমল স্বর্ণের দাম?
মুম্বাইভিত্তিক কেডিয়া কমোডিটিজের পরিচালক অজয় কেডিয়া বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অনিশ্চয়তা এবং যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রকাশের আগে বিনিয়োগকারীদের অবস্থান সমন্বয়ের কারণে স্বর্ণের দামে এই পতন হয়েছে।
বাজারের পরবর্তী গতিপথ নির্ধারণে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদের হারসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির নতুন তথ্য বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশায় পরিবর্তন আনতে পারে।
ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার নিয়ে কী সিদ্ধান্ত?
বুধবার ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার ৩ দশমিক ৭৫ থেকে ৪ শতাংশের মধ্যে অপরিবর্তিত রাখে। মূল্যস্ফীতির নতুন তথ্যের অপেক্ষায় আগামী সপ্তাহের যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর পর্যন্ত সুদের হারে পরিবর্তন পিছিয়ে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকটি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে, সিএমইর ফেডওয়াচ টুলের তথ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বরে সুদের হার বাড়ার সম্ভাবনা ৭৮ শতাংশে নেমেছে। ফেডের সিদ্ধান্ত ঘোষণার আগে এই সম্ভাবনা ছিল ৮৪ শতাংশ।
সুদের হার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশার পরিবর্তন স্বর্ণের বাজারেও প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ, সুদবিহীন সম্পদ হিসেবে স্বর্ণ ধরে রাখার ক্ষেত্রে সুদের হারের সঙ্গে সম্পর্কিত সুযোগব্যয় গুরুত্বপূর্ণ।
সুদের হার বাড়লে স্বর্ণের দামে কী প্রভাব পড়ে?
স্বর্ণ সাধারণত সুদ বা নিয়মিত আয় দেয় না। অন্যদিকে, সুদযুক্ত সম্পদ থেকে বিনিয়োগকারীরা আয় পেতে পারেন। ফলে সুদের হার বাড়লে স্বর্ণ ধরে রাখার সুযোগব্যয় বাড়তে পারে এবং বিনিয়োগকারীদের কাছে স্বর্ণের আকর্ষণ কমে যেতে পারে।
তবে স্বর্ণের দাম শুধু সুদের হারের ওপর নির্ভর করে না। মূল্যস্ফীতি, ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি, ডলারের মূল্য এবং নিরাপদ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের চাহিদাও বাজারের গতিপথে প্রভাব ফেলতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতির কোন তথ্যের দিকে নজর?
বিশ্ববাজারের বিনিয়োগকারীদের নজর এখন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যক্তিগত ভোগব্যয় মূল্যসূচক বা পিসিইর দিকে। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক মূল্যস্ফীতি পরিমাপের ক্ষেত্রে এই সূচককে বিশেষ গুরুত্ব দেয়।
পিসিইর নতুন তথ্য প্রকাশের পর মূল্যস্ফীতির গতিপথ এবং ভবিষ্যৎ সুদের হার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের ধারণা বদলাতে পারে। এর প্রভাব স্বর্ণসহ বিভিন্ন পণ্যের বাজারে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
২০২৬ সালে পণ্যমূল্য বাড়ার পূর্বাভাস বিশ্বব্যাংকের
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, কৃষ্ণসাগরে শস্য পরিবহনে বিঘ্ন এবং নিরাপদ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের চাহিদার কারণে ২০২৬ সালে বিশ্ববাজারে পণ্যমূল্য ২৩ শতাংশ বাড়তে পারে।
এদিকে, ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে শান্তি আলোচনা পুনরুজ্জীবিত করতে দেশটির নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান মোহসেন রেজায়িকে চিঠি পাঠিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স।
মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি ও সম্ভাব্য কূটনৈতিক উদ্যোগ বিনিয়োগকারীদের মনোভাবকে প্রভাবিত করতে পারে। তবে এসব পরিস্থিতির কারণে স্বর্ণের দাম কোন দিকে যাবে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
রুপা, প্লাটিনাম ও প্যালাডিয়ামের দামও কমেছে
স্বর্ণের পাশাপাশি বিশ্ববাজারে অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর দামেও পতন দেখা গেছে।
স্পট মার্কেটে রুপার দাম ১ দশমিক ৫ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৫৩ দশমিক ১৫ ডলারে নেমেছে। একই হারে প্লাটিনামের দাম কমে প্রতি আউন্স ১ হাজার ৫১৫ দশমিক ৭০ ডলার হয়েছে।
অন্যদিকে, প্যালাডিয়ামের দাম শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ১ হাজার ৪ দশমিক ২৫ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
শেষ কথা
যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হারসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত ও মূল্যস্ফীতির নতুন তথ্যের অপেক্ষায় বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম কমেছে। একই সময়ে রুপা, প্লাটিনাম ও প্যালাডিয়ামের দামেও পতন দেখা গেছে।
তবে সুদের হার, মূল্যস্ফীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে মূল্যবান ধাতুর বাজারেও ওঠানামা হতে পারে। তাই বিশ্ববাজারে স্বর্ণের পরবর্তী গতিপথ বুঝতে বিনিয়োগকারীদের নজর থাকবে ফেডারেল রিজার্ভের সিদ্ধান্ত ও যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অর্থনৈতিক তথ্যের দিকে।
সূত্র: রয়টার্স, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও যুগান্তরের প্রতিবেদনে উল্লিখিত তথ্য অবলম্বনে।









